জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিভিডি)। দেশের গরিব অসহায় ও মধ্যবিত্ত হৃদরোগে আক্রান্ত লাখ লাখ মানুষের একমাত্র শেষ ভরসাস্থল। কিন্তু এই হাসপাতালের ভেতরেই প্রতিদিন চিকিৎসার আড়ালে ঘটছে এক ভয়ানক ঘটনা। সরকারি এই হাসপাতালের ভেতর থেকে হৃদরোগে আক্রান্ত শত শত রোগীর ছাড়পত্র গোপনে পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের প্রভাবশালী ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের হাতে। হাসপাতালের ভেতর প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে পরিচালিত একটি সাধারণ ফটোকপি দোকানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
তবে ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনদের আশঙ্কা আরো গুরুতর। তাদের অভিযোগ, এই ছাড়পত্রে থাকে রোগীর নাম-ঠিকানাসহ আরো নানা গোপন তথ্য। সেই ছাড়পত্র যে শুধু ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের হাতে যায় তার নিশ্চয়তা কী! এমনও তো হতে পারে এসব কাগজপত্র অন্য কোনো চক্রের হাতে চলে যায়। যা দিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের ক্ষতির শিকার হতে পারেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। কাজেই রোগের হাত থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরলেও অন্য যেকোনোভাবে সব হারানোর শঙ্কায় থাকেন তারা।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই গোপন বাণিজ্যের রহস্য উদঘাটনে গত ১৮ জুন (বৃহস্পতিবার) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এই হাসপাতালের অভ্যন্তরে অবস্থান করেন দৈনিক এদিনের বিশেষ প্রতিবেদক। দীর্ঘ ৮ ঘণ্টার এই সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে রোগীদের তথ্য চুরির এক চাঞ্চল্যকর চিত্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই অনিয়মের সাথে সরাসরি জড়িত হাসপাতালের নার্স, ফটোকপি দোকানদার, আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য এবং ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল প্রমোশন অফিসাররা।
সরেজমিন চিত্র: যেভাবে চলে ছাড়পত্র মিশন
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকেই সুস্থ কিংবা চিকিৎসা চলমান রোগীরা যখন হাসপাতাল ছাড়ার প্রস্তুতি নেন, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ড বা কেবিনের নার্সরা তাদের একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন হাসপাতাল ত্যাগের পূর্বে ছাড়পত্রের এক কপি ওয়ার্ডে জমা দিয়ে যেতে হবে। আর এই ফটোকপি করার জন্য নার্সরাই রোগীদের সুনির্দিষ্টভাবে দেখিয়ে দেন হাসপাতালের ক্যান্টিন সংলগ্ন ভেতরের ফটোকপি দোকানটি।
সরল বিশ্বাসে রোগী বা তাদের স্বজনরা সেই দোকানে যান একটি ফটোকপি করতে। কিন্তু প্রতিবেদকের চোখে ধরা পড়ে এক ভিন্ন চিত্র। রোগী যখন একটি কপি করার অনুরোধ করেন, দোকানদার চতুরতার সাথে মেশিনের বোতাম টিপে মূল ছাড়পত্রটির অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০টি করে কপি বের করে আলাদা একটি ড্রয়ারে বা টেবিলের নিচে লুকিয়ে ফেলেন। রোগীর স্বজনরা কাউন্টারের ওপাশে কী ঘটছে, তা টের পাওয়ার আগেই তাদের একটি কপি দিয়ে বিদায় করা হয়।
বিকেল ৪টা বাজতেই শুরু হয় এই বাণিজ্যের দ্বিতীয় অংক। সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামনেই ওই ফটোকপি দোকানদার ড্রয়ার থেকে শত শত কপি ছাড়পত্র বের করছেন। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় বিভিন্ন নামী-অনামী ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। ফটোকপি কাউন্টারে বসেই ছাড়পত্রগুলো বুঝে নেন। এরপর প্রকাশ্যেই হাসপাতাল চত্বরে ছাড়পত্রগুলো নিজেদের ব্যাগে ভরে চলে যান তারা। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সেখানে উপস্থিত আনসার সদস্যদের ভূমিকা ছিল নির্বিকার, যা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে এই চক্রের লভ্যাংশ পৌঁছায় অনেক দূর পর্যন্ত।
হৃদরোগীদের ছাড়পত্র দিয়ে কী করেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা?
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, একজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীর ছাড়পত্র দিয়ে ওষুধ কোম্পানির কী কাজ? অনুসন্ধানী এই অনিয়মের পেছনে কর্পোরেট বাণিজ্যের দুটি মূল উদ্দেশ্য বেরিয়ে এসেছে।
প্রেসক্রিপশন ট্র্যাকিং ও মার্কেট অডিট: ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নিয়মিত চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন বা ছাড়পত্র ট্র্যাক করে। হৃদরোগের ওষুধগুলো সাধারণত অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং রোগীদের আজীবন এই ওষুধ খেতে হয়। কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসক তাদের কোম্পানির ওষুধ রোগীদের দিচ্ছেন কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত হতেই এই ছাড়পত্রগুলো সংগ্রহ করা হয়। একে ঔষধ কোম্পানীর ভাষায় প্রেসক্রিপশন অডিট নামে ডাকা হয়।
চিকিৎসকদের ওপর অনৈতিক প্রভাব বিস্তার: এই ছাড়পত্রগুলোতে থাকা রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে ওষুধ কোম্পানিগুলো জানতে পারে কোন চিকিৎসক কোন কোন কোম্পানির ওষুধ লিখছেন। পরবর্তীতে সেই চিকিৎসকদের টার্গেট করে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা বিভিন্ন উপহার, বিদেশ ভ্রমণের টিকিট, কনফারেন্সের স্পন্সরশিপ বা অনৈতিক আর্থিক সুবিধা অফারের প্রলোভন দেখিয়ে ডাক্তারদের দিয়ে নিজেদের ওষুধ লিখতে। যা সরাসরি হাসপাতাল প্রশাসন চিকিৎসকদের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক ও বাণিজ্যিক চাপ তৈরি সুযোগ করে দেয়।
চিকিৎসা নীতিমালার পরিপন্থী: আন্তর্জাতিক মেডিকেল কোড অব কন্ডাক্ট এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন অনুযায়ী, রোগীর তথ্য গোপন রাখা চিকিৎসাসেবার প্রাথমিক শর্ত। ওষুধ কোম্পানিগুলোর এই তথ্য সংগ্রহের ফলে বাজারে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। কম মূল্যের ভালো ওষুধ থাকা সত্ত্বেও রোগীরা চিকিৎসকদের প্রভাবিত প্রেসক্রিপশনের কারণে বেশি দামে ওষুধ কিনতে বাধ্য হন, যা সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণার শামিল।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী। তিনি দৈনিক এদিনের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন রোগীর ছাড়পত্র বা প্রেসক্রিপশন সম্পূর্ণ গোপন ও সংবেদনশীল দলিল। হাসপাতাল প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট।’ এ সময় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
এই চক্রের আইনি ও সাংবিধানিক অপরাধের দিকটি বিশ্লেষণ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দৈনিক এদিনকে বলেন, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে রোগীর ছাড়পত্রের ছবি তোলা বা স্ক্যান কপি আদান-প্রদান করা দেশের বিদ্যমান সাইবার নিরাপত্তা আইনের (বা ডাটা প্রাইভেসি আইন) অধীনে একটি গুরুতর অপরাধ। তিনি আরো যোগ করেন, রোগী কিংবা সচেতন নাগরিক হিসেবে এই অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে অতিরিক্ত কপি করায় দণ্ডবিধির বাংলাদেশ দণ্ডবিধি (পেনাল কোড) ৪২০ (প্রতারণা) এবং ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) ধারায় ওই ফটোকপি দোকানদার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং জড়িত ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যাবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির দৈনিক এদিনকে বলেন, মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা চিকিৎসকদের কাছে কেবল ওষুধের বৈজ্ঞানিক গুণাগুণ ও কার্যকারিতা তুলে ধরবেন এমন সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে কোনো কোনো কোম্পানি বা স্থানীয় বিক্রয় দল যদি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপে পড়ে এমন অনিয়মের আশ্রয় নেয়, তবে সেটি তাদের নিজস্ব নীতিগত অপরাধ। দেশের সব ওষুধ কোম্পানিকে তাদের প্রতিনিধিদের এ ধরনের অনৈতিক তৎপরতা থেকে বিরত রাখতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের মতো একটি শীর্ষস্থানীয় বিশেষায়িত হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ধরে চলা ছাড়পত্র বাণিজ্য দেশের সামগ্রিক সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাকে কতটা ক্ষুণ্ণ করছে? এ বিষয়ে টেলিফোনে জানতে চাওয়া হয়েছিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনের কাছে। বিষয়টি শুনে চরম বিস্ময় প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। দৈনিক এদিনকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে এমন অনৈতিক বাণিজ্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি বলেন, অতি দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা দেশের অসহায় ও সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য পাচার এবং বাণিজ্যের যে উৎসব চলছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা বলেন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের এই সুসংগঠিত সিন্ডিকেট ভাঙতে কেবল তদন্ত কমিটি গঠন করাই যথেষ্ট নয়; বরং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে, দেশের সব সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রকে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আনা এবং হাসপাতাল চত্বরে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অননুমোদিত প্রবেশ ও অনৈতিক তৎপরতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









