দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন বা পে-স্কেল অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই যুগান্তকারী প্রস্তাবটি অনুমোদন লাভ করে।
নতুন এই কাঠামোর ফলে সরকারি ও অসামরিক-সামরিক প্রায় ৩৩ লাখ চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি মাথায় রেখে নতুন বেতন স্কেল একসঙ্গে পুরোটা কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মূল বেতন তিন ধাপে বাড়ানো হবে এবং তা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর করা হবে। কারণ নতুন এই পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি মাসে বাড়তি প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এর সংস্থান কিভাবে হবে, এটিই এখন ভাবনার বিষয়।
বিভিন্ন ধরনের নতুন ভাতা একযোগে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা হবে। সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার- নতুন কাঠামোয় পূর্বের ২০টি বেতন গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে। নতুন স্কেলটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে এই পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারের ওপর যে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়, তা মেটাতে এবং বাজেটের ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহ বা ঋণ করতে হবে। সরকারের নিয়মিত রাজস্ব আয় দিয়ে যখন কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন-ভাতার পুরো জোগান দেওয়া সম্ভব হবে না, তখন সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎস বিশেষ করে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের এই ঋণ নেওয়ার ফলে অনেক সময় বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি বা বিনিয়োগ কিছুটা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার সাধারণ মানুষ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি এবং ট্রেজারি বিল বা বন্ডের মাধ্যমেও ঋণ গ্রহণ করে থাকে। এর ফলে সরকারের সুদ পরিশোধের বা ঋণ ব্যবস্থাপনার খরচও ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। অভ্যন্তরীণ উৎসের পাশাপাশি বড় ধরনের বাজেট সহায়তা বা কাঠামোগত সংস্কারের জন্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের (যেমন—বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা আইএমএফ) শরণাপন্ন হতে হয়। এ ধরনের বৈদেশিক ঋণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একবারে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন না করে যেমনটি ধাপে ধাপে বা কিস্তিতে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা সরকারের ওপর এককালীন প্রচণ্ড আর্থিক ধাক্কা বা বড় অঙ্কের ঋণের চাপ কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য সরকারকে রাজস্ব আদায়ের পরিধি ও সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন এক লাফে বড় অংকে বাড়লে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর কিছু সুদূরপ্রসারী চাপ তৈরি করতে পারে। সরকারি খাতের বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে অতিরিক্ত অর্থ বা নগদ প্রবাহ বাড়লে বাজারে পণ্যের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। এর ফলে বিক্রেতারা সুযোগ বুঝে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, চাল-ডাল, তেল কিংবা কাঁচাবাজারের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন, যা সরাসরি সাধারণ ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। দেশের কর্মক্ষম একটি বিশাল অংশ বেসরকারি খাতে বা দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন সেই অনুপাতে বাড়ে না। ফলে বাজারদর যখন নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েন এই অ-সরকারি ও সাধারণ আয়ের মানুষেরা। সরকারি বড় অংকের বেতন ও ভাতা প্রদানের জোগান দিতে রাষ্ট্রকে অনেক সময় রাজস্ব আয় বাড়াতে হয় কিংবা ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিতে হয়।
এর প্রভাবে বিভিন্ন সরকারি সেবা, ইউটিলিটি বিল বা পণ্যের দাম সমন্বয় করা হতে পারে, যার পরোক্ষ প্রভাব পড়ে সাধারণ নাগরিকদের পকেটে। অবশ্য সরকার মূল্যস্ফীতির এই ঝুঁকি এড়াতে পুরো পে-স্কেল একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করার কৌশল নিয়েছে। তবে বাজার মনিটরিং জোরদার করা না হলে সরকারি কর্মচারীদের এই বেতন বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদনের পর সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্নটি জোরালোভাবে উঁকি দেওয়া স্বাভাবিক যে, এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না।
মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি বলেন, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় বেতন কাঠামো তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চলতি সপ্তাহেই এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে। দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন বেতন স্কেল ঘোষণা করায় সরকারি কর্মচারীদের স্বস্তি মিললেও বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না— এমন প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আগের পরিস্থিতিতে চলা খুব কষ্টকর ছিল, জীবনযাত্রার মানও অনেক কমে গিয়েছিল। সেসব বিষয় বিবেচনায় রেখে দুই দিকে একটা ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যালেন্স তো সব সময়ই রাখতে হয়।
একযোগে সব টাকা না দিয়ে ধাপে ধাপে ছাড় করার পেছনে বাজারের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই মূল কারণ মন্তব্য করে তিনি বলেন, অবশ্যই ইনফ্লেশন নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি খেয়াল রাখা হয়েছে, না হলে তো একযোগেই পুরো টাকা দিয়ে দেওয়া হতো। তিনি আরো বলেন, মানুষের হাতে টাকা না থাকলে অর্থনীতি তো ঘুরবে না। সরাসরি কৃষকের হাতে টাকা দেওয়া, ফ্যামিলি কার্ড কিংবা শিল্পীদের সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যই হলো বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়ানো। টাকা পাম্পিং হলে মানুষ কেনাকাটা করবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে। এই পে স্কেলের ক্ষেত্রেও একই চিন্তা করা হয়েছে। যারা আগে কেনাকাটায় হিমশিম খাচ্ছিলেন, তারা এখন বাজারে গিয়ে বেশি কিনতে পারবেন; মাছ কিনতে না পারলে এখন মাছ কিনবেন।
বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত বাস্তবায়নের সময়সীমা তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রথম ধাপে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতন কার্যকর হবে। এরপর ছয় মাস পর দ্বিতীয় ধাপ এবং পরবর্তীতে শেষ ধাপটি কার্যকর হবে। ভাতাসমূহ ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে একযোগে দেওয়া হবে। নতুন বেতন স্কেল নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমিশন ও সরকারের দীর্ঘ পর্যালোচনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বেতন বৃদ্ধির একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া তো থাকেই। কিন্তু এবার পে কমিশন গঠন থেকে শুরু করে একাধিক মিটিং কেন করতে হলো? কারণ, অতিরিক্ত টাকার সংস্থান কোত্থেকে আসবে, বাজারে এর কী প্রভাব পড়বে আর না দিলেই বা কী হবে— এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করা হয়েছে।
টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নাসিমুল গণি বলেন, এসআরও জারি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। এ সংক্রান্ত নিয়ম বা পরিবর্তনগুলো আপনারা সময়ের সঙ্গে জানতে পারবেন। তবে এখনই কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা যাচ্ছে না, যতক্ষণ না এসআরও জারি হচ্ছে। নতুন এই বেতন স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের বাড়তি প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার সংস্থান কীভাবে হবে— এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এই টাকার হিসাবটা আগামী তিন বছরের জন্য ধরা হয়েছে, যা বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে পর্যায়ক্রমে লাগবে।
আগামী দুই বছরেই পুরো টাকা লাগছে না। তাছাড়া বরাদ্দের একটি বড় অংশ তো আমরা অলরেডি ব্যয় করছি। সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পর সংবাদপত্রে ওয়েজ বোর্ডের বিষয়টিতেও একটা গতি আসবে। এটা আর এখন আগের মতো পড়ে থাকবে না। তবে প্রায় ৫ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এই নতুন স্কেলের সুবিধা পাবেন কিনা, সে বিষয়ে এখনই কিছু জানাতে চাননি তিনি। বিষয়টি নিয়ে এখনই মন্তব্য করা সম্ভব নয়। এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত যথাসময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে, বলেন নাসিমুল গনি।
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী, সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা মুঠোফোন বা মোবাইল ভাতা পাবেন। এতদিন নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ সুবিধা পেতেন। একইসঙ্গে কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের নিট পেনশন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পেনশনও ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। নতুন বেতন স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। মন্ত্রিসভায় একই সঙ্গে নতুন বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো যুগোপযোগী করতে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সচিব কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।
জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও কমানো হয়েছে। বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ অনুপাত কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সরকার সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’(ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন) পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ পদ্ধতি একসঙ্গে বাস্তবায়নে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ এবং ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া অসামরিক কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় তা পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অবসরভোগী পেনশনধারীদের নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী- মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৬৫ শতাংশ। ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৬০ শতাংশ। ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৫৫ শতাংশ। সরকারের মতে, এর ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ বেশি হবে।
কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়ছে?
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা অধিকতর যৌক্তিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সরকার ‘জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬’অনুমোদন করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এ সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন বেতন স্কেলে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার গ্রেডভেদে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত।
নতুন বেতন স্কেলের তথ্য অনুযায়ী, ১ম থেকে ১১তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ শতাংশ করে বাড়ানো হয়েছে। আর ১২তম গ্রেড থেকে নিচের গ্রেডগুলোতে বৃদ্ধির হার ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে। ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ২য় গ্রেডে ৬৬ হাজার থেকে ৭৬ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। ৩য় গ্রেডে বর্তমান ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে ৯৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা। ৪র্থ গ্রেডে ৫০ হাজার থেকে ৯১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা। ৫ম গ্রেডে ৪৩ হাজার থেকে ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা। ৬ষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬৭ হাজার ১০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ৭ম গ্রেডে বর্তমান ২৯ হাজার থেকে ৬৩ হাজার ৪১০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ৮০০ টাকা। ৮ম গ্রেডে ২৩ হাজার থেকে ৫৫ হাজার ৪৭০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ৪৬ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ৮০০ টাকা। ৯ম গ্রেডে ২২ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৬০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা। ১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার থেকে ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা। ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ থেকে ৩০ হাজার ২৩০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা। এই ১১টি গ্রেডেই প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ। এরপর ১২তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১১৫ শতাংশ। এই গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা। ১৩তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার ১১৮ শতাংশ। এ গ্রেডে ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার ৫৯০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা। ১৪তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার ১৩০ শতাংশ। এই গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৪ হাজার ৬৮০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা। ১৫তম ও ১৬তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৩৫ শতাংশ। ১৫তম গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২৩ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার ৮০০ থেকে ৫৫ হাজার ২০০ টাকা। ১৬তম গ্রেডে ৯ হাজার ৩০০ থেকে ২২ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৯০০ থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা। ১৭তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৩৮ শতাংশ। এ গ্রেডে ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০ টাকা। ১৮তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার ১৩৯ শতাংশ। এই গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার ৩১০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার থেকে ৫০ হাজার ৯০০ টাকা। ১৯তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪১ শতাংশ। এ গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫৭০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা।
সবশেষে ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ। এই গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার ১০ টাকা পর্যন্ত বর্তমান মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা। নতুন বেতন স্কেলে এভাবেই উচ্চতর গ্রেডগুলোতে ১০০ শতাংশ থেকে শুরু করে নিচের গ্রেডগুলোতে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূল বেতন বাড়বে তিন ধাপে
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এ সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সরকারের হিসাবে, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন আগের তুলনায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে। তবে পুরো বেতন বৃদ্ধি একবারে কার্যকর হবে না। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারের এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অন্যতম কারণ একসঙ্গে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা।
সবার জন্য মোবাইল ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের একটি হলো মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী ১ম থেকে ২০তম-সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী এ ভাতা পাবেন। এত দিন ৫ম গ্রেড পর্যন্ত নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। সরকারি দপ্তরগুলোতে ই-মেইল, অনলাইন সভা, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক কাজ বাড়ায় প্রায় সব পর্যায়ের কর্মচারীকেই ব্যক্তিগত মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে।
কম পেনশন যাদের, বাড়বে তাদের বেশি
নতুন বেতন কাঠামোয় পুরোনো পেনশনারদের জন্যও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ‘এক গ্রেড এক পেনশন’বা ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) এখনই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং এর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পেনশন বাড়ানোর নতুন ফর্মুলা অনুমোদন করা হয়েছে। এতে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা বেশি হারে সুবিধা পাবেন।
প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা
নতুন বেতন স্কেলে প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য একজন সরকারি কর্মচারী মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অতিরিক্ত পরিচর্যা ও পরিবারের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উপকৃত হবেন প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন ব্যবস্থার সুবিধা পাবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ ব্যয়ের সংস্থান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিই সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে। অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে এ বছরের ২১ জানুয়ারি। কমিশনপ্রধান সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান।
বিদ্যমান গ্রেড ২০টি বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল জাকির আহমেদ খান কমিশন। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়। আর সর্বোচ্চ বেতনকাঠামো নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সুপারিশ করা হয় নির্ধারিত ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বর্তমানে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে বাড়তি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার দরকার পড়বে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু নাসিমুল গনি কমিটি মাঝখানে দুই বছরে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে ছিল চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতন এবং পরের অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ভাতা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









