অটোনমিক নিউরোপ্যাথি (Autonomic Neuropathy) এমন একটি স্নায়ুরোগ, যেখানে শরীরের স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, হজম, ঘাম, মূত্রত্যাগ ও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মতো অনিচ্ছাকৃত শারীরিক কার্যক্রমে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম শরীরের এমন সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, যা মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিচালনা করে না। এই স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া, হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা, হজমের সমস্যা, মূত্রথলির কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং ঘামের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হতে পারে।
কেন হয় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে স্নায়ুর ক্ষতি হতে শুরু করে। এ কারণেই অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসকে অটোনমিক নিউরোপ্যাথির সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ ছাড়া অটোইমিউন রোগে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করতে পারে। এছাড়া কিছু ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, বংশগত স্নায়ুরোগ, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বিরল ক্ষেত্রে অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণেও এ রোগ হতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
অটোনমিক নিউরোপ্যাথির লক্ষণ আক্রান্ত স্নায়ুর ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণভাবে রোগীরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হন, সেগুলো হলো—
১. রক্তচাপ ও হৃদযন্ত্রের সমস্যা
২. দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া (অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন)
৩. মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতি
৪. অনিয়মিত বা অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন
হজমের সমস্যা
১. খাবার পাকস্থলীতে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা
২. অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়া
৩. বমি ভাব বা বমি
৪. কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা ডায়রিয়া
মূত্রতন্ত্রের সমস্যা
১. প্রস্রাব করতে অসুবিধা
২. মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়া
৩. প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা বা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা
ঘাম ও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা
১. অতিরিক্ত ঘাম হওয়া বা একেবারেই ঘাম না হওয়া
২. গরম বা ঠান্ডা পরিবেশে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে অসুবিধা
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসকরা রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অটোনমিক নিউরোপ্যাথি শনাক্ত করেন। এর মধ্যে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, স্নায়ুর কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসা কী?
চিকিৎসকদের মতে, অটোনমিক নিউরোপ্যাথির কোনো স্থায়ী বা সম্পূর্ণ নিরাময় নেই। তবে সময়মতো চিকিৎসা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উপসর্গ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
চিকিৎসায় সাধারণত মূল রোগের নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন রোগের অগ্রগতি ধীর করতে সহায়ক হতে পারে। এ ছাড়া রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী রক্তচাপ, হজমের সমস্যা, মূত্রতন্ত্রের জটিলতা বা অন্যান্য লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে আলাদা চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি যদি বারবার মাথা ঘোরা, দাঁড়ালে রক্তচাপ কমে যাওয়া, হজমে দীর্ঘদিন সমস্যা, প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা বা ঘামের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মতো লক্ষণ অনুভব করেন, তাহলে দ্রুত একজন নিউরোলজিস্ট বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে জটিলতা কমিয়ে রোগীর জীবনমান উন্নত রাখা সম্ভব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









