একদিকে গ্যাস সংকট, অন্যদিকে লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমে সারা দেশের লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। ঢাকার বাইরে কোথাও বলতে গেলে সারা দিন বিদ্যুৎ থাকছেই না। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে। কোথাও একবার গেলে কয়েক ঘণ্টায়ও আসছে না। গরমে চরম ভোগান্তিতে আছে মানুষ। বিতরণ কোম্পানির সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। দেশজুড়ে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামের পরিস্থিতি অতি ভয়াবহ। কিছু এলাকায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। দেশজুড়ে এই অভূতপূর্ব গ্যাস সংকট এবং এর প্রভাবে বিদ্যুতে ধারাবাহিক লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ থমকে যেতে বসেছে। তবে রাজধানীতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ঢাকায় ‘সান্ত্বনার’ বিদ্যুৎ মিললেও ঢাকার বাইরে যন্ত্রণা বেড়েই চলেছে। বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাস সংকটও প্রকট থেকে প্রকটতর হওয়ায় যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ে পরিণত হয়েছে।
গ্রামীণ জনপদের পাশাপাশি শহরাঞ্চলেও রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় সার্বিক পরিস্থিতি করুণ রূপ ধারণ করেছে। চরম খরতাপ ও প্রখর গরমের মধ্যে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকা এবং অন্যদিকে বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাস না পাওয়ার কারণে সাধারণ নাগরিকদের অসন্তোষ ও ক্ষোভ এখন চরমসীমায় পৌঁছেছে। গ্রাহকদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছেন গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গ্যাস-বিদ্যুৎ না পেয়ে বাড়ছে মানুষের ক্ষোভ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মীরাও ভুগছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আতঙ্কের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী কর্মীরা। এমতাবস্থায় আইনশৃ্ঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কর্মীদের নিরাপত্তা চেয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। সংস্থাটি ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে। গ্রামাঞ্চলে প্রায় ৪০ শতাংশ লোডশেডিংয়ের ফলে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বিভিন্ন এলাকায়। এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ও স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়ে গতকাল বুধবার পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি সংকট ও তীব্র দাবদাহের কারণে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
এতে গত কয়েক দিনে চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পাওয়ায় বেড়ে গেছে লোডশেডিং। দৈনিক গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের ফলে বিভিন্ন স্থানে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর করছে। এতে সেখানকার কর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এ অবস্থায় কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে। চিঠির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, বিদ্যুৎ সচিবের একান্ত সচিব এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবকে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের সব জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ও জেনারেল ম্যানেজার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ওসিদের কাছেও অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
গতকাল বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বঙ্গোপসাগর উত্তাল হওয়ার কারণে ভাসমান টাওয়ার সামিট থেকে জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না বলে হঠাৎ করে আবার সংকট শুরু। সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সমস্যা সমাধানের জন্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়ে কারও হাত নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বুধবার (গতকাল) বিকাল নাগাদ গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা কিছুটা কমবে। লোডশেডিং কমে আসবে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতির কারণে এই সংকট চলছে বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেকোনো সময় এই সংকটের মুখোমুখি হতে হতো দেশকে। ভোগান্তির জন্য মানুষের কাছে আবার ক্ষমা চেয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।
গতকাল বুধবার জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৪৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট। ভোর ৪টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৩ হাজার ১৮ মেগাওয়াট; লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট। রাত ১টায় লোডশেডিং বেড়ে ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। গতকাল বিদ্যুতের সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট। এর আগে অবশ্য লোডশেডিং ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে দেশে ৫ কোটি ২০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি গ্রাহকই আরইবির। অর্থাৎ মোট গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ এসব সমিতির আওতায়।
উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও তাদের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। আগে থেকেই জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে একটি এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। ফলে কয়েকদিন ধরেই বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের গ্রাহকরা বিক্ষোভ, ভাঙচুর করছেন। গত ১০ আগস্ট টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে জামুর্কি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সাবস্টেশনে হামলা চালান বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। সেখানে আব্দুল লতিফ নামে এক লাইনম্যানকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরদিন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর করেন। এর আগে গত ১ আগস্ট রাতে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে স্থানীয় গ্রাহকরা আফতাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ এরিয়া অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। একই দিন পাবনার ঈশ্বরদীতে অসহনীয় লোডশেডিং ও বেশি বিলের অভিযোগে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর এক মিটার রিডারকে প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কর্মকর্তারাও গ্রাহকদের রোষের মুখে পড়েন।
নেত্রকোনায় দিন-রাত মিলিয়ে কোনো কোনো এলাকায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন করা হয়েছে। নীলফামারীর ডোমার জোনাল অফিসের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানায় লিখিতভাবে নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। সেখানে সাদা পোশাকে পুলিশি নজরদারি ও রাতে টহল বাড়ানো হয়েছে। ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গোপালগঞ্জ এলাকায় কর্মরত কর্মীদের নিরাপত্তা চেয়ে জেলা পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে সম্প্রতি।
ফের কমেছে গ্যাস সরবরাহ
পল্লী এলাকায় লোডশেডিং বাড়ার পেছনে জ্বালানি সংকট বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। গত কয়েক দিন কিছুটা স্বস্তির পর আবার কমেছে এলএনজি সরবরাহ। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজি কার্গো টার্মিনালে যুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় মহেশখালীতে সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।
দুই টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ এখন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস নিয়ে ভোগান্তি বেড়ে যায়। ১৫ দিন পর আংশিক চালুর পর গ্যাস সরবরাহ উন্নতি হলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী একটি কার্গো সামিট পরিচালিত টার্মিনালে যুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। দুই টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ এখন প্রায় ৪১ কোটি ঘনফুট। অথচ টার্মিনাল দুটির সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট।
এদিকে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু থাকলেও পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরাতে সাময়িক বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে টার্মিনালটির সক্ষমতা ৫৫ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট। বৈরী আবহাওয়ায় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত মঙ্গলবার থেকে আবার বেড়েছে গ্যাস সংকট। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে সব খাতে এর প্রভাব পড়ছে। মঙ্গলবার রাত থেকেই সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস না পেয়ে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন মানুষ। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কল্যাণপুরের একটি সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। হঠাৎ স্টেশনের কর্মীরা মাইকে ঘোষণা দেন—‘গ্যাসের চাপ নেই। দয়া করে আপনারা আর লাইনে দাঁড়াবেন না।’
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, পূর্ণ সক্ষমতায় টার্মিনালটি চালাতে একটি বয়লার সচল করতে হবে। এ জন্য প্রায় ৭২ ঘণ্টা টার্মিনালটির উৎপাদন বন্ধ থাকতে পারে। কোন সময়ে বন্ধ রাখলে বিদ্যুৎ, শিল্পসহ অন্যান্য খাতে প্রভাব কম হবে, তা নিয়ে এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন- ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘দীর্ঘদিনের এই সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সুযোগ আছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমান সরকারকে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমেই এ খাতে অযৌক্তিক ব্যয় কমাতে হবে। অযোগ্য লোকদের সরিয়ে সঠিক স্থানে সঠিক লোক বসাতে হবে।’‘এই মুহূর্তে সংকট কাটাতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো খুবই জরুরি। ব্যয়বহুল ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করলে ৪২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যা দিয়ে বছরে ২ কোটি টন কয়লা আমদানি করা যাবে। এতে তুলনামূলক কমদামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি,’ যোগ করেন তিনি। বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে ‘মুমূর্ষু রোগী’র সঙ্গে তুলনা করে এই বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, ‘মন্ত্রণালয়ে এবং সরকারের আশপাশে যারা আছেন তারা ভুল বোঝানোর কারণে সরকার অন্ধকারে রয়েছে। এটা সরকারকে বুঝতে হবে। না হলে সংকট আরো বাড়বে।’
অপরদিকে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বললেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। আমদানি করা এলএনজি দিয়ে সমাধান হবে না। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যাপক জোর দেওয়া খুবই জরুরি।’
চুলা জ্বলছে না বাসায়; ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন
আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, সকাল ৮টার পর থেকে চুলায় আগুন নেই। দুপুর গড়িয়ে গেলেও রান্না করতে পারেননি শারমিন আক্তার। অপেক্ষা করেছেন গ্যাস আসবে বলে। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের বাসিন্দা শারমিন আক্তারের গতকাল বুধবার সকাল কেটেছে এভাবেই। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে গ্যাস নেই। দুপুরের রান্নাও করতে পারিনি। হঠাৎ আবার এভাবে গ্যাস চলে যাওয়ায় খুব সমস্যায় পড়েছি।’শুধু শারমিন নন, আবার গ্যাস-সংকটে পড়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। বাসাবাড়ির পাশাপাশি সংকট দেখা দিয়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও। আজ নগরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্যাসচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ বলে জানিয়েছেন চালকেরা। মোহাম্মদ নোমান নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সকাল ৭টায় ষোলোশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস নিতে লাইনে দাঁড়ান। বেলা সাড়ে ১১টায়ও তিনি গ্যাস পাননি। পরে বলেন, নগরের টাইগারপাসসহ কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে ঘুরে গ্যাস পাননি। ফসিল ফিলিং স্টেশনে গ্যাস দিলেও চাপ কম। তাই দেরি হচ্ছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহন লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) বলছে, মঙ্গলবার রাত থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ কমে গেছে। গতকাল সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। অথচ চট্টগ্রামে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। সে হিসাবে চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
এবার সংকটের কারণ অবশ্য ভিন্ন। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণে নয়, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী নতুন জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সরবরাহ কমেছে। মাত্র কয়েক দিন আগেও গ্যাসের জন্য চট্টগ্রামের ফিলিং স্টেশনগুলোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন চালকেরা। কেউ গাড়িতে রাত কাটিয়েছেন। কেউ চার থেকে আট ঘণ্টা লাইনে থেকেও গ্যাস পাননি। ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লার চালু হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল।
ফিলিং স্টেশনগুলোর দীর্ঘ লাইনও কমে আসে। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হলো না। মঙ্গলবার রাত থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার পর গতকালও আবার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গাড়ির সারি তৈরি হয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় যানবাহনে গ্যাস ভরতেও বেশি সময় লাগছে। বাসাবাড়িতেও এর প্রভাব পড়েছে।
নতুন করে সংকট তৈরির কারণ সম্পর্কে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. শোয়েব বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ মহেশখালীর টার্মিনালে ভিড়তে পারছে না। টার্মিনালে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতির একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। বর্তমানে বাতাসের গতি সেই সীমার চেয়ে বেশি। মো. শোয়েব আরো বলেন, জাহাজ ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতি ২০ নটের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে তা প্রায় ৩৮ নট। ফলে নিরাপত্তার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভেড়ানো যাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলার এই কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে মহেশখালীর টার্মিনালগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে ৪০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস আসছে। এলএনজিবাহী জাহাজটি ভিড়তে পারলে সরবরাহ বেড়ে প্রায় ৭৫ কোটি ঘনফুটে উঠতে পারে।
গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত
গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব মিলিয়ে ১২ ঘণ্টারও কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে কয়েক দিন ধরে রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার পর অল্প সময়ের জন্য সরবরাহ আসছে, আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে রাতে ঘুমাতে পারছেন না অনেকে। সিলেট নগরেও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে পানি সরবরাহ, সড়কবাতি, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সংকট কাটাতে নতুন উদ্যোগ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, তৃতীয় ও চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে একটি বিদেশি বেসরকারি উদ্যোক্তা গোষ্ঠীও আগ্রহ দেখিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান সংকটের একক কোনো সমাধান নেই। গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে যুক্ত করে গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









