সীমান্ত জেলা হওয়ায় বহু বছর ধরেই মাদক পাচারের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত রাজশাহী। বিশেষ করে পদ্মা নদী ঘেঁষা গোদাগাড়ী, চারঘাট, পবা, দামকুড়া ও কাটাখালী সীমান্ত এলাকা এখন মাদক কারবারিদের সক্রিয় রুটে পরিণত হয়েছে।
ভারত থেকে ফেনসিডিল, ইয়াবা, ট্যাপেনটাডল, বিদেশি মদসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য এসব সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে এবং এগুলো মাদক নগরীতে ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির একের পর এক অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সীমান্তের দুর্গম চরাঞ্চল, ফসলের মাঠ, নদীপথ ও রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র।
যেসব রুট এখন ‘হটস্পট’
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্র বলছে, রাজশাহী সীমান্তে মাদক প্রবেশের প্রধান রুটগুলো হলো গোদাগাড়ীর বিদিরপুর ও হরিসংকরপুর সীমান্ত, চারঘাটের হাজির বাতান ও পদ্মার চরাঞ্চল, পবার দামকুড়া ও চরমাজারদিয়া এলাকা এবং কাটাখালীর শাহাপুর ও পূর্ব বাতান এলাকা, পদ্মা নদী ঘেঁষা জাহাজঘাট ও বালুচর অঞ্চল। এসব এলাকা দিয়ে মূলত ভারতীয় ফেনসিডিল, ইয়াবা, ট্যাপেনটাডল ট্যাবলেট ও বিদেশি মদ বাংলাদেশে ঢুকছে বলে জানা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাচারকারীরা বস্তা বা ব্যাগে করে মাদক বহন করে রাতের আঁধারে সীমান্ত অতিক্রম করছে।
বিজিবি ও পুলিশের অভিযান
বিজিবির বিভিন্ন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে পাওয়া তথ্যনুযায়ী গত ৯ মে রাজশাহীর শাহাপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫০০ পিস ভারতীয় ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে ১ বিজিবি। একই রাতে গোদাগাড়ীর বিদিরপুর সীমান্ত থেকে ৩৯ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করা হয়। অভিযানের সময় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যায় বলে জানানো হয়। এর আগে এপ্রিল মাসে দামকুড়া ও বেড়পাড়া এলাকায় পৃথক অভিযানে ট্যাপেনটাডল, ফেনসিডিল ও সিরাপ জব্দ করে বিজিবি। ফেব্রুয়ারিতে চারঘাট, কাটাখালী ও দামকুড়া সীমান্তে পৃথক অভিযানে শত শত বোতল ফেনসিডিল ও ভারতীয় মদ জব্দের তথ্য দেয় বিজিবি।
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি অনুসরণ করে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সম্প্রতি রাজশাহীতে পুলিশ ও ডিবির মাদকবিরোধী অভিযানে বেশ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে একাধিক মাদক কারবারিকে আটক করা হয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে জানা যায়, রাজশাহী মহানগরীতে গত ১১ মে দিবাগত রাতে থানা ও ডিবি পুলিশের অভিযানে মাদক মামলায় ১ জন আটক হয়। ১০ মে রাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পৃথক অভিযানে ৪ জন মাদক মামলার আসামিকে আটক হয়। ৮ মে রাজশাহীর তানোর উপজেলার নবাতলা জোড়া ব্রিজ এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে তানোর থানা পুলিশ।
এর আগে রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের বিশেষ অভিযানে এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। ৮ মে ও ৯ মে পরিচালিত পৃথক অভিযানে ধরা পড়ে ৩ জন মাদক মামলার আসামি।
পুলিশ বলছে, রাজশাহী নগরী ও সীমান্তঘেঁষা এলাকায় মাদক পাচার ও বিক্রি ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল, গাঁজা ও ফেনসিডিলের বিস্তার ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সীমান্ত থেকে শহর ও গ্রামঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও একাধিক সূত্র বলছে, সীমান্ত দিয়ে ঢোকার পর মাদক প্রথমে গোদাগাড়ী, পবা ও চারঘাটের স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছে। এরপর সেগুলো নগরীর বিভিন্ন স্পট হয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে রাজশাহী নগরীর রেললাইন এলাকা, টার্মিনাল, ভাসমান বস্তি ও কিছু আবাসিক এলাকায় ছোট ছোট খুচরা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া তরুণদের একাংশও এখন ইয়াবা ও গাঁজার দিকে ঝুঁকছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। মাদকের এই ভয়াল আগ্রাসন শুধু শহরকেন্দ্রিকেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, ছড়িয়ে পড়ছে রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যান্ত গ্রামঞ্চলে।
জেলার পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার পিল্লাপাড়া গ্রামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চর্তুপাশে গড়ে উঠেছে ভয়াবহ মাদকের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। কয়েকজন বিপথগামী যুবকের নেতৃত্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির পিছনে চলে নিয়মতি মাদক সেবনের আড্ডা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পার্শ্ববর্তী পবা থানায় একাধিক অভিযোগ দিলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান মেলে না। সম্প্রতি ওই গ্রামের মেরাজ আলী নামের এক মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে ৩ কেজি গাঁজাসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পিল্লাপাড়া গ্রামের সুজন আলী নামের এক বাসিন্দা এই বিষয়ে বলেন, “আমাদের গ্রামে দুপুর, বিকেল এবং গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদক সেবন এবং বিক্রির রমরমা ব্যবসা। স্কুলের পিছনে পাশে এবং খালের ভিতরে চলে প্রকাশ্যে মাদক সেবন। আমরা কয়েকবার পবা থানায় অভিযোগ দিয়েছি কিন্ত কোনো সমাধান পাইনি।”
নগরকেন্দ্রীক মাদকের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। রাজশাহী নগরীর পাঠানপাড়া এলাকার জহুরুল ইসলাম নামে বেসরকারি চাকুরিজীবি বলেন, “সন্ধ্যার পরে আমাদের এলাকায় মাদকসেবীদের আড্ডা জমে উঠে। মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান দেয়, মাদকসেবীদের আটকও করে। কিন্তু মাদক একেবারে নির্মূল হয়নি।”
একই এলাকার শামীম হোসেন নামের এক বাসিন্দা বলেন, “মাদকের ভয়াল থাবায় আমাদের যুব সমাজ নষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই মাদকমুক্ত একটি সুস্থ পরিবেশ। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি নিয়মিত অভিযান দেয় তাহলে আমাদের জন্য ভালো হয়। আমরা নিরপাদে থাকতে পারি।”
এদিকে মহানগরীর দাসপুকুর রেললাইন সংলগ্ন আইডি বাগানপাড়া এলাকায় প্রকাশ্যে জমে উঠেছে মাদকের বিস্তার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ওই এলাকায় অবাধে হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজা ও ট্যাপান্টাডলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। এতে করে এলাকার যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে পড়লেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষ করে রেললাইন ও আশপাশের নির্জন স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন বসছে মাদকের আসর। দূর-দূরান্ত থেকেও মাদকসেবীরা সেখানে এসে জড়ো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, মাদক কারবারিদের কারণে দিন দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। সন্ধ্যার পর নারী ও শিক্ষার্থীদের চলাচলও অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানদের নিয়ে চরম আতঙ্কে আছি। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হলেও রহস্যজনক কারণে কেউ কিছু বলছে না। মাঝে মধ্যে অভিযান হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান আনতে পারছে না।”
ভয়াবহ সামাজিক প্রভাব
মাদক বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মীরা বলছেন, রাজশাহীতে মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি এখন সামাজিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। মাদকের কারণে কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই বাড়ছে, পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আসক্তি বাড়ছে, চুরি, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ বাড়ছে এবং যুবসমাজ কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ইয়াবা ও ট্যাপেনটাডল সেবনে মানসিক বিকার, হৃদরোগ, অনিদ্রা ও আত্মহত্যাপ্রবণতা পর্যন্ত তৈরি হতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, শুধু অভিযান চালালেই হবে না, মাদক সিন্ডিকেটের মূলহোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, নদীপথে টহল জোরদার এবং তরুণদের জন্য ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
পাশাপাশি শহর ও গ্রামের সচেতন অভিভাবকেরা দাবি জানিয়েছেন, অতিদ্রুত মাদকের বিস্তার রোধে প্রশাসনের জোরদার ভূমিকা এবং নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান।
সচেতন মহলের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে রাজশাহীতে মাদক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সীমান্ত রক্ষা ও যুবসমাজকে বাঁচাতে সমন্বিত অভিযান, সামাজিক প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই।
প্রশাসন কী বলছে?
গত এক বছরে মাদকবিরোধী অভিযান বেড়েছে, মাদকের বিস্তার বাড়েনি জানিয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, “পুলিশের পক্ষ থেকে মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১ বছরে মাদকের বিস্তার বাড়েনি। পুলিশের পক্ষ থেকে মাদকবিরোধী অভিযান বেড়েছে। আর অভিযানে মাদক ব্যবসায়ীসহ মাদকসেবীরাও নিয়মিত গ্রেপ্তার হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যহত আছে।”
মাদকের বিরুদ্ধে বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে জানিয়ে রাজশাহী-১ বিজিবির অধিনায়ক রিয়াজ শাহরিয়ার বলেন, “মাদক চোরাচালান রোধে সীমান্তে আমাদের প্রয়োজনীয় ফোর্স রয়েছে। ৭৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় আমাদের ২৪ ঘন্টা নজরদারি রয়েছে। সেখানে মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। আপনারা ইতিমধ্যে দেখেছেন বিজিবির নিয়মিত অভিযানে অনেক মাদক উদ্ধার হচ্ছে এবং মাদক ব্যবসায়ীরা আটক হচ্ছে। যেগুলো রুটে নিয়মিত মাদক পাচার হচ্ছে সেগুলোতে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি এবং নিয়মিত অভিযান হচ্ছে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









