ভোরের আলো ফুটতেই গতকাল সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার এলাকায় ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। খাগড়াছড়ি থেকে আসা কাঁঠালবোঝাই ট্রাক ও নির্মাণশ্রমিকবাহী পিকআপ ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল ৮টি তাজা প্রাণ। ঘটনাস্থলে ৪ জন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরো ৪ জন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এই শোকের মাতম শুধু সিলেটে নয়, একই দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ওভারটেকিংয়ের বলি হওয়া দুই মোটরসাইকেল আরোহী এবং কুমিল্লার দেবিদ্বারে বাবার কোল থেকে ছিটকে পড়ে কাভার্ড ভ্যানের চাকায় পিষ্ট হওয়া শিশুর মৃত্যু দেশের সড়ক ব্যবস্থার জরাজীর্ণ রূপটি আবারও জনমনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
সড়ক নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন পরিকল্পনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ হাদিউর জামান দৈনিক এদিনকে বলেন, সিলেটের এই দুর্ঘটনাটি নিছক কোনো অঘটন নয়, বরং দেশের সড়ক খাতের অব্যবস্থাপনার একটি প্রতিচ্ছবি। নির্মাণকাজের উদ্দেশ্যে সুনামগঞ্জগামী শ্রমিকরা যে পিকআপ ভ্যানে যাচ্ছিলেন, সেটি মূলত পণ্য পরিবহনের জন্য তৈরি। যাত্রী পরিবহনে এমন অনিরাপদ যানবাহনের ব্যবহার এবং ভোরের ফাঁকা রাস্তায় ট্রাকের বেপরোয়া গতিই এই প্রাণহানির মূল কারণ। তিনি বলেন, ‘পুলিশ ট্রাকের হেলপারকে আটক করতে পারলেও চালক পলাতক। এটি আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই একটি অংশ, যেখানে দুর্ঘটনার পর মূল অপরাধীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।’
দেশের সড়ক পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, তা গত ৪ মাসের পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৪ হাজারের বেশি। শুধু মার্চ মাসেই ৬১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬১৯ জন নিহত ও ১ হাজার ৫৪৮ জন আহত হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে নিহতের সংখ্যা ছিল ৪৩২ এবং আহতের সংখ্যা ১ হাজার ৬৮ জন। এই ৪ মাসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিহতদের একটি বড় অংশই শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষ, যা দেশের অর্থনীতির জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই অধ্যাপকের বিশ্লেষণ দেখা যায়, দেশের সড়ক দুর্ঘটনার মূলে রয়েছে তিনটি প্রধান ব্যর্থতা ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো, লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন এবং চালকদের অদক্ষতা। মহাসড়কগুলোতে ডিভাইডার না থাকা এবং বাঁকগুলোতে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা না থাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষের হার বাড়ছে। অন্যদিকে, ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো অবাধে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজপথ। তেলিবাজারের ঘটনায় দেখা গেছে, একটি ট্রাক ও পিকআপের সংঘর্ষে এত বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কারণ যান দুটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল একেবারেই নড়বড়ে। তিনি বলে এটি প্রশাসন আর বিআরটিএর তদারকি ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ হলো চালকদের বেপরোয়া মনোভাব এবং ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঘটনাটি এর জলন্ত প্রমাণ যে সেখানে একটি বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন দুই যুবক। মহাসড়কে কার আগে কে যাবেন এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রাণ। অধিকাংশ চালকের নেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, আবার দীর্ঘ সময় বিশ্রামহীন গাড়ি চালানো তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত করে তোলে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চালকদের অদক্ষতার জন্য বিআরটিএর লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ার অনিয়ম অনেকাংশেই দায়ী বলে মনে করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ পরীক্ষা ও দক্ষতা যাচাই ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে অনেক অদক্ষ চালক লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছেন। দালালের দৌরাত্ম্য ও দুর্নীতির কারণে প্রকৃত চালকরা হয়রানির শিকার হলেও অযোগ্যরা সহজেই সড়কে নামার অনুমতি পাচ্ছে। লাইসেন্স প্রদানের এই কাঠামোগত দুর্বলতা সরাসরি সড়কের নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলছে, যার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দৈনিক এদিনকে বলেন, সড়ক পুলিশ বা প্রশাসনের গাফিলতির কারণেও সড়ক নিরাপদ হচ্ছে না এবং এর দায় তাদেরও নিতে হবে। সড়ক পরিবহন আইন পাস হলেও এর কঠোর প্রয়োগ আজও দৃশ্যমান নয়। লাইসেন্সবিহীন চালক বা ফিটনেসবিহীন গাড়ি যখন রাজপথে নামে, তখন প্রশাসনের নীরবতা অপরাধীদের উৎসাহিত করে। তিনি বলেন, সিলেটের ঘটনায় ট্রাকটি খাগড়াছড়ি থেকে সিলেট পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলেও পথে কোথাও কোনো তল্লাশির মুখে পড়তে হয়নি কেন, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
সড়ক বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ হাদিউর জামান দৈনিক এদিনকে বলেন, সড়ক নিরাপদ করতে হলে কারিগরি সমাধানের চেয়ে সবার আগে রাজনৈতিক সদিচ্ছা বেশি জরুরি । তিনি বলেন, শুধু শোক প্রকাশ বা তদন্ত কমিটি গঠন করলেই সমাধান আসবে না। সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে মহাসড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, সড়ক ও যানের ধরনভেদে গতিসীমা নির্ধারণ, প্রতিটি যানবাহনের ফিটনেস কঠোরভাবে যাচাই এবং চালকদের জন্য নিয়মিত ডোপ টেস্টসহ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
এ সময় পিকআপ বা ট্রাকের মতো পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা জরুরি জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, মহাসড়কে ঝুঁকি কমাতে সব গুরুত্বপূর্ণ সড়ক থেকে থ্রি-হুইলারসহ ধীরগতির যানবাহন আলাদা করতে সার্ভিস রোড চালু করতে হবে। তিনি বলেন, যদি আইন অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না যায়, সড়ক দুর্ঘটনা ট্র্যাজেডিগুলো আমাদের নিয়মিত সংবাদ শিরোনাম হতেই থাকবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









