ঈদুল আজহার কোরবানির বর্জ্য অপসারণে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) পলি ব্যাগ ক্রয়ের টেন্ডারে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ভঙ্গসহ চরম আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ডিএনসিসি সূত্রে জানা যায়, পশু জবাইয়ের পর নগরীকে পরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখতে গত ৩১ মার্চ ১৭ লাখ ৩০ হাজার পলি ব্যাগ ও ব্লিচিং পাউডার ক্রয়ের জন্য এই দরপত্র আহ্বান করা হয়। যার কার্যাদেশ মূল্য ৪ কোটি ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ১০০ টাকা। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে (টেন্ডার আইডি-১২৪৮১৯৩) কার্যাদেশ পায় গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের মরগান ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। যার স্বত্বাধিকারী মো. নিয়াজ আলী চিশতী।
অভিযোগ রয়েছে, কাগজ-কলমের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আড়ালে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা পলি ব্যাগ কেনাকাটায় কোটি টাকা লোপাটের নিখুঁত ছক কষেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ভাণ্ডার কর্মকর্তা এবং ঠিকাদার মরগান গ্রুপ। এমন অভিযোগের সত্যতা জানতে সরেজমিন অনুসন্ধানে নামে দৈনিক এদিন।
গত ১১ মে ডিএনসিসির গোপন সূত্র থেকে পাওয়া টেন্ডার শিডিউলের কারিগরি বিনির্দেশনা (টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন) অনুযায়ী দেখা যায়, প্রতিটি পলি ব্যাগের আকার হওয়া কথা ৩৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ২৩ ইঞ্চি প্রস্থ। বর্জ্য বহনের সুবিধার্থে ব্যাগে ৩ ইঞ্চি দৈর্ঘ ও ১.৫ ইঞ্চি প্রস্থ সেন্টার হোল (ছিদ্র) থাকবে। এছাড়া শর্তে পলি ব্যাগের পুরুত্বে সিঙ্গেল সাইড ন্যূনতম ৫০ মাইক্রন এবং ডাবল সাইড ১০০ মাইক্রন ডেনসিটি থাকার কথা উল্লেখ আছে।
অনুসন্ধান বলছে, টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী পলি ব্যাগের প্রস্থ ২৩ ইঞ্চি হওয়ার কথা থাকলেও, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মরগান ওভেনের সরবরাহ করা ব্যাগে মিলছে প্রস্থ ২১ থেকে ২২ ইঞ্চি। সরকারি কারিগরি নির্দেশনায় সিঙ্গেল সাইড ন্যূনতম ৫০ মাইক্রন এবং ডাবল সাইড ১০০ মাইক্রন থাকার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরবরাহকৃত ব্যাগের সিঙ্গেল সাইড কোথাও ৪০ মাইক্রন আবার ডাবল সাইড কোথাও ৯০ মাইক্রন।
গত ১৩ মে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের গুলশান ভাণ্ডারে উপস্থিত হয় দৈনিক এদিন টিম। দেখা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ট্রাকে ঢুকছে হলুদ রঙের বর্জ্য অপসারণ পলি ব্যাগ। অভিযোগ ছিল জালিয়াতি আড়াল করতে, তড়িঘড়ি করে পলি ব্যাগ বুঝিয়ে দিচ্ছেন ঠিকাদার। যেখানে উপস্থিত ছিলেন মরগান ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজের স্টোর কিপার এবং ডিএনসিসির অফিস সহকারী ভাণ্ডার কর্মকর্তা মুহাম্মদ গাদ্দাফি।
এ সময় পলি ব্যাগের টেন্ডার স্যাম্পল সাইজের সাথে ঠিকাদার সরবরাহকৃত পলি ব্যাগের সাইজে প্রস্থে গরমিল পাওয়া যায়। পরে মাইক্রন মিটার দিয়ে পলি ব্যাগের পুরুত্ব মেপে দেখা যায় সরবরাহকৃত ব্যাগের সিঙ্গেল সাইড কোথাও ৪০ মাইক্রন আবার ডাবল সাইড কোথাও ৯০ মাইক্রন। অর্থাৎ সাইজে ছোট এবং পুরুত্বে কম, যা পলি ব্যাগ তৈরিতে ঠিকাদার কাঁচামাল কম দেওয়ার অভিযোগের প্রমাণ।
শুধু তা-ই নয়, নিয়ম অনুযায়ী পণ্যের বান্ডিল বা কার্টনে ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট এবং লট নম্বর থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা সম্পূর্ণ গায়েব। আরো ভয়াবহ তথ্য হলো, ব্যাগগুলো হালকা টানেই ছিঁড়ে যায় এবং ব্যাগে প্রিন্ট করা ডিএনসিসির মনোগ্রাম ও সচেতনতামূলক স্লোগান সামান্য নখের ঘষা বা তরলের স্পর্শেই মুছে যাচ্ছে, যা চরম নিম্নমানের কালির প্রমাণ।
দুর্নীতির এই অন্ধকার আরো উন্মোচিত হয় যখন ডিএনসিসির সহকারী ভাণ্ডার কর্মকর্তা মুহাম্মদ গাদ্দাফি এই প্রতিবেদকের সাথে সখ্য গড়ে তুলে উল্টো নিউজ না করার জন্য ঠিকাদারের পক্ষে আপসের প্রস্তাব দেন।
পলি ব্যাগ সরবরাহে জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে বিষয়টি পাত্তাই দিতে চায়নি মরগান গ্রুপ। সর্বশেষ হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নিয়াজ আলী চিশতী দাবি করেন, তাদের সরবরাহকৃত পলি ব্যাগ টেন্ডার শর্ত থেকে ১-২% তারতম্য বা ভ্যারিয়েশন রয়েছে, যা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য এবং মূল টেন্ডারেই নাকি এর উল্লেখ রয়েছে। অথচ ডিএনসিসির ভাণ্ডার কর্মকর্তা কামরুজ্জামান এদিনকে জোর দিলে বলেন, কোনো অনিয়ম হবে না।
ঠিকাদারের সরবরাহ করা পলি ব্যাগ ১-২% তারতম্যের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে, ডিএনসিসির সঙ্গে চুক্তিপত্রের মূল কপি দেখতে চাইলে গত ১৫ মে শুক্রবার অনুসন্ধানী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মরগান ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কর্মকর্তা ইব্রাহিম ফেরদাউস। গত ১৭ মে রোববার ডিএনসিসি ভাণ্ডারে পলি ব্যাগ যাচাই করে দেখাতে এই প্রতিবেদককে আমন্ত্রণ জানান তিনি। এ সময় পলি ব্যাগ শতভাগ শর্ত মেনেই সরবরাহ করা হচ্ছে জানানো হয়। অথচ খোদ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যেখানে ১-২% কমবেশির অজুহাত দিয়ে পার পেতে চাইছিলেন, সেখানে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা দাবি করছেন শতভাগ ‘নিখুঁত’।
গত ১৩ মে উত্তর সিটির ভাণ্ডার কর্মকর্তার সাথে টেলিফোন ও মেসেজে যোগাযোগ করে এদিন । জবাবে তিনি জানান, ১৫ মের পর ১৭ লাখ ৩০ হাজার পলি ব্যাগ যাচাই করেই তবে বুঝে নেওয়া হবে। ১৫ মে শুক্রবার টেলিফোনে সরাসরি যোগাযোগ করা হয় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের সাথে। প্রশাসক স্পষ্ট জানিয়ে দেন কোনো যাচাই ছাড়া পলি ব্যাগ বুঝে নেবে না রিসিভিং কমিটি।
চাহিদা-কার্যাদেশে ১ লাখে ফাঁক
১৭ মে ডিএনসিসির পলি ব্যাগ টেন্ডারে নয়ছয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য আসে এদিন টিমের হাতে। অভিযোগ, টেন্ডারে বর্জ্য অপসারণ পলি ব্যাগ কেনাকাটায় এক লাখ ব্যাগের লুকোচুরি। যার নেপথ্যে রয়েছেন খোদ ভাণ্ডার কর্মকর্তা ও উপসচিব মো. কামরুজ্জামানসহ টেন্ডার কমিটির সদস্যরা। অনুসন্ধানী টিমের হাতে আসা নথিতে দেখা গেছে, ১০টি জোনের বাসিন্দাদের জন্য ১৭ লাখ ৩০ হাজার পলি ব্যাগ কেনার চুক্তি হলেও বাস্তবতায় এবারের কোরবানি ঈদে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের চাহিদা ১৬ লাখ ৩০ হাজার পলি ব্যাগ।
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখে সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মাসুদ আহমেদ এবং উপপ্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান ভুঁইয়ার যৌথ স্বাক্ষরে ডিএনসিসির ১০টি অঞ্চলসহ কন্ট্রোল রুমের জন্য পলি ব্যাগের চাহিদা ছিল ১৬ লাখ ৩০ হাজার। অথচ ডিএনসিসির ভাণ্ডার থেকে পাওয়া টেন্ডার কার্যাদেশে পলি ব্যাগের চাহিদা দেওয়া হয় ১৭ লাখ ৩০ হাজার।
অঞ্চলভিত্তিক সংখ্যা হিসেবে অঞ্চল ১-এর জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার, অঞ্চল ২-এ ২ লাখ ৪০ হাজার, অঞ্চল ৩-এ ৩ লাখ, অঞ্চল ৪-এ ১ লাখ ৬০ হাজার, অঞ্চল ৫-এ ৩ লাখ, অঞ্চল ৬-এ ৭০ হাজার, অঞ্চল ৭-এ ১ লাখ, অঞ্চল ৮-এ ৫০ হাজার, অঞ্চল ৯-এ ১ লাখ, অঞ্চল ১০-এ ১ লাখ ২০ হাজার এবং জরুরি প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুমের জন্য ৫০ হাজার মোট ১৬ লাখ ৩০ হাজার পলি ব্যাগ। অথচ প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. কামরুজ্জামান রহস্যজনকভাবে অতিরিক্ত ১ লাখ পলি ব্যাগ বাড়িয়ে মোট ১৭ লাখ ৩০ হাজার পলিব্যাগ ক্রয়ের কার্যাদেশ জারি করেন।
অনিয়ম ধরা পরার আশঙ্কায় ভাণ্ডার কর্মকর্তার নির্দেশে ১৩ মে বুধবার ডিএনসিসির ভাণ্ডার থেকে ৫টি অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখ পলি ব্যাগ গোপনে সরিয়ে দেন ডিএনসিসির ভাণ্ডার কর্মকর্তা। এ বিষয়টি ডিএনসিসির ৫টি অঞ্চলে টেলিফোনে নিশ্চিত হয় এদিন অনুসন্ধানী টিম।
১৬ লাখ ৩০ হাজার পলি ব্যাগ চাহিদার অতিরিক্ত ১ লাখ পলি ব্যাগ টেন্ডার দেওয়ার বিষয় উপপ্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান ভুঁইয়া কোনো সদুত্তর না দিয়ে সম্পূর্ণ দায় ভাণ্ডার কর্মকর্তার ঘাড়ে চাপিয়ে সটকে পড়েন। আর ১৭ লাখ ৩০ হাজার নয়, ১৬ লাখ ৩০ হাজার পলি ব্যাগের গোপন তথ্য ফাঁসের পর, ঠিকাদার বকেয়া ১ লাখ ব্যাগ প্রস্তুতের বিষয়টি মেসেজ পাঠিয়ে জালিয়াতি আড়াল করার চেষ্টা করেন।
এদিকে গত ১৭ মে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মরগানের প্রতিনিধি ইব্রাহিম ফেরদাউসের টেন্ডারের শর্ত মেনে মালামাল সরবরাহের সপক্ষে এদিনকে প্রমাণ নিয়ে হাজির হওয়ার কথা থাকলেও তিনি আসেননি। উল্টো মরগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টেলিফোনে এদিন প্রতিবেদকের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন।
পলি ব্যাগ নিয়ে নজিরবিহীন অনিয়মের বিষয়ে ডিএনসিসি প্রশাসকের বক্তব্য জানতে চাইলে, ডিএনসিসির জনসংযোগ বিভাগ প্রশাসকের ব্যস্ততার অজুহাতে এড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার ইন্টারভিউয়ের জন্য জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেনকে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি রহস্যজনক নীরব ছিলেন।
একই দিন রাতে মরগান ওভেন ব্যাগ ইন্ডাষ্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নিয়াজ আলী চিশতী এই প্রতিবেদককে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেন। গত ১৮ মে পলি ব্যাগ কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে আবারও প্রশাসকের বক্তব্য জানতে ডিএনসিসির জনসংযোগ বিভাগে হোয়াটসঅ্যাপে পুনরায় যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









