মহাবিশ্বের রহস্যময় অন্ধকার পদার্থ বা ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের পুরোনো তথ্য বিশ্লেষণ করে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে প্রথমবারের মতো একটি নক্ষত্র বা ‘স্টেলার স্ট্রিম’ শনাক্ত করেছেন তারা। প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্যালাক্সিতে পাওয়া এই নক্ষত্রটি ওই গ্যালাক্সির মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এবং ডার্ক ম্যাটারের সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে।
গবেষণাটি গত বুধবার আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, নতুন শনাক্ত হওয়া নক্ষত্রধারাটি একটি গ্লোবুলার ক্লাস্টারের অবশিষ্টাংশ। গ্লোবুলার ক্লাস্টার হলো ঘনভাবে অবস্থান করা হাজার হাজার নক্ষত্রের বিশাল গোলাকার সমষ্টি। কোনো গ্যালাক্সির শক্তিশালী মহাকর্ষীয় টানে এ ধরনের ক্লাস্টার ধীরে ধীরে ভেঙে পড়লে এর নক্ষত্রগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘ ও সরু একটি ধারা তৈরি করে। এই ধারাকেই বলা হয় ‘গ্লোবুলার ক্লাস্টার স্টেলার স্ট্রিম’।
মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ভেতরে এ ধরনের কয়েক ডজন নক্ষত্রধারা আগে শনাক্ত হয়েছে। তবে আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে এ ধরনের কোনো স্টেলার স্ট্রিম শনাক্ত হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম। গবেষকরা জানান, নতুন আবিষ্কৃত নক্ষত্রধারাটি রয়েছে ‘ইউজিসি৯০৫০-ডিডাব্লিউ১’ নামের একটি ‘আল্ট্রা-ডিফিউজ’ গ্যালাক্সিতে। এ ধরনের গ্যালাক্সি আকারে তুলনামূলক বড় হলেও অত্যন্ত ক্ষীণ ও ছড়ানো অবস্থায় থাকে। ফলে এর পেছনে থাকা ক্ষীণ নক্ষত্রধারা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া জুলি কিল হোম বলেন, হাবল টেলিস্কোপের আর্কাইভে থাকা তথ্য বিশ্লেষণের সময় গবেষকরা প্রথমে এই ক্ষীণ নক্ষত্রধারাটি দেখতে পান। পরে তারা বুঝতে পারেন, এটি মিল্কিওয়ের বাইরের একটি গ্যালাক্সিতে থাকা গ্লোবুলার ক্লাস্টারের ভেঙে যাওয়া অংশ।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নক্ষত্রধারাটিকে ব্যবহার করে গ্যালাক্সিটির মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের একটি মানচিত্র তৈরি করতে পেরেছেন গবেষকরা। কারণ গ্যালাক্সির মহাকর্ষ নক্ষত্রধারাটির আকার ও গতিপথকে প্রভাবিত করে। সেই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা গ্যালাক্সিটির মোট ভর এবং দৃশ্যমান পদার্থের পাশাপাশি অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণও অনুমান করতে পারেন। ডার্ক ম্যাটার এমন এক রহস্যময় পদার্থ, যা সরাসরি দেখা যায় না কিংবা আলো শোষণ বা নির্গত করে না। তবে এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা ধারণা পেয়েছেন। বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণা অনুযায়ী, মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই ডার্ক ম্যাটার।
গবেষক সারাহ পিয়ারসন বলেন, আল্ট্রা-ডিফিউজ গ্যালাক্সি থেকে ধরনের নক্ষত্রধারা খুঁজে পাওয়ার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী হতে পারে। নক্ষত্রধারাকে বিজ্ঞানীরা অনেকটা মহাজাগতিক ‘ব্রেডক্রাম্ব ট্রেইল’ বা পথের চিহ্ন হিসেবে দেখছেন। কোনো গ্যালাক্সি কীভাবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, ছোট কোনো গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রগুচ্ছ কীভাবে তার মহাকর্ষের প্রভাবে ভেঙে গেছে। এসব ইতিহাস এই ধারার মধ্যে সংরক্ষিত থাকতে পারে। মিল্কিওয়ের ক্ষেত্রেও নক্ষত্রধারা ব্যবহার করে গ্যালাক্সির ভেতরে ডার্ক ম্যাটারের বণ্টন সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়েছে। এখন একই পদ্ধতি অন্য গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি হলো।
গবেষকরা আরো বলছেন, নক্ষত্রধারার মধ্যে থাকা কিছু ফাঁক বা ঘন অংশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ছোট ছোট ডার্ক ম্যাটার কাঠামো কোনো নক্ষত্রধারার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করলে সেখানে এ ধরনের ফাঁক বা গুচ্ছ তৈরি হতে পারে। তবে একই ধরনের পরিবর্তনের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। তাই আরো অনেক নক্ষত্রধারা শনাক্ত করে তাদের বৈশিষ্ট্য তুলনা করা প্রয়োজন। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষক টিজস্কে স্টারকেনবার্গ বলেন, ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপ এ ধরনের নক্ষত্রধারা শনাক্তের সুযোগ বাড়াবে।
বিশেষ করে নাসার ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কপের বড় পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর এক ছবিতে হাবল টেলিস্কোপের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি আকাশের এলাকা দেখা সম্ভব হবে বলে গবেষকরা আশা করছেন। গবেষকদের মতে, মিল্কিওয়ের বাইরে প্রথম গ্লোবুলার ক্লাস্টার স্টেলার স্ট্রিম শনাক্ত হওয়া মহাজাগতিক গবেষণায় নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।
ভবিষ্যতে আরো এমন নক্ষত্রধারা আবিষ্কার করা গেলে বিভিন্ন গ্যালাক্সির গঠন ও বিবর্তন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি ও বণ্টন সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আরো নির্ভরযোগ্য ধারণা পেতে পারেন। তবে ডার্ক ম্যাটার আসলে কী, তা এখনো অমীমাংসিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট কণা, একাধিক কণার সমষ্টি, নাকি প্রচলিত ধারণার বাইরের কোনো বিষয়—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে অজানা। নতুন এই নক্ষত্রধারা সেই দীর্ঘদিনের রহস্য সমাধানের পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি ‘কসমিক ক্লু’ হয়ে উঠতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









