রোহিঙ্গা কিংবা জলবায়ু সংকটের দায় বাংলাদেশের একার নয়। কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক বোঝা বাংলাদেশই বহন করছে। অথচ বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে এমন এক সময়, যখন দেশটি গত এক দশকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন পেলেও তার বড় অংশ ঋণনির্ভর। সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠছে— বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এই নতুন অবস্থান শুধু কি অর্থ নয়, নাকি আরো ন্যায্য অর্থায়নের দরজা খুলবে?
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত। যদিও এটি সরাসরি কোনো আর্থিক সুবিধা বা বিশেষ ক্ষমতার বিষয় নয়। তবে এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রভাব, দৃশ্যমানতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করে। কারণ ১৯৭৪ থেকে ২০২৬ সাল, জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যাত্রার গল্পটি বর্তমান অর্জনের সংযোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এমন বাস্তবতায় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পুরনো নায্য হিস্যার দ্বার উন্মুক্ত হবে নতুন করে।
সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু তহবিল, আন্তর্জাতিক চাকরি, এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য ও গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব—পাঁচ ফ্রন্টে বাংলাদেশের সামনে নতুন করে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কারণ, এতদিন সাধারণ সদস্য হিসেবে শুধু নিজেদের দাবির পক্ষে যৎসামান্য কথা বলার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, বিশ্বের ১৯৩টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সাধারণ অধিবেশনের পরিচালনা করবেন ড. খলিলুর রহমান। তাই সঙ্গত কারণেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নামটি একটু আলাদাভাবেই গুরুত্বের সাথে উচ্চারিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন দৈনিক এদিনকে বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ায় প্রথমত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পরিচিতি ও আস্থার জায়গাটা আরো বিস্তৃত হলো।
তিনি বলেন, সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের একটা লিডারশিপ তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বশান্তি ও অগ্রগতির জায়গায় আরো সুসংহত অবস্থানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আশা করি বাংলাদেশ এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারবে। যদিও এটি সরাসরি কোনো আর্থিক সুবিধা বা বিশেষ ক্ষমতা দেয় না। তবে এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রভাব, দৃশ্যমানতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের বিজয়ে বাংলাদেশ কিছু সুযোগ পেতে পারে। এর মধ্যে বৈশ্বিক কূটনীতিতে নেতৃত্বের সুযোগ পেল বাংলাদেশ। কারণ, সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা করেন সভাপতি। তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করেন এবং বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন। ফলে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর আরো জোরালোভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শোনা যাবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়ন ও ক্ষতিপূরণ ইস্যুতে সুবিধা পেতে পারে বাংলাদেশ। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে দেশটি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে সোচ্চার। এই পদে থাকায় জলবায়ু তহবিল, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড এবং অভিযোজন অর্থায়নের প্রশ্নে বাংলাদেশ আরো কার্যকরভাবে বৈশ্বিক সমর্থন গড়ে তুলতে পারে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকটকে নতুন করে সামনে আনার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখতে এবং নতুন কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ে এ অবস্থানকেও কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নির্বাচনে সমর্থন পাওয়া সহজ হতে পারে। বিশেষ করে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, কমিশন ও পরিষদে বাংলাদেশের প্রার্থিতা ভবিষ্যতে আরো গ্রহণযোগ্য হতে পারে। জাতিসংঘে এক বছর মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার একটি বড় প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত হলে উন্নয়ন সহযোগী, দাতা সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে। যদিও এটি সরাসরি বিনিয়োগ নিশ্চিত করে না, তবে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে। এসব ছাড়াও গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্বে বাংলাদেশের সম্ভাবনা এবং ঋণ, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রশ্নে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে।
এ ছাড়া উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDCs) স্বার্থ রক্ষায় আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। বিশেষ করে ঋণ সংকট, খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো ইস্যুতে। সবশেষে বাংলাদেশের কূটনীতিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ, জাতিসংঘ ব্যবস্থার ভেতরে বাংলাদেশের কূটনীতিকদের নেটওয়ার্ক ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পদে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে পারে। সব মিলিয়ে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘে “সফট পাওয়ার’’ ও কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির একটি বিরল সুযোগ- যা রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। কারণ, সভাপতি কোনো দেশের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন না; তাঁকে নিরপেক্ষ থাকতে হয়। ফলে বাংলাদেশ সরাসরি জাতীয় স্বার্থে এই পদ ব্যবহার করতে পারবে না। তবে দক্ষ কূটনীতির মাধ্যমে জাতীয় অগ্রাধিকারগুলোকে বৈশ্বিক আলোচনার অংশ করা সম্ভব।
এদিকে ড. খলিলুর রহমানের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বিষয়টি নিয়ে আগের তুলনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ কমছে। কমেছে খাদ্য সহায়তাও। এর ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে প্রত্যাবাসন কার্যক্রমও। তাই সভাপতির মেয়াদকালে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশেষ উচ্চপর্যায়ের সভার আয়োজন, দাতা দেশগুলোর অঙ্গীকার পুনরুজ্জীবিত করা ও মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে।
বিশেষ করে সর্বশেষ বিটিআর (First Biennial Transparency Report) রিপোর্ট অনুসারে ২০১৫-২৪ সময় বাংলাদেশ ১৫৪টি প্রকল্পে মোট ৯.৯১ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন পেয়েছে। এর মধ্যে অভিযোজনে ২.৭৩ বিলিয়ন ডলার, প্রশমনে ২.১৭ বিলিয়ন ও ক্রস কাটিংয়ে ৫.০১ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ গত এক দশকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন হিসেবে প্রায় ৯.৯১ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। কিন্তু এর বড় অংশ এসেছে ঋণ হিসেবে, অনুদান হিসেবে নয়। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—অনুদান হিসেবে পাওয়া প্রতি ১ ডলারের বিপরীতে প্রায় ৯৫ সেন্ট আসে ঋণ হিসেবে। এখানেই "ন্যায্য হিস্যা" প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন উঠছে— জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব কি বাংলাদেশের জন্য আরো ন্যায্য, অনুদানভিত্তিক অর্থায়নের দরজা খুলতে পারবে?
এ ছাড়া বাংলাদেশ শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবে। ফলে বাণিজ্য সুবিধা কমবে। নতুন বাজার দরকার হবে। উন্নয়ন সহযোগিতার ধরন বদলাবে। এমতাবস্থায় সভাপতির পদ কি বাংলাদেশের জন্য নতুন বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক জোট তৈরির সুযোগ এনে দিতে পারে?
বিশেষ করে বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে "গ্লোবাল সাউথ" একটি বড় শক্তি। এখানে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো রয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে কথা বলছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ কি গ্লোবাল সাউথের মুখপাত্র হয়ে উঠতে পারবে? একই সঙ্গে ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কতটা গভীর হতে পারে?
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টটিউিট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মোহাম্মদ আশিক রহমান বলেন, এটা অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন। কারণ, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের বিভিন্ন এজেন্ডা সেটিংয়ে সভাপতি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এ সুযোগে তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখতে কাজ করতে পারেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশ এবং আমেরিকার পারস্পরিক শুল্ক চুক্তির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









