পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজশাহীতে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচার প্রস্তুতি। তবে উৎসবের এই মৌসুমেও স্বস্তিতে নেই চামড়া ব্যবসায়ীরা। বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিক লোকসান, বাজারে অস্থিরতা এবং এবার গবাদিপশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ল্যাম্পি স্কিন রোগের কারণে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে কাঁচা চামড়ার বাজারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রোগাক্রান্ত ও ফুলে যাওয়া চামড়ার কারণে এ বছর বিপুল পরিমাণ চামড়া বাতিল হতে পারে, ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।
রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিয়ে প্রস্তুতি থাকলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এবার চামড়া কেনায় অনেকটাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। কারণ গত কয়েক বছরে ঈদের দিন বেশি দামে চামড়া কিনে পরে কম দামে বিক্রি করে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের সময় চামড়ার বাজারে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। স্থানীয় পর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা করে বেশি দামে চামড়া সংগ্রহ করেন। কিন্তু পরে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রির সময় তারা কাঙ্খিত দাম পান না। এতে লাভ তো দূরের কথা, অনেক সময় মূলধনও ফেরত আসে না। ফলে অনেকে ইতোমধ্যেই এ ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
এদিকে আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সরকার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ বছর ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় দুই টাকা বেশি। গত বছর এ দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। এছাড়া খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাগজে-কলমে দাম বাড়ানো হলেও বাস্তবে সেই দামে চামড়া বিক্রি করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গবাদিপশুর ল্যাম্পি স্কিন রোগ। এই রোগে আক্রান্ত পশুর শরীরে গুটি, ক্ষত ও চামড়ার ভেতরে ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ফলে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায় এবং ট্যানারিতে এসব চামড়ার চাহিদা কমে যায়।
রাজশাহীর একাধিক ব্যবসায়ী জানান, বাজারে আনা অনেক গরুর শরীরে ইতোমধ্যেই ল্যাম্পি স্কিন রোগের লক্ষণ দেখা গেছে। এসব পশুর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার সময় নানা জটিলতা তৈরি হয়। ফলে ট্যানারি মালিকরা এমন চামড়া কম দামে কিনতে চান কিংবা অনেক ক্ষেত্রে একেবারেই নিতে চান না।
রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি লূৎফর রহমান বলেন, “ল্যাম্পি রোগ থাকায় এবার ১০০টি চামড়ার মধ্যে অন্তত ৪০টি চামড়া বাদ যেতে পারে। অনেক চামড়ার ভেতরে ফুলে গেছে, আবার অনেক পশুর শরীরে দাগ ও ক্ষত রয়েছে। তাই এবার খুব সতর্কতার সঙ্গে চামড়া কিনতে হবে। তা না হলে বড় ধরনের লোকসান হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “চামড়া শিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এই খাত নানা সংকটে ভুগছে। যদি সরকার মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ায় এবং প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করে, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হতে পারে। আমরা আশা করছি, এবার রাজশাহী জেলায় কোটি টাকার বেশি চামড়া বেচাকেনা হবে।”
মাসুম আলী নামের এক মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, “এইবার ভালো চামড়া খুব কম পাওয়া যাবে। গরুর স্কিনে নানা রোগ থাকায় ভালো চামড়া হবে না। অনেক গরুর চামড়ার ভিতরে ফুলে গেছে। সে চামড়া চলবে না। সরকার যদি প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরাসরি চামড়া কিনত, তাহলে আমরা লোকসানের মধ্যে থাকতাম না।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা ঈদের দিন চামড়া কিনি বেশি দামে। কিন্তু পরে আড়তে বা ট্যানারিতে গিয়ে সেই দাম পাই না। পরিবহন খরচ, লবণ, শ্রমিক খরচ সব মিলিয়ে অনেক সময় ক্ষতি গুনতে হয়।”
চামড়া সংরক্ষণ নিয়েও রয়েছে নানা উদ্বেগ। ব্যবসায়ীরা জানান, গরমের কারণে পশু জবাইয়ের পর চামড়া দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাধারণত জবাইয়ের পর ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত চামড়ার মান ভালো থাকে। এই সময়ের মধ্যে চামড়ায় সঠিকভাবে লবণ প্রয়োগ করতে না পারলে তা দ্রুত পচে যায়। ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পার হলে চামড়া অনেকাংশে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অতীতে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানা নিজস্ব উদ্যোগে চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করলেও বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। কারণ চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এবার অনেক প্রতিষ্ঠান চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে আগের মতো সক্রিয় নয়।
তবে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে চামড়া সংরক্ষণে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন উপজেলায় দিনব্যাপী কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে লবণ সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে যাতে চামড়া দ্রুত সংরক্ষণ করা যায়।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, চামড়া শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি উদ্যেগের কোন বিকল্প নেই। প্রতিবছর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে তারাও এই খাত থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









