দীর্ঘদিনের বৈরী রাজনৈতিক সম্পর্ক, সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক শত্রুতা, অবিশ্বাস এবং এর পেছনে থাকা মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক টানাড়পেনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অবশেষে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। এই ধরনের চুক্তি স্থায়ী শান্তি না আনলেও, বড় ধরনের যুদ্ধ বা সংঘাত এড়াতে একটি সাময়িক ঢাল হিসেবে কাজ করবে বলে বলছেন বিশ্লেষকরা। একইভাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রবল পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রকে চরম প্রতিকূলতা ও মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
ইরানের এই অসম সামরিক কৌশলের কারণে মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক আধিপত্য যখন বড় ধরনের ধাক্কা খায়, তখন আন্তর্জাতিক মহলে একে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় নীতিগত বা কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। এই পুরো পরিস্থিতিটি দেখায় যে, কীভাবে প্রবল সামরিক বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও, কৌশলগত চালের কারণে একটি পরাশক্তিকে চরম সতর্কতার সাথে চুক্তি বা সমঝোতার পথ বেছে নিতে হয়।
দীর্ঘদিনের চরম উত্তেজনা ও সামরিক বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে একদিন আগেই এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ইসরাইলের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার চার মাস পর এই চুক্তি হলো। ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে জি৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পরবর্তীতে তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই চুক্তিতে সই করেন। ১৪ দফার এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা। এই সমঝোতা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দুই দেশকে একটি চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছে।
১৪ দফার এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের সামনে এখন নতুন কিছু বাধ্যবাধকতা এবং অর্থনৈতিক রূপরেখা তৈরি হয়েছে।
সেগুলো হলো-
এই প্রাথমিক চুক্তিটি সই হওয়ার পর আগামী ৬০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে একটি চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য অবিলম্বে উন্মুক্ত করা হবে। মার্কিন প্রশাসন ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। একই সঙ্গে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ বিশেষ ছাড়পত্র জারি করবে, যার ফলে ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে পুনরায় অবাধে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি করতে পারবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সহযোগিতায় অন্তত ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইরনা’ ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের চুক্তি সইয়ের ছবি প্রকাশ করেছে। ছবিতে পেজেশকিয়ানকে ফারসি ভাষায় লেখা একটি নথি হাতে ধরে থাকতে দেখা যায়, যার নিচে তার এবং ট্রাম্পের সই দৃশ্যমান। এই চুক্তির একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে চলমান সামরিক অভিযানের অবসান ঘটিয়েছে, যেখানে সম্প্রতি ইসরাইল লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছিলো।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে চুক্তির একটি অনুলিপি ইসরাইলের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করে ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, ‘তারা (ইসরাইল সামরিকভাবে) আরও ভালো করতে পারতো। ৮০০ শব্দের এই ১৪-দফা পরিকল্পনাটি কার্যকর হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থীতিশীলতা ফিরে আসবে বলে আশা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









