রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষার বদলে অনিয়ম আর লুটপাট চলছে। অবৈধভাবে ইচ্ছামতো বেতন-ভাতা নেওয়া, কেনাকাটায় অনিয়ম, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠানটির কোটি কোটি টাকার তহবিল নিয়ে অনিয়মসহ নানা অব্যবস্থাপনার তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) প্রতিবেদনে।
ডিআইএর তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল গত মাসে একাধিকবার প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন ও তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। সম্প্রতি প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। ডিআইএ পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের যেসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা পাওয়া গেছে তা বিস্তারিতভাবে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। প্রতিবেদন আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি, মন্ত্রণালয়ই এখন প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, হলিক্রসে যেখানে ভর্তি হতে মেয়েদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয় সেখানে বেইলি রোডেই অবস্থিত সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের উল্টো চিত্র। বেইলি রোডে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশেই সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের অবস্থান। দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই মেয়েদের। কিন্তু ভিকারুননিসায় শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য দীর্ঘলাইন থাকলেও সিদ্ধেশ্বরীতে শিক্ষার্থীদের দেখা মেলে না। কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী চার হাজার হলেও বাস্তবে দুই হাজারও উপস্থিত থাকে না। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে। অন্যদিকে থেমে নেই অবৈধভাবে ইচ্ছেমতো বেতন-ভাতা নেওয়া, কেনাকাটায় অনিয়ম, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠানটির কোটি কোটি টাকার তহবিল নিয়ে অনিয়ম। আর প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন ১৩৩ জন শিক্ষক, যার মধ্যে ৬৮ জনের নিয়োগই অবৈধভাবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লা এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দ্বিগুণ হারে উৎসব ভাতা গ্রহণ করেছেন। সাহাব উদ্দিন মোল্লা অবৈধভাবে বেসরকারি বেতন বাবদ ৯৭ লাখ টাকা এবং দেলুয়ার হোসেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা নিয়েছেন, যা ফেরতযোগ্য। এ ছাড়া দেলুয়ার হোসেনের নিয়োগ বিধিসম্মত না হওয়ায় আরো প্রায় ৩৮ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে অবৈধভাবে দুই কোটি ৩২ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা ফেরত দিতে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির ৬৮ জন শিক্ষকের নিবন্ধন সনদ না থাকায় তাঁদের নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি। তাঁদের নিয়োগ বিধিসম্মত না হওয়ায় তাঁরা প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতন পাবেন না এবং প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁদের নেওয়া বেতন-ভাতাও ফেরতযোগ্য হবে। এ ছাড়া সহকারী শিক্ষক শামীম আক্তারের (শামা) নিয়োগ পরীক্ষার টেবুলেশন শিটে এবং তাঁর এমপিওভুক্তির তথ্যে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় শ্রেণি উল্লেখ আছে। তবে পরিদর্শনকালে সরবরাহকৃত সনদ যাচাইয়ে দেখা যায়, স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর তৃতীয় শ্রেণি। সঠিক তথ্য গোপন করে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সংরক্ষিত তহবিলের সনদ যাচাইয়ে দেখা যায়, ফাস্ট ফিন্যান্স লিজিং কোম্পানিতে পাঁচ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৩৫৬ টাকা, পিপলস লিজিং কোম্পানিতে দুই কোটি ১২ লাখ ১২ হাজার ৪৯ টাকা এবং এবং জিএসপি ফিন্যান্স কোম্পানিতে চার লাখ টাকার এফডিআর করা হয়েছে; যা বিধিসম্মত হয়নি। বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা উত্তোলন করে বিধি মোতাবেক তফসিলি ব্যাংকে এফডিআর করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেটর ও লিফট কেনা এবং বিভিন্ন মেরামত কাজ, অভিভাবক শেড নির্মানে বড় ধরনের অনিয়ম পেয়েছে পরিদর্শন দল। ক্যান্টিন থেকে প্রতিমাসে ভাড়া পেলেও সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানের জন্য কেনা ৫টি ল্যাপটপের মধ্যে ২টি ল্যাপটপ পাওয়া গেছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঁচ লাখ দেওয়ার সময় দেড় লাখ টাকা আত্মসাৎ এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
প্রতিষ্ঠানটিতে অনুমোদনহীনভাবে প্রভাতী ও দিবা শিফট এবং ইংলিশ ভার্সন চালু আছে। প্রভাতী শিফটে ২৮টি শাখা, দিবা শিফটে ২৬টি শাখা এবং ইংলিশ ভার্সনে ৩০টি শাখা চালু আছে, যার কোন অনুমোদন নেই। প্রতিষ্ঠানটি সরকারি করার ঘোষণা প্রচারের জন্য পোস্টার ও লিফলেট ছাপাতে ৭০ হাজার টাকা এবং বিজ্ঞাপন ব্যয় ৩ লাখ ১৮ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হলেও এর সত্যতা দেখাতে পারেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক সভাপতির ছেলে শেখ এমরানুল আলম ২০২৩ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে প্রতি মাসে ৪২ হাজার টাকা করে তিন লাখ ৩৬ হাজার টাকা অবৈধভাবে নিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির কোচিং বাবদ আদায় করা টাকার রসিদ, টাকা ব্যয়ের রেকর্ড পরিদর্শনকালে সরবরাহ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিক্ষা সফর সংক্রান্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ক্রয় কমিটি, উন্নয়ন কমিটি প্রতিবছরেই কিছু নির্ধারিত শিক্ষকের মাধ্যমে নগদে সম্পাদিত হয়েছে, পিপিআর অনুযায়ী কোন ক্রয় প্রক্রিয়া হয়নি। ১২০ জোড়া বেঞ্চ কেনা এবং ৫টি বাথরুম নির্মাণে ব্যয় ও মজুরি বিলে শুধুমাত্র প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর রয়েছে, কোন কামিটির সদস্যের স্বাক্ষর নেই। ইংরেজি ভার্সনের মূল্যায়ণ পরীক্ষার কাজগ ও স্টেশনারী কেনা বাবদ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ দেখানো হলেও ভাউচার রয়েছে কেবল ২০ হাজার ৯৪৫ টাকার। এক মাসেরও কম ব্যবধানে ৬০টি সিটি ক্যামেরা কেনা বাবদ ৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো, ১ মাস পরেই আবার ৮০টি ক্যামেরা মেরামত বাবদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। ভবনে রং করার জন্য ৪ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে নরসিংদীর মাধবদি বাজারের ঠিকানায়। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির কোচিং বাবদ আদায়কৃত টাকার রশিদ, টাকা ব্যয়ের রেকর্ড পরিদর্শনকালে সরবরাহ করা হয়নি।
পরিদর্শনকালে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ পরিলক্ষিত হয়- প্রতিষ্ঠানে স্টক রেজিস্টার না থাকায় প্রতিষ্ঠানে বিপুল কেনাকাটার বর্তমান অবস্থা জানা যায়নি। প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিক্ষাসফর সংক্রান্ত শিক্ষার্থীদের নিকট হতে আদায়কৃত অর্থ সম্পর্কিত তথ্য প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ক্রয় কমিটি, উন্নয়ন কমিটি প্রতি বছরেই কিছু নির্ধারিত শিক্ষক দ্বারা নগদে সম্পাদিত হয়েছে। পিপিভার অনুযায়ী কোন ক্রয় প্রক্রিয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন জাতীয় দিবস, উৎসব আয়োজনে আপ্যায়ন খাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের (যেমন: নিউ মধুমিতা মিষ্টি ঘর, এস.কে. এন্টারপ্রাইজ) মাধ্যমে অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয়িত হয়েছে। ২০২১ সালের ২১ জানুয়ারি ১২০ জোড়া বেঞ্চের মজুরী বিল এ শুধুমাত্র প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর রয়েছে; কোন কমিটির সদস্যের স্বাক্ষর নেই। ওই বছরের ১১ মার্চ ৫টি বাথরুম তৈরীর বিল এ শুধুমাত্র প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর রয়েছে; কোন কমিটির সদস্যের স্বাক্ষর নেই। ইংরেজী ভার্সনের মূল্যায়ন পরীক্ষার কাগজ ও স্টেশনারী ক্রয় বাবদ ২০২৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ দেখানো হয়েছে। অথচ ব্যয়িত ভাউচারের মধ্যে ভবিষ্যতের অর্থাৎ ৪ মার্চ ৫টি ভাউচার এর মাধ্যমে ২০ হাজার ৯৪৫ টাকা ব্যয় প্রদর্শন করা হয়েছে যা বোধগম্য নয়।
৩০টি সিসি ক্যামেরা ক্রয় বাবদ ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ১৮ মে ৩০ টি সিসি ক্যামেরা ক্রয় বাবদ ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু ৭ জুন ৮০টি সিসি ক্যামেরা মেরামত বাবদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে এবং ২০২৪ সালের ৩ জুলাই ৩৬টি সিসি ক্যামেরা মেরামত বাবদ ৫৭ হাজার ৯০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। মূলত কতগুলো সিসি ক্যামেরা ক্রয় করা হয়েছে এবং মেরামত করা হয়েছে তার কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি নিউ মধুমিতা মিষ্টি ঘরকে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টাকা এবং এসকে এন্টারপ্রাইজকে ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা নগদে প্রদান করা হয়েছে যা পিপিআর ২০০৮ এর ব্যতয় এবং উক্ত ব্যয়ের সঠিকতা তথ্যের অভাবে যাচাই করা যায়নি। ২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর ভবনের ভিতর ও বাহিরে রং করণ বাবদ ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। উক্ত পরিশোধিত ভাউচার এর ঠিকানা মাধবদি বাজার, নরসিংদী দেওয়া রয়েছে যা সঠিকতা যাচাই করা যায়নি। ওই বছরের ১৩ আগস্ট নিরীক্ষা ফি ও একাউন্টিং ফি বাবদ তোফায়েল আহমেদ এন্ড কোং কে ৮৬ হাজার টাকা ব্যয় পরিশোধ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ক্যাশবুক লেখার জন্য ৫০ হাজার টাকা ব্যয় উল্লেখ আছে। অথচ ক্যাশবুক লিপিবদ্ধ করার আয়ন ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসাবে প্রধান শিক্ষক ও হিসাব সহকারীর। ক্যাশবুক লিপিবদ্ধ করার জন্য বহি: প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব প্রদান সঠিক হয়নি। ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নিরীক্ষা ফি ও একাউন্টিং ফি বাবদ তোফায়েল আহমেদ এন্ড কোং কে ৮০ হাজার টাকা ব্যয় পরিশোধ করা হয়েছে। তন্মধ্যে ক্যাশবুক লেখার জন্য ৫৪ হাজার টাকা ব্যয় উল্লেখ আছে। সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন রাস্তার উপর অভিভাবক শেড নির্মান করা হয়েছে যা বিধিসম্মত নয়। অযাচিতভাবে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









