ব্রিকসের এক সদস্য দেশ কয়েক মাস ধরে হামলার শিকার। আবার সেই দেশই অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যেই এবার একই কক্ষে বসতে চলেছেন জোটের নেতারা। লক্ষ্য—চলতি বছরের অন্যতম আলোচিত যুদ্ধ নিয়ে একটি অভিন্ন অবস্থান খুঁজে বের করা। তবে সদস্যদের স্বার্থ ও অবস্থানের পার্থক্য ব্রিকসের ঐক্যের বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর বসছে ব্রিকস নেতাদের সম্মেলন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ ইরান ২০২৪ সালে ব্রিকসের সদস্য হয়েছে। একই বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতও জোটে যোগ দেয়। অন্যদিকে ইরান ও আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গড়ে ওঠা ব্রিকস পরে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে যুক্ত করেছে। পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বাইরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই ছিল এই জোটের অন্যতম লক্ষ্য।
তবে প্রায় ২০ বছর পর বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—ব্রিকস কি সত্যিই পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হয়ে উঠছে?
বিশ্লেষকদের বড় অংশের মতে, ব্রিকস হয়তো পশ্চিমকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। বরং এর সাফল্য বিচার করা উচিত এভাবে—জোটটি পশ্চিমা দেশগুলোর একক আধিপত্য কতটা কঠিন করে তুলতে পারছে।
পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করাই কি লক্ষ্য?
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) দোহা রাউন্ডের ব্যর্থতার পর ব্রিকসের ধারণা আরও জোরালো হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলো মনে করেছিল, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের প্রভাব আরও বাড়ানো দরকার।
ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিকস স্টাডিজ গ্রুপের গবেষক অক্টাভিও অলিভেইরা ও এনজো গডিনহোর মতে, ব্রিকস পশ্চিমা ব্যবস্থাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজেদের স্বার্থে একসঙ্গে কথা বলা এবং পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করাই এর বড় উদ্দেশ্য।
কানাডার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শন বার্গেসও মনে করেন, ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে দুটি বিষয় প্রধান ঐক্য তৈরি করেছে—আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর নৈতিক চাপ কমানো।
তার মতে, ব্রিকস সদস্যরা পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলার চেয়ে নিজেদের জন্য বেশি স্বাধীনতা ও বিকল্প পথ তৈরি করতে চায়।
চীনের শর্তহীন উন্নয়ন সহায়তা এবং ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সরাসরি মুদ্রা বিনিময়ের প্রস্তাবকে এর উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। এর ফলে ব্রিকসের ভেতরে যেমন বাণিজ্য বেড়েছে, তেমনি বৃহত্তর গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যেও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে।
তবে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক গাই বার্টনের মতে, ব্রিকস যখন তৈরি হয়েছিল, তখনকার ‘পশ্চিম’ আর এখনকার পশ্চিম এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার সম্পর্কেও ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ব্রিকস এখন আসলে কাকে চ্যালেঞ্জ করছে, যুক্তরাষ্ট্রকে, নাকি ইউরোপকে?
অর্থনৈতিক শক্তি অনেক, কিন্তু সম্মিলিত ক্ষমতা সীমিত
জনসংখ্যা ও অর্থনীতির বিচারে ব্রিকসের ওজন যথেষ্ট বড়। ভূকৌশল বিশ্লেষক ইমরান খালিদের মতে, জোটের সদস্য দেশগুলোতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ বাস করে। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বিশ্বের তেল উৎপাদনের প্রায় ৪৪ শতাংশ ব্রিকস দেশগুলোর হাতে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশও এই জোটের সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর ব্রিকসের ১১ সদস্য দেশের অর্থনীতি গড়ে প্রায় ৩.৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। একই সময়ে জি৭ দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি প্রায় ১ শতাংশ।
তবে এত বড় অর্থনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ব্রিকস সম্মিলিতভাবে সেই শক্তি কতটা কাজে লাগাতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ব্রিকসের নিজস্ব নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এনডিবি ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অনুমোদন করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিশ্বব্যাংকের কয়েক মাসের ঋণ দেওয়ার পরিমাণের কাছাকাছি এবং ব্যাংকটি এখনও তার বেশিরভাগ অর্থ ডলারে সংগ্রহ করে।
এনডিবি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও এর কাঠামো ও কার্যক্রমের অনেক দিক প্রচলিত বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর মতোই।
ডলারের ওপর নির্ভরতা বড় বাধা
পশ্চিমা অর্থনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো মার্কিন ডলারের ওপর এর নির্ভরতা।
ব্রিকস দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার কমানোর কথা বলে আসছে। কিন্তু বাস্তবে জোটের বিপুল অংশের বাণিজ্য এখনও ডলারে সম্পন্ন হয়। সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও বিপুল পরিমাণ ডলার রিজার্ভ রয়েছে।
চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সৌদি আরবও অন্যান্য মুদ্রায় বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছে। কিন্তু আগামী এক দশকে ডলারের জায়গা নেওয়ার মতো কোনো শক্তিশালী বিকল্প তৈরি হবে—এমন সম্ভাবনা খুব কম বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ইমরান খালিদের মতে, পুরো ব্রিকস একসঙ্গে ডলার থেকে সরে যাচ্ছে না। বরং সদস্য দেশগুলো একেকটি বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। প্রক্রিয়াটি ধীর হলেও একবার শুরু হলে তা ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
তবে ব্রিকসের অর্থনৈতিক অর্জনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এনডিবি পশ্চিমা দেশগুলো ছাড়া গঠিত প্রথম বড় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ২০২৪ সালে জোটের সম্প্রসারণও এর প্রভাব বাড়িয়েছে। সৌদি আরব, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় তেল উৎপাদক দেশ যুক্ত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্রিকসের গুরুত্ব বেড়েছে।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগসহ বিভিন্ন বিনিয়োগও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বাইরে অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
একসঙ্গে, আবার বিভক্ত
ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি যেমন এর ব্যাপক প্রতিনিধিত্ব, সেটিই আবার এর বড় দুর্বলতা। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত মতপার্থক্য রয়েছে।
এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ ইরানকে ঘিরে। মে মাসে ভারতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে কোনো অভিন্ন বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষক ইমরান খালিদের মতে, ইরান চেয়েছিল মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার বিষয়টি বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হোক। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত এতে সম্মত না হওয়ায় কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা যায়নি।
তবে তার মতে, চলমান যুদ্ধের সময়ে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগগুলো মূলত গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো থেকেই এসেছে। ওয়াশিংটন থেকে এমন কোনো উদ্যোগ আসেনি।
ব্রিকসের সম্প্রসারণের ফলে এই মতপার্থক্য আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করেন গাই বার্টন। তার মতে, নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ায় জোটে বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে একটি অভিন্ন অবস্থান নেওয়ার ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে।
ইরানের ক্ষেত্রে ব্রিকস তেহরানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কথা বলার একটি বড় মঞ্চ দিয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে জোটের সব সদস্য ইরানের অবস্থানকে সমর্থন করছে।
বার্টনের ভাষায়, ব্রিকসে ‘একজনের জন্য সবাই, সবার জন্য একজন’ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সদস্য দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে চায়।
ব্রিকস স্টাডিজ গ্রুপের গবেষকদের মতে, বিভিন্ন স্বার্থের দেশগুলো একই টেবিলে বসতে পারছে—এটিও বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
তাহলে কি ব্রিকস পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করছে?
বিশ্লেষকদের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, ব্রিকসকে প্রচলিত অর্থে পশ্চিমবিরোধী একটি রাজনৈতিক বা সামরিক জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
এর কোনো অভিন্ন মুদ্রা নেই, অভিন্ন শুল্কব্যবস্থা নেই, এমনকি সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও নেই। ফলে ন্যাটোর মতো কোনো প্রচলিত ভূরাজনৈতিক জোটের সঙ্গে এর তুলনা করা যায় না।
তবে ব্রিকস উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প তৈরি করেছে, পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে বাণিজ্যের সুযোগ বাড়িয়েছে এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী চলার আরও সুযোগ দিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রিকস হয়তো পশ্চিমা শক্তিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারছে না। কিন্তু কোনো দেশকে পশ্চিমা চাপের মুখে ফেলতে আগের চেয়ে বেশি হিসাব-নিকাশ করতে বাধ্য করছে।
অর্থাৎ, ব্রিকসের আসল চ্যালেঞ্জ হয়তো পশ্চিমকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য অন্য দেশগুলোর ওপর সহজে চাপ প্রয়োগ করা কঠিন করে তোলা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন