বরিশাল অঞ্চলকে শুধু একটি ‘শস্যভান্ডার’ হিসেবে আটকে না রেখে, দক্ষিণ বাংলার মূল অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার ও আধুনিক অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার সময় এসেছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি ‘ভিশন বরিশাল-২০৫০’ গ্রহণের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
শুক্রবার বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিজেজি) উদ্যোগে আয়োজিত “আগামী বরিশাল: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়” শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এই প্রস্তাবনা ও রূপরেখা তুলে ধরা হয়।

সেমিনারে সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে দক্ষিণাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে একসঙ্গে কাজ করার ঐতিহাসিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডিজেজির উপদেষ্টা ও ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল।

প্রবন্ধে জানানো হয়, দেশের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ আসে বরিশাল বিভাগ থেকে, এবং প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবছর দেশের ১৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ পর্যটক কুয়াকাটা, ভাসমান পেয়ারা বাজার ও সুন্দরবন ভ্রমণ করেন।
সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের অভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান ৩০ শতাংশের বেশি হলেও বরিশালে তা ২ শতাংশেরও কম। বিসিক শিল্পনগরী থাকা সত্ত্বেও মূলধনের সংকট ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগ আটকে আছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের ২ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে লবণাক্ততার কারণে ধানের উৎপাদন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি সুপেয় পানির তীব্র সংকট তো রয়েছেই।
দক্ষিণাঞ্চলের সমৃদ্ধিতে ১০ দফা
কৌশলগত সুপারিশ: এই সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং শিল্প ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে বিডিজেজির পক্ষ থেকে ১০ দফা কৌশলগত সুপারিশ পেশ করা হয়।
উপকূলীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয় গঠন: নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ, সুপেয় পানি ও ডেল্টা অভিযোজনের জন্য পৃথক একটি মন্ত্রণালয় গঠন করা।
যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: ঢাকা-পদ্মা সেতু-বরিশাল-পটুয়াখালী-পায়রা রেল সংযোগ চালু এবং ভাঙা-কুয়াকাটা সড়ক ৬ লেনে উন্নীত করা। এর ফলে ঢাকা থেকে মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টায় কুয়াকাটায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
লজিস্টিক হাব ও পায়রা বন্দর: বছরে ৭৫,০০০ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিক হাব ও প্রসেসিং অঞ্চল গড়ে তোলা।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল: ধান, মাছ, পেয়ারা ও আমড়ার মূল্যসংযুক্তিতে স্পেশাল ইকোনমিক জোন, ভ্যালু চেইন এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুবিধা নিশ্চিত করা।
ডেল্টা মাস্টারপ্ল্যান: নদীভাঙন, প্লাবন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা মাস্টারপ্ল্যান গস্খহণ।
নৌপথ ও ব্লু-ইকোনমি: সাশ্রয়ী পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ নওয়াপথ ড্রেজিং ও ব্লু-ইকোনমি সম্প্রসারণ।
পর্যটন সার্কিট: বরিশাল, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, বরগুনা ও সুন্দরবনকে যুক্ত করে ট্যুরিজম সার্কিট তৈরি; যা রাজস্ব আয় দ্বিগুণ করতে পারে।
তারুণ্যের উন্নয়ন: তরুণদের ঢাকধসুখী প্রবণতা রোধে আইটি হাব; কারিগরি ও মেরিন প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জলবায়ু গবেষণা কেন্দ্রে রূপান্তর; স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা: ‘ভিশন-২০৫০’ বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ সমন্বয়ে একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠন করা।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিবৃন্দ তাদের বক্তব্যে বরিশালের পিছিয়ে পড়ার কারণ এবং উত্তরণের উপায় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘‘অপার সম্ভাবনা থাকার পরও বরিশাল অঞ্চলে পর্যাপ্ত শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। পানির ওপর শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম। অথচ বরিশাল বিভাগে প্রচুর পানি থাকার পরও আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না। তাই উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘিরে সঠিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।’’
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘‘উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অবক্ষয় রোধে ভালো নেতৃত্ব তৈরিতে নজর দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি না হয়।’’
নৌপ্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন, ‘‘সবাই উন্নয়নের কথা বললেও আমাদের সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো তুলে ধরতে হবে।’’
গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর বলেন, “ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে অতীতে বরিশালের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন সুবর্ণসময় চলছে। মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে এলাকাকে ক্লিন, গ্রিন ও সেফ রাখতে হবে।”
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূরু বলেন, “পটুয়াখালীতে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন চালুর কাজ প্রায় শেষের পথে। এটি চালু হলে অর্থনীতির গতিপথ বদলে যাবে।”
সেমিনারে বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা জয় করে বরিশাল অঞ্চল দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধির নতুন অনুঘটক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিডিজেজির সভাপতি মাহবুব সৈকত এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক সানবীর রুবেল ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী জেবেল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন