নিজের জন্য কিছু না চেয়ে শতবর্ষী, অসুস্থ ও দৃষ্টিহীন দিদির চলাফেরার কষ্ট লাঘবে একটি ‘গাড়ি’ (হুইলচেয়ার) চেয়েছিল ৯ বছরের শিশু তুলি পাল। অভাবের সংসারে বড় হওয়া ও মাকে হারানো এক শিশুর এমন সরল ও মায়াভরা আবদার ছুঁয়ে গেছে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা প্রশাসনের মন। পরে শিশুটির আকুতিতে সাড়া দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হুইলচেয়ার ও নতুন পোশাক উপহার দিয়ে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা।
গত সোমবার (বা সম্প্রতি) নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে খালি গায়ে হাজির হয় তুলি। কারও কাছে সে শুনেছিল, ইউএনও অফিসে হুইলচেয়ারে সহায়তা পাওয়া যায়। সেই আশায় নিজের প্রয়োজনের কথা না ভেবে অসুস্থ দিদির জন্য হুইলচেয়ার চাইতে ছুটে আসে শিশুটি।
খালি গায়ে ইউএনও’র কার্যালয়ে গিয়ে সরল কণ্ঠে তুলি বলে, ‘আমার দিদির জন্য গাড়ি দেন।’ শিশুটির মুখে এমন কথা শুনে তাকে কাছে ডেকে নেন ইউএনও মো. মাসুদ রানা। পরে কথা বলে বেরিয়ে আসে তাদের জীবনের অভাব-অনটন ও বঞ্চনার করুণ গল্প।
জানা যায়, তুলি রায়পুরা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হরিপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বাবা নিরঞ্জন পাল, ভাই মহাদেবসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকে। তার বাবা পেশায় একজন জেলে, সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। প্রায় তিন-চার বছর আগে মাকে হারিয়েছেন তুলি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শতবর্ষী দিদি চোখে দেখতে পান না, ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। দিদিকে একটু স্বস্তিতে চলাফেরা করাতে হুইলচেয়ারের কথা শুনে তাই ছোট বয়সেই ইউএনও’র কাছে চলে আসে সে।
সেদিন তুলির সঙ্গে ছিল তার ফুফাতো ভাই কৃষ্ণও। তার জীবনেও রয়েছে মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়ার বেদনা। দুই শিশুর জীবনের এই বাস্তবতা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত অনেকেই।
শিশুদের কথা শুনে বিন্দুমাত্র দেরি করেননি ইউএনও মো. মাসুদ রানা। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তার দিদির জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি তুলি ও কৃষ্ণের জন্য নতুন পোশাকও কিনে দেওয়া হয়।
নতুন জামা পরে দিদির জন্য হুইলচেয়ার সঙ্গে নিয়ে যখন বাড়ির পথে রওনা দেয় তুলি, তখন তার মুখে ফুটে ওঠে নির্মল আনন্দের হাসি। উপজেলা প্রশাসনের কর্মীরা পরে রিকশায় করে তুলি, কৃষ্ণ ও হুইলচেয়ারটি তাদের হরিপুরের বাসায় পৌঁছে দেন।
এ বিষয়ে রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা বলেন, “তুলি পাল কারও কাছে শুনেছিল ইউএনও অফিসে হুইলচেয়ার পাওয়া যায়। সেই আশায় খালি গায়ে হন্তদন্ত হয়ে তার প্রতিবন্ধী দিদির জন্য হুইলচেয়ার চাইতে আমার কাছে চলে আসে। এসে সরলভাবে বলে, ‘আমার দিদির জন্য গাড়ি দেন।’ কথোপকথনে জানতে পারি, তার মা নেই এবং দিদি হাঁটতে পারেন না। বিষয়টি শুনে তার দিদির জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করি। একই সঙ্গে তাদের নতুন জামাকাপড় কিনে দেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, “খালি গায়ে আসা দুই শিশু যখন নতুন জামা পরে, দিদির জন্য হুইলচেয়ার নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেয়, তখন তাদের মুখে যে আনন্দ দেখেছি, তা সত্যিই অসাধারণ। নতুন জামা ও দিদির জন্য হুইলচেয়ার পেয়ে তুলির মায়াভরা হাসি কোনোদিন ভোলার নয়। তুলির জন্য শুভকামনা।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি হুইলচেয়ার হয়তো বড় কোনো আয়োজন নয়; কিন্তু নিজের প্রয়োজন ভুলে অসুস্থ দিদির জন্য একটি ‘গাড়ি’ চেয়ে নয় বছরের শিশুর করা এই আবদারের মানবিক মূল্য অনেক বেশি। অভাব-অনটনের মধ্যেও ভালোবাসা যে হারিয়ে যায় না, তুলির এই গল্প যেন তারই এক সুন্দর বাস্তবায়ন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









