নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে ধীরগতির ইন্টারনেটে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসের আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন, অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি ও খোলা এলাকায় ওয়াইফাই চালু থাকলেও ধীরগতির কারণে অনলাইন ক্লাস, রিসার্চ পেপার ডাউনলোড, ভিডিও কনফারেন্স বা সাধারণ ব্রাউজিং করাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
প্রায় পাঁচ বছর আগে ক্যাম্পাসজুড়ে ওয়াইফাই সেবা চালু হলেও এখনও পর্যন্ত তার যথাযথ ফল পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, অস্বাভাবিকভাবে স্পিড কমে যাওয়া, এসব অভিযোগ এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরের ইন্টারনেট সংযোগ লাইন কোন কারণে বিপর্যস্ত হলেও জরুরি ভাবে মেরামতের ও নেই কোন ব্যবস্থা। সম্প্রতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরের রাস্তার সংস্কার কাজ করতে গিয়ে কাটা পড়ে ভু-গর্ভস্থ ইন্টারনেটের ক্যাবল। এতে করে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আব্দুল মালেক উকিল হল এবং হযরত বিবি খাদিজা হল।
সম্প্রতী সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। শিক্ষার্থীদের মুহুর্মুহু অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এবং ইউজিসির নির্দেশনার পরও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখতে না পেরে হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক বলেন, “নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকার একটি অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন র্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ভালো পর্যায়ে যেতে থাকলেও শিক্ষার্থীদের সমস্যা যেন লেগেই আছে। যার অন্যতম হলো ধীরগতির ইন্টারনেট কানেকশন।
প্রতিটি শিক্ষার্থীকে Eduroam নামক ওয়াই-ফাই সুবিধা দেওয়া হলেও, তা পুরো ক্যাম্পাস এলাকায় কভারেজ পায় না। ১০১ একর জুড়ে প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী ভিড় জমান তাদের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে শানিত করতে।
ক্লাসের নোট ডাউনলোড থেকে শুরু করে অনলাইন জার্নাল পড়া কিংবা প্রেজেন্টেশন তৈরি—সবকিছুতেই ইন্টারনেটের অপরিহার্যতা আমরা সবাই জানি। কিন্তু ধীরগতির ওয়াইফাই, লেকচার লোড হতে দীর্ঘ সময় লাগা, প্রয়োজনীয় ডেটা ডাউনলোড করতে গিয়ে বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এভাবে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তাই একজন শিক্ষার্থী হিসেবে প্রশাসনের প্রতি জোরালো আহ্বান রইল উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ স্থাপন ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামো উন্নত করতে যেন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।”
এসিসিই বিভাগের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী নূর মোহাম্মদ খান বলেন, “ল্যাবে রিএজেন্টের সামনে টেস্টটিউব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ল্যাব ম্যানুয়ালের সফটকপি নোট গ্রুপে শেয়ার করা, কিন্তু সেটা ডাউনলোড করতেই মুহুর্মুহু বাফারিংয়ের শিকার হতে হয়। কাঙ্ক্ষিত ফাইল যেন চির অধরা, এই দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে! এ যেন এক আধুনিক ট্র্যাজেডি!”
শিক্ষা বিভাগের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী কামাল হোসেন বলেন, “হলে বসে অনলাইন ক্লাস করতে গেলে ভিডিও লোডই হয় না। অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, যা খুবই কষ্টকর।” তিনি আরও বলেন, “মোবাইল ডেটা ব্যবহার করে পড়াশোনা চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, যা আমাদের আর্থিকভাবে চাপে ফেলছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি বড় সমস্যা। এছাড়া একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অনলাইন পরীক্ষা, কোর্স রেজিস্ট্রেশন ও লাইব্রেরির ই-রিসোর্স ব্যবহারেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।”
এসিসিই বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী মাহবুব এলাহী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সব জায়গায় উন্নত ওয়াইফাই সংযোগ দেওয়া উচিত। ল্যাপটপ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং বা ক্লাস করতে পারি না। অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে গেলে বারবার ডিসকানেক্ট দেখায়। সেজন্য স্পিড বাড়ানো উচিত। মোবাইল ডেটার দাম অনেক বেশি, তাই সবসময় এটা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।”
নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, দ্রুত ওয়াইফাই সিস্টেম আপগ্রেড করে উচ্চগতির স্থিতিশীল ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় তাদের পড়াশোনা ও গবেষণা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
এ বিষয়ে নোবিপ্রবি আইসিটি সেলের সিস্টেম এ্যানালিস্ট আবদুল্লা হিল-ফারুক বলেন, “হলের শেষ দিকের কক্ষগুলোতে তুলনামূলকভাবে ইন্টারনেটের গতি কিছুটা কম পাওয়া যায়। মূলত দেয়ালের কারণে সিগনাল বাধাগ্রস্ত হওয়াই এর অন্যতম কারণ। এছাড়া ব্যবহারকারীর মোবাইলের মডেল ও ব্যান্ডের ওপরও নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা নির্ভর করে। সালাম হলে বর্তমানে প্রায় ২৮টি রাউটার স্থাপন করা হলেও কিছু নেটওয়ার্ক সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। আমরা অনান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম তাদের ও একই সমস্যা এবং অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি রুমে একটি করে ছোট রাউটার দিয়েছে আমরাও সেই প্রক্রিয়া ব্যস্তবায়ন করব। এ প্রকল্পটি বিডিরেনের অধীনে টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, আগামী তিন মাসের মধ্যে শিক্ষার্থীরা এ সমস্যার কার্যকর সমাধান পাবে।”
এ বিষয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, পাঁচ বছর আগে যে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া হয়েছে সেটার সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জ হচ্ছে সব জায়গায় সমান স্পিড পাওয়া যায় না। আমরা এক বছর আগে একটা প্রজেক্ট পেয়েছিলাম প্রত্যেক রুমে রুমে ইন্টারনেট সংযোগ এর। এটা ইউজিসি ও বিডিরেনের আইনি জটিলতার কারণে টেন্ডার হয় নি। এটা গত দুই সপ্তাহ আগে টেন্ডার হয়েছে। যে কোম্পানি টেন্ডার পাবে তাদের মাধ্যমে একসাথে ৫ টা হলেই ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া হবে। এছাড়া ইউজিসি থেকে ইন্টারনেট সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য চেয়েছে আমরা সেগুলো পাঠিয়েছি, আশা করছি দ্রুতই এ সমস্যা সমাধান হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









