টিউমার, ক্যানসারের বিস্তার, রক্তনালীর ব্লক ও মস্তিষ্কের জটিল রোগ নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই পরীক্ষায় ‘কনট্রাস্ট মিডিয়া’ বা ডাই ব্যবহারের পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। এই রাসায়নিক পদার্থমাধ্যমে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ, রক্তনালী ও নরম টিস্যুর অত্যন্ত স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বেশি দাম ও অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে বা কমমূল্যে ডাই সরবরাহ করা হয় না।
অনুসন্ধান বলছে, এই ডাই (রাসায়নিক পদার্থ) ঘিরে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর ভেতরে গড়ে উঠেছে বিশাল সিন্ডিকেট। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মতো বড় চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ডাই (কনট্রাস্ট) বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে অনেক সময় ডাই ব্যবহারের কোনো নির্দেশনা না থাকলেও কর্তব্যরত মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা নিজেদের উদ্যোগে রোগীদের এই পরীক্ষা করিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল এবং জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মতো বড় চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ডাই বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। ভুক্তভোগীদের দাবি, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে প্রয়োজন উল্লেখ না থাকলেও অনেক সময় টেকনোলজিস্টরা নিজস্ব উদ্যোগে ডাই ব্যবহারের কথা বলে স্বজনদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সুরক্ষা নির্দেশিকা উপেক্ষা করেই দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চলছে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই পরীক্ষা, যার সত্যতা মিলেছে খোদ চিকিৎসকদের স্বীকারোক্তিতে। নিয়ম অনুযায়ী একজন প্রশিক্ষিত নার্সের মাধ্যমে রোগীর শরীরে ডাই পুশ করার কথা থাকলেও, তা করছেন টেকনোলজিস্ট বা তাদের সহকারীরা। এ ছাড়া ডাই ব্যবহারের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য গোপন রেখেই রোগীদের এই সেবা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক নিয়মে রোগীর পরিবারের কাছ থেকে লিখিত আইনি সম্মতি বা ইনফর্মড কনসেন্ট নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, সরকারি হাসপাতালে তা মানা হচ্ছে না।
গত ১৬ জুন এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ঢাকার ৫ সরকারি হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে সরেজমিন অনুসন্ধান চালায় দৈনিক এদিন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের সিটি স্ক্যান কক্ষে দেখা যায়, বহির্বিভাগ ও ইনডোরে ভর্তি রোগীরা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ডাই ব্যবহারের নির্দেশনা নিয়ে অপেক্ষা করছেন। নিয়ম অনুযায়ী রোগীদের এই ডাই বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনে আনার কথা থাকলেও, সেখানে কর্তব্যরত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ডাই বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি রোগীদের ফার্মেসিতে না পাঠিয়ে, নিজেদের কাছে থাকা ডাই অতিরিক্ত মূল্যে সরাসরি কেনার প্রস্তাব দিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই পরীক্ষার জন্য সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে ডাই বা কনট্রাস্ট মিডিয়া ব্যবহারের নামে প্রতি রোগীর কাছ থেকে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। সাধারণ ফার্মেসিতে এই ডাইয়ের বাজারমূল্য ১ হাজার ৩শ টাকা হলেও, হাসপাতাল কেন্দ্রের ভেতরেই রোগীদের বাড়তি টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের ইনচার্জ মোঃ জাকির হোসেন দৈনিক এদিনের কাছে বিষয়টি নিজেই অবগত বলে স্বীকার করেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও অনুসন্ধানে মিলেছে অননুমোদিত ডাই বাণিজ্যের প্রমাণ। হাসপাতালটির রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের ইনচার্জ আব্দুল মালেক শরীফ দৈনিক এদিন এর কাছে স্বীকার করেছেন, সিটি স্ক্যান কক্ষের ভেতরেই রোগীদের সুবিধায় ডাই বিক্রি করছেন তারা। সরেজমিনে সেখানে এক টেকনোলজিস্ট ও এক বৃদ্ধা নারীর মধ্যে কথাকাটাকাটি হতে দেখা যায়। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, দরিদ্র কোটায় সিটি স্ক্যান ফি মওকুফ হওয়া সত্ত্বেও ডাই ব্যবহারের কথা বলে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক ১ হাজার ৩০০ টাকা দাবি করা হচ্ছে। স্পষ্ট হয় - চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী রোগীর আদৌ ডাই প্রয়োজন কি না, সে বিষয়ে স্বজনদের আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি।
এসব সুনির্দিষ্ট অনিয়মের বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক এদিনকে বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ ডাই বাণিজ্যে যুক্ত থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও মানসিক হাসপাতালে ডাই বাণিজ্যের নেপথ্যে দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক শূন্যতা ও কর্মচারী সিন্ডিকেটের তথ্য মিলেছে। কিডনি হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের ইনচার্জ মোঃ আতিকুর রহমান সিদ্দিকী দৈনিক এদিন এর কাছে স্বীকার করেন, বিশেষ বরাদ্দের বাইরে গত তিন বছর ধরে এখানে সরকারিভাবে কোনো ডাই কেনা হয় না। এই প্রশাসনিক ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা ভেতরেই সরাসরি ডাই বিক্রি করছেন। ইনচার্জ এর দায় ওষুধ কোম্পানিগুলোর ওপর চাপালেও হাসপাতাল দুটির একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে রোগীরা বাইরে থেকে ডাই কেনার সুযোগ পাচ্ছেন না এবং হাসপাতালের ভেতরেই দ্বিগুণ দাম দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এ বিষয় দৈনিক এদিনে সাথে কথা হয় জাতীয় কিডনি হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের প্রধান ডা. তাহমিনা ইসলামের। তিনি নিজের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের সুরক্ষামূলক ঘাটতির কথা সরাসরি স্বীকার করেছেন। দৈনিক এদিন কে তিনি জানান, একটি আদর্শ সিটি স্ক্যান কক্ষের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তাদের হাসপাতালেও নেই, যা দেশের সামগ্রিক সরকারি হাসপাতালের বাস্তব চিত্র। তিনি আরও নিশ্চিত করেন, ডাই ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত লিখিত ইনফর্মড কনসেন্ট নেওয়ার আইনি নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। অর্থাৎ নানাবিধ চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে ডাই ব্যবহারের পর কোনো রোগীর তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা মৃত্যু হলে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইনি জটিলতা এড়াতে এর পুরো দায় রোগীর স্বজনদের ওপর চাপিয়ে দেয়।
ডাই বা কনট্রাস্ট বাণিজ্যের সিন্ডিকেট থেকে বাদ পড়েনি মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালও। অন্যান্য বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের মতো ক্যান্সার হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগেও মিলেছে চরম অব্যবস্থাপনার তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করাতে আসা ক্যানসার রোগীদের বাইরের ফার্মেসি থেকে ডাই না কিনতে বাধ্য করছে একটি অসাধু চক্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের এক ইনচার্জ ভয়াবহ তথ্য ফাঁস করেছেন। তাঁর দাবি, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কেউ কেউ সিটি স্ক্যান বা এমআরআই পরীক্ষার সময় রোগীদের ব্যবহৃত ডাই সম্পূর্ণ পুশ না করে বোতল থেকে অল্প অল্প করে বাঁচিয়ে রাখেন। পরবর্তীতে সেই ব্যবহৃত ডাই অন্য রোগীদের কাছে বিক্রি করা হয়।
এদিকে দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই রোগীর পকেট থেকে যাওয়ার তথ্য উল্লেখ করে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন। তিনি বলেন, সরকারি চিকিৎসা খরচের প্রায় ৮৮ শতাংশই যায় বাইরে থেকে ওষুধ কেনার পেছনে। দৈনিক এদিনকে তিনি বলেন, হাসপাতালে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ডাই সরবরাহ থাকলে হয়তো এই সিন্ডিকেট বাণিজ্য রুখে দেওয়া সম্ভব হতো। এসময় অসহায় দরিদ্র রোগীদের সুরক্ষায় এবারের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা সেবায় একই মান নিশ্চিত করার জোর তাগিদ দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
এ বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের (হাসপাতাল অনুবিভাগ) অতিরিক্ত সচিব এ এন এম মঈনুল ইসলামের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে দৈনিক এদিন। তিনি জানান, এসব অনিয়ম খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি হাসপাতাল প্রধানদের নির্দেশনা দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সভায় উপস্থাপন করা হবে। অতিরিক্ত সচিব স্পষ্ট করে বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে বিধিমালা বা রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন্স এর বাইরে কোনো ধরনের অনিয়ম করার সুযোগ থাকবে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









