চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে এতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ড. খলিলুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে স্বাক্ষর করেন দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ার।
স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য আলোচিত এআরটি চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে এক নজিরবিহীন বিতর্ক চলমান রয়েছে। খোদ ঢাকাতেই তীব্র নীতিগত মতভেদ ও রাজনৈতিক বিতর্ক চলমান রয়েছে। বিশেষ করে, বিশ্লেষক, নাগরিক সমাজ ও দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা সংস্থাসমূহ চুক্তিটির কঠোর ও একতরফা আইনি কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করে এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
আন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ মুহূর্তে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা, শুল্ক নীতির ভিত্তি এবং বর্তমান সরকারের মার্কিন বোয়িং বিমান ক্রয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও কৌশলগত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে চুক্তির শর্তে বাংলাদেশ শ্যাল (বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা) শব্দবন্ধটি ১৩১ বার এবং বিপরীতে ইউএস শ্যাল মাত্র ৬ বার ব্যবহার করার বিষয়টিকে, বাংলাদেশের সার্বভৌম বাণিজ্য নীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে আখ্যা দেয়। চীন ও রাশিয়ার মতো অ-বাজার অর্থনীতি দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে নিষেধাজ্ঞা এবং ডিজিটাল ডেটা সুরক্ষায় ছাড় দেওয়ার শর্তগুলো দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিটি নিয়ে বাংলাদেশর শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক, আইনজীবী এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তীব্র বিতর্কের আড়ালে এই চুক্তিতে লুকিয়ে আছে ভিন্ন এক বাস্তবতা।
চুক্তির প্রেক্ষাপট এবং দুই দেশের স্বার্থের সমন্বয়
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই চুক্তির প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ওয়াশিংটনের বর্তমান বাণিজ্য নীতি এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির দিকে তাকাতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্বজুড়ে আমেরিকার যে কঠোর বাণিজ্যনীতি এবং উচ্চ শুল্ক আরোপের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশও তার প্রভাবমুক্ত ছিল না। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) যখন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৩৭ শতাংশ ট্যাক্স বসানোর প্রস্তাব দেয়, তখন দেশের অর্থনীতি ও তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। আর এই সংকটময়ম মুহূর্তে দুই দেশের স্বার্থের এক অনন্য সমন্বয় ঘটায় (এআরটি) চুক্তি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির বিতর্কের আড়ালে থাকা কৌশলগত বাস্তবতা হলো। আমেরিকা চেয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের পণ্য বিক্রির একটি নিরাপদ বাজার এবং এ অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব কমানোর একটি রাজনৈতিক অবস্থান। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল যে কোনো মূল্যে আমেরিকার বাজারে নিজেদের রপ্তাানি বাজার ধরে রাখা। ফলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের তাগিদেই চুক্তিটি সম্পন্ন হয়, যেখানে উভয় পক্ষই নিজ নিজ কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চুক্তি সম্পাদনে আইনি ও নৈতিক সংকট
এই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তির বৈধতা নিয়ে দৈনিক এদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তাঁর মতে, একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও সার্বভৌম বাধ্যতামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করার কোনো আইনি বা নৈতিক এখতিয়ার থাকে না।
মনজিল মোরসেদ বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইনি কাঠামো ও শাসনতান্ত্রিক সংস্কৃতিতেও এ ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচনকালীন প্রশাসনের পক্ষে এমন বড় আকারের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদনের নজির নেই। তিনি বলেন, একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের মূল ম্যান্ডেট থাকে রাষ্ট্রসংস্কার ও একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন উপহার দেওয়া। পরবর্তী এক বা দুই দশকের জন্য দেশের অর্থনীতি ও আমদানি নীতিকে আইনিভাবে দায়বদ্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত একটি নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমেই অনুমোদিত হওয়া উচিত। ফলে এই চুক্তিটি শুরুতেই বড় ধরনের আইনি ও নৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে।
আইনি ও কারিগরি শর্তাবলির বাস্তব সুরক্ষা
ঐতিহাসিক এই চুক্তির ৩২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কারিগরি ও আইনি শর্তাবলি যা বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতি বদলে দিয়েছে। আইনি পরিভাষায় একে ‘ম্যানেজড ট্রেড' বা 'নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য চুক্তি' বলা হয়। চুক্তির প্রধান কারিগরি শর্তগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কের সীমা নির্ধারণ : চুক্তির অন্যতম প্রধান কারিগরি দিক হলো পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ট্যাক্স বেঁধে দেওয়া। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ৩৭ শতাংশ শুল্কের বিপরীতে বাংলাদেশি পণ্যের সর্বোচ্চ শুল্ক হার ১৯ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার আইনি নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
শুল্কমুক্ত মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার : বাংলাদেশ তার বাজারে ৭ হাজার ১৩২টি মার্কিন পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিতে সম্মত হয়েছে, যার মধ্যে ৪ হাজার ৯২২টি পণ্যে অবিলম্বে এবং বাকি ২,২১০টি পণ্যে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হবে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের ২ হাজার ৫০০ পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ অর্থনীতির দেশটি।
চুক্তির আইনি দুর্বলতা : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, চুক্তিটির সবচেয়ে দুর্বল কারিগরি দিক হলো এর শুল্ক কাঠামো। তিনি জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ৩৭ শতাংশ শুল্কের বিপরীতে এই চুক্তিতে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক খাতের জন্য সর্বোচ্চ শুল্ক হার ১৯ শতাংশে বেঁধে দেওয়ার আইনি নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক আইনি পর্যবেক্ষণ ও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ওই ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রাথমিক প্রস্তাব খোদ মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বাতিলের আদেশ দিয়েছে। কারণ দেশটির সর্বোচ্চ আদালত জানিয়েছেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) প্রয়োগ করে ওই শুল্ক আরোপ করেছিলেন, কিন্তু এই আইনটি (যুক্তরাষ্ট্রের) প্রেসিডেন্টকে এমন শুল্ক আরোপের একক ক্ষমতা দেয় না।
চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা : সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ অবশ্য মনে করেন, যেহেতু বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) দুই দেশের সরকারের (জিটুজি) অর্থাৎ ট্রাম্প প্রশাসন এবং বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেহেতু শুল্ক নিয়ে মার্কিন আদালতের রায়ের পর গড় শুল্কহার নিচে নেমে আসলেও মূল চুক্তিতে এর কোনো আইনি প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ, বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে এই পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির শর্তসমূহ পূরণ করতেই হবে।
ডেটা লোকালাইজেশন ও সাইবার নিরাপত্তা : চুক্তির অন্যতম স্পর্শকাতর কারিগরি শর্তানুযায়ী, মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর (যেমন: গুগল, মেটা) বা ব্যবহারকারীদের কোনো ডেটা বাংলাদেশের স্থানীয় সার্ভারে সংরক্ষণে ঢাকা কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে পারবে না। একই সঙ্গে, মার্কিন সফটওয়্যার বা ডিজিটাল সেবার ওপর বাংলাদেশ কোনো শুল্ক বা ডিজিটাল কর আরোপ করতে পারবে না। চুক্তির এক পিঠে এসব সুবিধা যুক্তিযুক্ত মনে হলেও, অপর পিঠে ডেটা লোকালাইজেশন ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকির একাধিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা ও নীতিগত ঝুঁকি
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইন গবেষক তানভীর হাসান জোহার মতে, এই চুক্তির ফলে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি স্বল্পমেয়াদে কম খরচে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবে এবং মার্কিন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হতে পারে। তবে একই সঙ্গে ডেটা সার্বভৌমত্ব, সাইবার নিরাপত্তা, অপরাধ তদন্ত প্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রাপ্তি এবং ভবিষ্যৎ ডিজিটাল করনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে বলে দৈনিক এদিনকে জানান তিনি।
জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বে আঘাতের শঙ্কা
তানভীর হাসান জোহা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সাইবার অপরাধ তদন্ত কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো সুরক্ষায় নির্দিষ্ট ধরনের ডেটা দেশের অভ্যন্তরে রাখার জাতীয় নীতি (ডেটা লোকালাইজেশন) গ্রহণ করতে চাইলে ঢাকা বড় ধরনের আইনি সীমাবদ্ধতার মুখে পড়বে। এ ছাড়া আন্তঃদেশীয় অপরাধ, সাইবার হামলা বা ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ডেটা বিদেশে সংরক্ষিত থাকলে, পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির (এমল্যাট) অধীন আদালতের আদেশ বা দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হবে, যা সংবেদনশীল অপরাধের তদন্ত প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, বাধ্যতামূলক ডেটা লোকালাইজেশন নীতি না থাকলে বাংলাদেশের স্থানীয় ডেটা সেন্টার শিল্প ও দেশীয় ক্লাউড ইকোসিস্টেম প্রত্যাশিত গতিতে বিকশিত হতে পারবে না। আপাতদৃষ্টিতে মার্কিন ডিজিটাল সেবায় শুল্ক ছাড় ইতিবাচক মনে হলেও, ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশ এই ক্রমবর্ধমান খাত থেকে কর আদায়ের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়াতে চায়, তবে দেশের সেই নীতিগত ও সার্বভৌম স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে।
উৎপত্তির নিয়মাবলি (রুলস অব অরিজিন)
চুক্তির কারিগরি শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশি তৈরি পোশাক যদি মার্কিন তুলা এবং কৃত্রিম সুতা (সিনথেটিক ফাইবার) দিয়ে তৈরি হয়, তবেই কেবল মার্কিন বাজারে বিশেষ শুল্কসুবিধা বা শূন্য-শুল্ক সুবিধা ত্বরান্বিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে এটি শর্ত মনে হলেও এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পেতে পারে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে উন্নত মানের তুলা ও কৃত্রিম সুতা আমদানির ফলে বাংলাদেশি পোশাকের (ব্রান্ড) গুণগতমান আন্তর্জাতিক বাজারে আরো বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বস্ত উৎস থেকে কাঁচামালের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় দেশের টেক্সটাইল খাতের দীর্ঘমেয়াদি সুতা ও কাপড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও প্রধান প্রধান কৃষিপণ্যের নিশ্চিত সরবরাহ দেশের শিল্প খাতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, যা ফলে বৈশ্বিক বাজার অস্থিতিশীল হলেও বাধাগ্রস্ত হবে না।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দৈনিক এদিনকে বলেন, আমেরিকার আদালত যখন বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত শুল্কের আইনি ভিত্তিই বাতিল ঘোষণা করেছে, তখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে রক্ষা করার যে কৌশলগত সুরক্ষাকবচ বা অজুহাত দেওয়া হচ্ছিল, তার আর কোনো আইনি বা বাস্তব ভিত্তি অবশিষ্ট নেই। যে সুবিধার প্রত্যাশায় বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি পণ্য এবং ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা) আমদানিতে আইনিভাবে দায়বদ্ধ; সেই সুবিধার মূল ভিত্তিটিই এখন বাতিলযোগ্য। এর ফলে চুক্তিটি টিকিয়ে রাখা ঢাকার জন্য সম্পূর্ণ একপেশে ও অর্থনৈতিকভাবে লোকসান ছাড়া আর কিছুই নয়।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও নীতিগত সংকট
ঢাকা-ওয়াশিংটন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিটির আইনি ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা নিয়ে দেশের নীতি-নির্ধারণী মহলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, চুক্তিটি বাতিলের জন্য প্রারম্ভিক যে তিন মাসের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত ছিল, তা ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে। ফলে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সামনে চুক্তিটি সরাসরি ও সহজে বাতিলের আইনি সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। এই আইনি সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও বাণিজ্যিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
মার্কিন অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার ও বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস
এআরটি চুক্তির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ মার্কিন বোয়িং কোম্পানি থেকে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ ক্রয়ের (বর্তমান সরকারের সময়) চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এই চুক্তি মার্কিন উৎপাদন খাত ও কর্মসংস্থানকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি দেশটির কাস্টমস শুল্ক আদায়ের পরিমাণ ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করবে, যা সরাসরি মার্কিন কোষাগারকে সমৃদ্ধ করবে। অপরদিকে অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ ক্রয়ের মাধ্যমে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর আধুনিকায়ন হবে, যা আন্তর্জাতিক রুটে এর বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। তবে ইউরোপীয় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সাথে চলমান আলোচনা বাদ দিয়ে মার্কিন বোয়িং কোম্পানি থেকে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ ক্রয়ের চুক্তি ভিন্ন ভাবে দেখছেন এভিয়েশন ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বোয়িং বিমান ক্রয় ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অভাব
ইউরোপীয় এয়ারবাসের সাথে চলমান আলোচনা বাদ দিয়ে মার্কিন বোয়িং কোম্পানি থেকে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ ক্রয়ের এই বৃহৎ অঙ্কের বিমান ক্রয় চুক্তি দেশের এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এভিয়েশন সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত সংকট : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বর্তমান বহর, রুট নেটওয়ার্ক, আর্থিক পরিস্থিতি এবং কারিগরি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অবকাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একসঙ্গে ১৪টি অত্যাধুনিক বিমান পরিচালনার ন্যূনতম সক্ষমতা জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থার নেই। বিমানের একজন সাবেক প্রকৌশলী ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রয়োজনীয় দক্ষ পাইলট, আধুনিক হ্যাঙ্গার ও প্রকৌশলগত সক্ষমতার চরম ঘাটতি রয়েছে। দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যিক বাস্তবতা বিবেচনা না করে, কেবল মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা দূর করার চাপে এই শর্ত মেনে নেওয়া হয়েছে, যা বিমানের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ : নতুন করে চুক্তি পর্যালোচনার বিকল্প নেই
বর্তমান পরিবর্তিত আইনি ও কৌশলগত বাস্তবতায় দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশ সরকারকে এই চুক্তিটি অবিলম্বে স্থগিত করে নতুন করে আলোচনা শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী এটি বাতিল করার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঢাকা ও ওয়াশিংটন আলোচনার মাধ্যমে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ঢাকা-ওয়াশিংটন আলোচনায় বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
আমদানির কঠোর শর্ত শিথিলকরণ
১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানির বাধ্যবাধকতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নবনির্বাচিত সরকারের উচিত মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই শর্তগুলোর সময়সীমা ও আমদানির পরিমাণ পুনর্মূল্যায়ন করা।
বিমান ক্রয় চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন : সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ কমাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড ক্যাপাসিটি ও রুটের সক্ষমতা বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে বিমান সরবরাহের সময়সীমা ২০৩৫ সাল থেকে আরও বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিমান ক্রয় চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন সংক্রান্ত এই প্রক্রিয়ায় উড়োজাহাজ বহর সম্প্রসারণের চাপ কমিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এর মূল লক্ষ্য।
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা : চীন ও রাশিয়ার মতো অ-বাজার অর্থনীতির দেশগুলোর সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের স্বাধীন বাণিজ্য নীতি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় এই অসম ধারাগুলো পরিবর্তন করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঢাকা-ওয়াশিংটন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে সুরক্ষার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে প্রচার করা হলেও, পরিবর্তিত আইনি বাস্তবতায় এটি দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে তীব্র ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের পরামর্শ অনুসারে বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে নতুন করে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনা শুরু করাই হবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একমাত্র সঠিক পথ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









