পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান অনুসঙ্গ পশু কোরবানি। কোরবানির পর পশুর চামড়া দ্রুত সংরক্ষণ করতে হয়। পশু জবাইয়ের ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে চামড়ায় লবণ না লাগালে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। একটি বড় গরুর চামড়া ভালোভাবে সংরক্ষণের জন্য সাধারণত ৭ থেকে ১০ কেজি লবণের প্রয়োজন হয়। এবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকার সারাদেশে এতিমখানা, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে প্রায় ৯,৮০০ থেকে ১০,০০০ টন লবণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। অথচ গত বছর (২০২৫) চামড়া সংরক্ষণে বিনামূল্যে ১১ হাজার ৫৭১ মেট্রিক টন লবণ দিয়েছিল সরকার। এরই মধ্যে চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত লবণের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও প্রতিবস্তা লবণের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে চামড়া সংরক্ষণ ও কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, বর্তমানে ৭৪ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা চামড়ার লবণ বিক্রি হচ্ছে ৯৩০ থেকে ৯৫০ টাকায়। অথচ গত ঈদুল ফিতরের সময় একই লবণ বিক্রি হয়েছিল ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকায়। তাদের অভিযোগ, লবণের বাজারে কোনো সংকট না থাকলেও মিল মালিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে কোরবানির চামড়া বাঁচাতে লবণের ‘যুদ্ধে’ হেরে গেলে এ খাতের ব্যবসায়ীদের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে। চামড়া আড়তদারদের মতে, প্রতিটি গরুর চামড়ায় গড়ে ১০ কেজি লবণ প্রয়োজন হয়। আগে যেখানে একটি চামড়ায় প্রায় ১০০ টাকার লবণ খরচ হতো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকায়। কিন্তু টেনারি মালিকরা সে অনুপাতে চামড়ার দাম বাড়াচ্ছেন না। ফলে ব্যবসায়ীদের লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।
এ বছর কোরবানির জন্য দেশে পর্যাপ্ত গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে। কোরবানিযোগ্য ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার গরু-মহিষ এবং ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ছাগল-ভেড়াসহ মোট পশুর প্রাপ্যতা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ১৮০টি। এই হিসাবে কোরবানির ঈদে সংগৃহীত পশুর (গরু, খাসি, ছাগল) কাঁচা চামড়া বাণিজ্য প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকার হয়ে থাকে। কোরবানির মৌসুমে প্রতি বছর সারা দেশে প্রায় ১ কোটি পশুর চামড়া পাওয়া যায় (যার মধ্যে প্রায় ৯০-৯১ লাখেরও বেশি কোরবানি সম্পন্ন হয়)। এর মধ্যে সিংহভাগই গরুর চামড়া, যার থেকে সবচেয়ে বড় আয় আসে। সংগৃহীত এই কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের পর তা ট্যানারির মাধ্যমে চূড়ান্ত পণ্যে রূপান্তরিত হয়ে কোটি কোটি টাকার চামড়াজাত জুতা, ব্যাগ ও জ্যাকেটে রূপ নেয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার আয় আসে। বাংলাদেশে সামগ্রিক চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ৩৬,৫০০ কোটি টাকার (৩ বিলিয়ন ডলার) ।
# ঢাকার পরিস্থিতি
ঢাকার লালবাগের পোস্তা এবং সাভার চামড়া শিল্পনগরী মিলে প্রতি বছর কোরবানির ঈদের প্রথম কয়েক দিনেই লাখ লাখ পিস চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে। সাধারণত সারা দেশে যত পশু কোরবানি হয়, তার একটি বড় অংশ (প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ) ঢাকা ও আশেপাশের জেলাগুলোতেই হয়ে থাকে। সেই চামড়াগুলোর একটি বড় অংশই ঢাকার আড়ত ও ট্যানারিগুলোতে লবণ দিয়ে প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়। চামড়া যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য সরকার প্রতি বছর বিসিকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোতে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করে। সারা দেশে এই বছর প্রায় ৯,৮১৯ টন বিনামূল্যে লবণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঢাকা ও এর আশেপাশের মাদ্রাসাগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিসিক সুত্রে জানা গেছে, এবার ঢাকার চাগহদা রয়েছে ৭৩২৩ টন। মজুদ রয়েছে ৯৩৯৮ টন। এবার বিনামূল্যে সরবারাহ করা হবে ৭০৫ টন
# চট্টগ্রাম পরিস্থিতি
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চামড়ার লবনের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের খুচরা ও পাইকারি বাজারে। ইতোমধ্যে নানা সংকটে জর্জরিত চামড়া আড়তদাররা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছেন। ফলে ছোট হয়ে আসছে আড়তদার সমিতিও। এছাড়া বছরের পর বছর ঢাকার চামড়া টেনারিগুলোর দেনা-পাওনার ঘানি টানছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। তার ওপর লবণের দাম বাড়লে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন ব্যবসায়ীরা। এ বছর কেবল ঈদুল আজহার আগের দিন রাতে ৭ হাজার বস্তা লবণ প্রয়োজন হবে চট্টগ্রাম ব্যবসায়ীদের। যেখানে প্রতি বস্তায় ৭৪ কেজি করে ৫১৮ টন লবণ থাকবে।
এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আসা চামড়াসহ চার লাখ চামড়ার বিপরীতে চট্টগ্রামে ৪ হাজার টন লবণ কিনতে হবে ব্যবসায়ীদের। ফলে এখন থেকেই লবণ কিনে মজুত করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। কিন্তু চড়া দামে অনেকেই পড়েছেন বিপাকে। তারা জানান, চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে প্রণোদনার লবণ দেওয়া হলেও আড়তদারদের কোনো লবণ দেওয়া হয় না। অথচ মাত্র ১০ শতাংশ চামড়া মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো সংগ্রহ করে থাকে। বাকি ৯০ শতাংশ চামড়া আড়তদাররা সংগ্রহ করে থাকেন।
বিসিক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক আলমগীর আল-কাদেরী বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে এবার লবণ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত গরমে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। গত বছর পরিবহন সমস্যা, লবণ প্রয়োগে দেরি হওয়া, দাম না পাওয়াসহ নানা কারণে অনেক ব্যবসায়ীর চামড়া নষ্ট হয়। এবার দ্রুত চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা ও বিক্রির প্রস্তুতি নিয়েছি আমরা।
তিনি বলেন, প্রতিটি চামড়ায় ১০ কেজি লবণ দরকার হয়। লবণের দাম বাড়লে আমাদের উৎপাদন খরচও বাড়বে। সমিতির উপদেষ্টা আব্দুল কাদের বলেন, লবণ মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে হঠাৎ করেই লবণের দাম বেড়ে গেছে। ঢাকায় পৌঁছাতে প্রতিটি চামড়ার জন্য সাড়ে ৪০০ টাকা খরচ করতে হয়। অথচ সরকারের দাম মানেন না টেনারি মালিকরা। এতে আমরা লোকসানে পড়ি। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ২০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া পাওনা রয়েছে ঢাকার কাছে। চামড়া বিক্রি করলেও টাকা না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, নানা কারণে ঢাকার টেনারিগুলো বকেয়া টাকা ছাড়ছে না। একইসঙ্গে লবণ ও নগদ টাকায় জনগণের কাছ থেকে চামড়া কিনতে হয়। ফলে এখানে বিশাল বিনিয়োগ করতে হয়। এতে নতুন করে ঋণ গ্রহণ প্রয়োজন হয় অনেক আড়তদারের।
সমিতি সূত্র জানায়, পূর্বে ১১২ জন আড়তদার চামড়া ব্যবসা করলেও বর্তমানে ৩০-৪০ জনে নেমে এসেছে। কয়েক বছর ধরে চামড়াশিল্পে মন্দা থাকায় ব্যবসায়ীরা পেশা পরিবর্তন করেছেন। ফড়িয়ারাও এখন লোকসান গোনেন। আর যারা চামড়া লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে ধরে রেখে বিক্রি করতে চান, তারা আরো বড় ধরনের লোকসানে পড়েন। সরকারিভাবে এ বছর ঢাকায় গরুর চামড়া ৬২-৬৭ টাকা প্রতি বর্গফুট আর ঢাকার বাইরে ৫৭-৬২ টাকা প্রতি বর্গফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ছাগলের ক্ষেত্রে সারা দেশের জন্য একই দাম ঠিক করে দিয়েছে সরকার। খাসির চামড়া বর্গফুটপ্রতি ২৫-৩০ টাকা ও ছাগির চামড়া ২২-২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মেসার্স এলিট সল্ট ক্র্যাশিং ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী আজিজুল কাদের বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে চলতি মৌসুমে ৬৯ হাজার একর জমিতে ২৭ লাখ টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে লবণ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে বাজারে লবণের সংকট দেখা দিয়েছে এবং দামও বেড়েছে। কজন লবণ ব্যবসায়ী জানান, পলিথিনের দাম ও বোট ভাড়া আগের চেয়ে বেড়েছে। এতে লবণচাষিদের পুষিয়ে উঠতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
# এ বছর ৯ হাজার ৮০০ টন লবণ দেবে সরকার
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশজুড়ে ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিনামূল্যে প্রায় ১০ হাজার টন লবণ বিতরণ করবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন। চামড়া দ্রুত নষ্ট হওয়া ঠেকাতে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এ কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এবার সারা দেশে মোট ৯ হাজার ৮০০ টনের বেশি লবণ বিতরণ করা হবে। জেলার ভিত্তিতে চাহিদা ও কোরবানির পরিমাণ বিবেচনায় বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লবণ বরাদ্দ পেয়েছে চট্টগ্রাম, প্রায় ১ হাজার ৫ টন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম বরাদ্দ রাখা হয়েছে বান্দরবানের জন্য, মাত্র ১৫ টন। গত বছর প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী বিনামূল্যে লবণ বিতরণের উদ্যোগ নেয় বিসিক। শুরুতে ৩০ হাজার টন বিতরণের পরিকল্পনা থাকলেও পরে মাঠ প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী ১১ হাজার ৫৭১ টন লবণ সরবরাহ করা হয়।
জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এসব লবণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। তবে চলতি বছর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। আগাম বৃষ্টিপাতের কারণে দেশে লবণ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে বাজারে লবণের দাম দ্রুত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকারকে একই বাজেটে কম পরিমাণ লবণ বরাদ্দ দিতে হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে দেশে ২৫ লাখ টনের বেশি লবণ উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ টনের কাছাকাছি। ফলে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণের দাম প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ লবণ ৪৫০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে এবার আগের বছরের তুলনায় প্রায় পৌনে ২ হাজার টন কম লবণ বিতরণ করা হবে। তবে বিসিক বলছে, সীমিত বরাদ্দের মধ্যেও যাতে চামড়া সংরক্ষণে কোনো বড় সংকট না হয়, সে লক্ষ্যেই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
# গত বছর ৩০ হাজার টন লবণ দেয় সরকার
গত বছর চামড়া সংরক্ষণে এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিংসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে ৩০ হাজার মেট্রিক টন লবণ দেওয়ার লক্ষ্য ছিল সরকারের। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন প্রস্তুতিমূলক এক সভায় বলেছিলেন, ‘আগে সারা দেশে একসঙ্গে কাঁচা চামড়া আসত। চামড়া পচে যাবে সে কারণে দাম না পেয়েও বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। এবার সেটা হবে না।’
# নারায়ণগঞ্জ পরিস্থিতি
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কোরবানির পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যদি চামড়ায় লবণ প্রয়োগ না করা হয়, তবে কোটি টাকার সম্পদ মুহূর্তেই পচে যেতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই এবার আগেভাগেই মাঠে নেমেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন। চামড়া নষ্ট হওয়া ঠেকাতে নারায়ণগঞ্জে ১২শ’ মেট্রিক টন লবণের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও অতিরিক্ত দামের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতিমূলক সভায় উঠে এসেছে চামড়া সংরক্ষণের নানামুখী পরিকল্পনা। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হান কবির।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কোরবানির মৌসুমে লবণের কোনো সংকট সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। বাজার মনিটরিং থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে তদারকি— সবকিছুতেই প্রশাসনের নজর থাকবে। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ওই সভায় চামড়া ব্যবসায়ী, লবণ সরবরাহকারী, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। সভায় চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও ট্যানারিতে সরবরাহের পুরো চেইন নিয়ে আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু লবণ মজুত করলেই হবে না, সেটি সময়মতো মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোও নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনের হিসাবে, এ বছর নারায়ণগঞ্জে কোরবানির পশুর সংখ্যা ও চাহিদা—দুইই উল্লেখযোগ্য। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য বলছে, জেলার পাঁচটি উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৬ হাজার ৫৩৭টি খামারে কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৫৪টি পশু। বিপরীতে জেলার মোট চাহিদা ১ লাখ ৩ হাজার ৪৭টি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত রয়েছে ১০ হাজার ৭০৭টি পশু।
এই সংখ্যাটিই বলে দেয়, এবারো নারায়ণগঞ্জে কোরবানির বড় আয়োজন হতে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে বাড়বে চামড়ার পরিমাণও। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলার চাহিদা পূরণের পরও অতিরিক্ত পশু অন্য এলাকায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে। খামারে প্রস্তুত পশুর তালিকায় রয়েছে ৬১ হাজার ৮৯৯টি ষাঁড়, ৬ হাজার ৪৮৬টি বলদ, ১৯ হাজার ৭৪৩টি গাভী, ২ হাজার ৮৪১টি মহিষ, ১৭ হাজার ১৭২টি ছাগল ও ৫ হাজার ৪৯৩টি ভেড়া। এছাড়া অন্যান্য শ্রেণির ১২৭টি পশুও রয়েছে।
সংখ্যার এই বিশালতা শুধু কোরবানির আয়োজনকেই নির্দেশ করে না, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিশাল অর্থনৈতিক চক্রের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির পর প্রথম ২৪ ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যে সঠিকভাবে লবণ প্রয়োগ না হলে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। আর একবার চামড়া পচে গেলে সেটি আর আন্তর্জাতিকমানের থাকে না। ফলে দেশের রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নারায়ণগঞ্জের চামড়া ব্যবসায়ী মহল বলছে, অতীতে বহুবার লবণের সংকট কিংবা অতিরিক্ত দামের কারণে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সময়মতো লবণ পৌঁছাতে না পারায় অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এবার তাই প্রশাসনের আগাম প্রস্তুতিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, খামারভিত্তিক পশু বাড়ার কারণে চামড়ার মানও উন্নত হচ্ছে। কারণ খামারে পালন করা পশুগুলোর শরীরে ক্ষত কম থাকে এবং নিয়মিত পরিচর্যার কারণে চামড়া তুলনামূলক ভালো মানের হয়। নারায়ণগঞ্জের চামড়া বাজার ঘিরে এবার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কারণ গত কয়েক বছরে কোরবানির চামড়া নিয়ে হতাশা কম ছিল না। কোথাও বিনামূল্যে চামড়া দিয়ে দিতে হয়েছে, কোথাও আবার পরিবহন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়েছে মৌসুমি সংগ্রাহকদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি সময়মতো লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় এবং চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়, তাহলে এ খাতে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো যাবে। একইসঙ্গে ট্যানারি শিল্পও পাবে মানসম্মত কাঁচামাল। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পঘন এলাকায় চামড়া শুধু ধর্মীয় উৎসবের উপজাত নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ। প্রশাসন, ব্যবসায়ী, খামারি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবাই যেন একই সুরে বলছে, ‘চামড়া বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









