গাজার মানুষের জীবন: দখলদারত্বের ছায়ায়
গাজা নিয়ে আমিরা হাসের বই পড়তে গেলে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো—এটি শুধু একটি ভূখণ্ডের গল্প নয়। এটি মানুষের গল্প। এমন মানুষের গল্প, যাদের জীবন দীর্ঘদিন ধরে দখল, অবরোধ, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে। তবু তারা বেঁচে থাকে, ভালোবাসে, পরিবার গড়ে এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।
ইসরায়েলি সাংবাদিক আমিরা হাস হা'আরেতজ পত্রিকার হয়ে গাজায় গিয়েছিলেন ১৯৯৩ সালে। অন্য অনেক সাংবাদিকের মতো তিনি সেখানে গিয়ে কিছুদিন রিপোর্ট করে ফিরে আসেননি। তিনি চার বছর গাজায় থেকেছেন। মানুষের ঘরে গেছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের প্রতিদিনের জীবন দেখেছেন। এই অভিজ্ঞতা তার সাংবাদিকতাকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনার বিবরণে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং মানুষের ভেতরের ক্ষত ও শক্তিকে সামনে এনেছে।
গাজার মানুষের কাছে ঘর শুধু একটি বাড়ি নয়। অনেকের কাছে ঘর এমন একটি জায়গা, যেখানে তারা হয়তো আর কখনো ফিরতে পারবেন না। তবু সেই হারানো গ্রামের নাম তারা মনে রাখেন। পরিবারের মধ্যে সেই স্মৃতি বেঁচে থাকে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা পৌঁছে যায়।
একজন মানুষের কাছে নিজের জমি হারানোর অর্থ কী—এটি বোঝা যায় তার একটি প্রশ্নে— “আমরা কী অপরাধ করেছিলাম যে আমাদের এই শাস্তি পেতে হলো?” এই প্রশ্নের মধ্যে শুধু ব্যক্তিগত কষ্ট নেই। আছে একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ ইতিহাসের ক্ষত।
আমিরা হাস দেখিয়েছেন, দখলদারত্ব শুধু মানুষের জমি কেড়ে নেয় না। এটি মানুষের আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও আঘাত করে। দারিদ্র্য বাড়ে, কাজের সুযোগ কমে, চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত হয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট অপমান একসময় মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু গাজার মানুষ শুধু অসহায় নয়। তাদের জীবনে আছে এক ধরনের গভীর স্থিতি। তারা হারিয়েছে, কিন্তু সবকিছু হারায়নি। তাদের পরিবার আছে, স্মৃতি আছে, আশা আছে। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা নিজেদের মানুষ হিসেবে ধরে রাখার চেষ্টা করে।
এই জায়গাতেই গাজার রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে বহুবার। চুক্তি হয়েছে, আলোচনা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তি কোথায়?

অসলো চুক্তির পরও ফিলিস্তিনিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়নি। বরং তাদের রাজনৈতিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং সামাজিক বিভাজন অনেক ক্ষেত্রেই থেকে গেছে। অর্থনীতি তাই শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। কে কোথায় যেতে পারবে, কে কাজ করতে পারবে, কোথায় বাণিজ্য হবে, জমির ব্যবহার কীভাবে হবে—এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাজনীতি সরাসরি যুক্ত।
ফিলিস্তিনি অর্থনীতি নিয়ে ইসহাক দিওয়ান ও রাদওয়ান শাবানের গবেষণাও একই বাস্তবতার দিকে আমাদের নিয়ে যায়। দখলদারত্ব অর্থনীতির স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বেড়েছে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। ইসরায়েলে কাজের সুযোগ কমেছে। মানুষের মাথাপিছু আয় কমেছে, বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার ব্যাংকিং ও নির্মাণের মতো কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতিও দেখা গেছে। অর্থাৎ অর্থনীতি পুরোপুরি থেমে যায়নি; কিন্তু তার ওপর এমন কিছু কাঠামোগত বাধা রয়েছে, যা তাকে স্বাধীনভাবে এগোতে দেয় না।
তবু অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের কিছু পথ আছে। দক্ষ প্রশাসন, কার্যকর সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী খাতের শক্তিশালী ভূমিকা, উন্নত করব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো—এসবের মাধ্যমে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। আন্তর্জাতিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এখানে একটি কঠিন প্রশ্ন থেকে যায়—অর্থনৈতিক উন্নয়ন কি রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া সম্ভব?
উত্তরটি সহজ নয়। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি তার রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে আলাদা নয়। মানুষের চলাচল যদি নিয়ন্ত্রিত হয়, বাণিজ্য যদি বাধাগ্রস্ত হয়, জমির ব্যবহার যদি অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে, তাহলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
এই কারণেই গাজার গল্প শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির গল্প নয়। এটি ক্ষমতার গল্প। এটি সেই ক্ষমতার গল্প, যা মানুষের জীবনকে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—একটি অনুমতিপত্রের মাধ্যমে, একটি সীমান্ত বন্ধ করে, একটি কাজের সুযোগ বন্ধ করে, কিংবা একটি গ্রামের স্মৃতিকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে।
কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি শক্তিও আছে। মানুষের স্মৃতি।
যে মানুষ নিজের হারানো গ্রামের নাম মনে রাখে, সে শুধু অতীতকে মনে রাখে না। সে নিজের অস্তিত্বের একটি দাবি ধরে রাখে। সেই দাবি হলো—আমি ছিলাম, আমার ঘর ছিল, আমার জমি ছিল, আমার জীবন ছিল।
গাজার মানুষের এই স্মৃতি তাই রাজনৈতিকও। তাদের আশা, তাদের ক্ষোভ, তাদের পরিবারের গল্প এবং হারানো ঘরের প্রতি টান—সব মিলিয়ে তা এক ধরনের নীরব সাক্ষ্য।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি গাজার মানুষের কাছেই ফিরে আসে: তারা কি নিজের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণ করতে পারবে?
যতদিন সেই প্রশ্নের উত্তর অন্য কেউ ঠিক করবে, ততদিন গাজার অর্থনীতি পুরোপুরি স্বাধীন হবে না, মানুষের জীবনও নয়। আর যতদিন মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করতে থাকবে, ততদিন এই গল্প শেষ হয়ে যাবে না।

ড্রিংকিং দ্য সি অ্যাট গাজা: ডেজ অ্যান্ড নাইটস ইন আ ল্যান্ড আন্ডার সিজ, রেখক: আমিরা হাস, প্রকাশক: মেট্রোপলিটন বুকস, ২৮৮ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ৯৪৩৯.৩০ রুপি
পরিচিতি
আমিরা হাস ইসরায়েলি সাংবাদিক ও লেখক। তিনি ফিলিস্তিনিদের জীবন, দখলদারত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। ইসরায়েলের সংবাদপত্র হা'আরেতজ-এর সাংবাদিক হিসেবে তিনি গাজা ও পশ্চিম তীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবন খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
১৯৯৩ সালে তিনি গাজায় রিপোর্ট করতে যান। সেখানে গিয়ে তিনি শুধু সংবাদ সংগ্রহ করে ফিরে আসেননি; প্রায় চার বছর গাজায় বসবাস করেন। সাধারণ ফিলিস্তিনি মানুষের সঙ্গে থেকে তিনি দেখেছেন দখল, দারিদ্র্য, চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, কাজের অনিশ্চয়তা এবং ঘর হারানোর বেদনা। তাঁর সাংবাদিকতার বিশেষত্ব হলো—বড় রাজনৈতিক ঘটনার পাশাপাশি তিনি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠকে গুরুত্ব দেন।
গাজা নিয়ে তাঁর বিখ্যাত বই ‘ড্রিংকিং দ্য সি অ্যাট গাজা: ডেজ অ্যান্ড নাইটস ইন আ ল্যান্ড আন্ডার সিজ’। তার লেখায় ফিলিস্তিনিদের কষ্টের পাশাপাশি তাদের সাহস, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের আশাও উঠে এসেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন