নৈতিক পদস্খলন, নারীদের সঙ্গে অনৈতিক মেলামেশা, অর্থের বিনিময়ে পদ বাণিজ্য, মৌলিক ইবাদতে উদাসীনতা ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনসহ নানা অভিযোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারকে।
সংগঠনটির দুটি চিঠিতে এসব অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তার সাথীপদ প্রথমে স্থগিত ও পরবর্তীতে বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এ ছাড়া অন্য একটি চিঠিতে শিবিরের নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রাখার এবং আকস্মিক দেখা হলেও সালাম বিনিময় না করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ছাত্রশিবিরের সাবেক ও বর্তমান সভাপতির স্বাক্ষরিত তিনটি গোপন চিঠির মাধ্যমে সংগঠনটির সঙ্গে আম্মারের সম্পৃক্ততা ও পদ বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। চিঠি তিনটি এদিনের হাতে এসেছে। এগুলো শিবিরের অফিসিয়াল প্যাডে লেখা না হলেও সংগঠনের বর্তমান একাধিক দায়িত্বশীল নেতা এদিনের কাছে চিঠিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন সালাউদ্দিন আম্মার। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মেহেদী সজীব ও ফজলে রাব্বি মো. ফাহিম রেজাসহ কয়েকজন সমন্বয়ক প্রকাশ্যে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা জানান। সে সময় সালাউদ্দিন আম্মারের রাজনৈতিক আদর্শ নিয়েও নানা প্রশ্ন ওঠে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনে আম্মারের নেতৃত্বে শিবির একটি ‘ডামি’ প্যানেল দিয়েছিল বলেও ক্যাম্পাসে জোর গুঞ্জন ছিল। সেই প্যানেল থেকে ভিপি পদে লড়েছিলেন সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব এবং এজিএস পদে আকিল বিন তালেব। মেহেদী সজীব বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক।
অন্যদিকে আকিল বিন তালেব প্যানেল থেকে সরে দাঁড়িয়ে শিবিরের সঙ্গে সমঝোতা করে সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তবে আম্মার ও শিবির নেতারা বরাবরের মতোই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
আম্মার সাংবাদিকদের বলতেন, তিনি ‘শিবির ঘরানার’ আবহে বেড়ে উঠেছেন বলেই অনেকে তাকে শিবির বলে মনে করেন।
অন্যদিকে শিবির নেতারা দাবি করতেন, আম্মারের সঙ্গে তাদের সংগঠনের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের শঙ্কা ও ধারণাই সত্যি প্রমাণিত হলো।
প্রাপ্ত চিঠির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সালাউদ্দিন আম্মারের সাথীপদ চূড়ান্তভাবে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় রাবি শাখা ছাত্রশিবির। এর আগে একই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি ও রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তার বিরুদ্ধে একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।
সেখানে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ বাণিজ্যের পাশাপাশি আম্মারের বিরুদ্ধে নৈতিক অবক্ষয়ের বেশ কিছু অভিযোগ ওঠে। দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে বিষয়টি সংগঠনের নজরে আসে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি শিবিরের মাসিক সচিবালয় সভায় এসব অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে আম্মারের সাথীপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষরিত অপর এক চিঠিতে বলা হয়, বারবার সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার পরও সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে সরে না আসায় সালাউদ্দিন আম্মারের সাথীপদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হলো।
সর্বশেষ চলতি বছরের ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের বর্তমান সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের স্বাক্ষরিত চিঠিতে পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলোর পুনরুল্লেখ করা হয়। চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে নৈতিক পদস্খলন, মৌলিক ইবাদতে উদাসীনতা, অনৈতিক মেলামেশা, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, অর্থ আত্মসাৎ এবং সংগঠনের নীতি-আদর্শ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট অভিযোগ আনা হয়।
এ ছাড়া তার এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও ফৌজদারি অপরাধের কারণে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করে শিবিরের নেতাকর্মীদের অনলাইনে বা অফলাইনে কোনো প্রতিক্রিয়া না জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কেবল রাকসুর নির্বাচিত শিবিরের দায়িত্বশীলদের তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক যোগাযোগ রাখার অনুমতি দেওয়া হলেও সাধারণ নেতাকর্মীদের পুরোপুরি দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়।
আম্মারের শিবিরের সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান এদিনকে বলেন, “আমাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেউ বহিষ্কৃত হলে তা প্রকাশ্যে আনার নিয়ম নেই, কারণ মানুষমাত্রই ভুল হতে পারে। তিনি তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসায় পড়ার সময় শিবিরের সাথী পদে যুক্ত হন। পরবর্তীতে কোডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার সাংগঠনিক তথ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। এভাবেই ক্যাম্পাসে শিবিরের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল।”
তিনি আরও জানান, “সেই সাংগঠনিক সম্পর্কের কারণেই জুলাই আন্দোলনে শিবির তাকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও আশ্রয় দেয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় সেপ্টেম্বরে তাকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হয়।” বহিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই শিবির নেতারা আম্মারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করে আসছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিবিরের আরেক শীর্ষ নেতা এদিনকে বলেন, “চিঠি তিনটি শতভাগ সত্য। আম্মার শিবিরের রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বহিষ্কৃত হওয়ায় এখন তার সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে জানতে সালাহউদ্দিন আম্মারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে তার এক ফেসবুক পোস্টে তিনি শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









