চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি মৌসুমে পাটের ভালো ফলন ও বাজারে সন্তোষজনক দাম পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে পাটের আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে যুক্ত হয়ে বাড়তি আয় করছেন গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা। নগদ মজুরির পরিবর্তে পাটখড়ি নিয়ে তা বিক্রি করে সংসারে অর্থের জোগান দিচ্ছেন তারা।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন পাট কাটার পাশাপাশি পানিতে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও শ্রমিকেরা। সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠ, বিল, খাল ও জলাশয়ের পাশে দল বেঁধে নারীদের পাটের আঁশ ছাড়াতে দেখা যাচ্ছে। এতে একদিকে কৃষকের শ্রম ও সময় সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে নারীদেরও মৌসুমি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাটের আঁশ ছাড়ানোর বিনিময়ে অনেক নারী সরাসরি টাকা নেন না। জাগ দেওয়া পাটগাছ থেকে আঁশ আলাদা করে দেওয়ার পর পাটখড়ি নিয়ে যান তারা। পরে বাড়িতে শুকিয়ে এসব পাটখড়ি স্থানীয় হাট বা পাইকারের কাছে বিক্রি করেন। এতে একজন নারী দিনে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত সমমূল্যের পাটখড়ি আয় করতে পারেন।
শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের আনোয়ারা বেগম বলেন, তিনি প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ আঁটি পাট ছাড়াতে পারেন। এতে প্রায় দুই মণ পাটখড়ি পাওয়া যায়। বাজারে প্রতি মণ পাটখড়ি প্রায় ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করে দিনে প্রায় ১ হাজার টাকা আয় করেন তিনি।
এছাড়াও তিনি বলেন, পাট মৌসুমে আঁশ ছাড়ানোর কাজ করে তিনি প্রতিবছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন। মৌসুমে কাজের চাপ বেশি থাকায় এ সময়টাতে বাড়তি আয়ের সুযোগও বেশি থাকে।
পাঁকা ইউনিয়নের পাটচাষি আইনাল হক বলেন, এবার তাঁর তিন বিঘা জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে ১০ থেকে ১২ জন নারী তাঁর জমির পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ করছেন। তাঁদের নগদ মজুরি দিতে হয় না। কাজের বিনিময়ে তাঁরা পাটখড়ি নিয়ে যান। এতে কৃষকেরও উপকার হচ্ছে, নারীরাও বাড়তি আয় করতে পারছেন।
চলতি মৌসুমের আবহাওয়া পাট চাষের জন্য অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে দামও গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন বাজারে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এ দাম ছিল প্রায় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা।
সদর উপজেলার রানিহাটি ইউনিয়নের কৃষক আকবর আলী বলেন, তিনি দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করে প্রায় ২৮ মণ পাট পেয়েছেন। এতে তাঁর মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার টাকা। পাট বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
শিবগঞ্জের দুর্লভপুর ইউনিয়নের পিয়ালিমারি গ্রামের কৃষক মাসুদ রানা বলেন, তিনি তিন বিঘা জমিতে দেশি ও তোষা জাতের পাট চাষ করেছেন। এক বিঘা দেশি পাট থেকে ১৩ মণ পাট পেয়েছেন, যা ৪৬ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট।
কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে পাট চাষে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ করে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হচ্ছে। এ কারণে পাট চাষে আবারও আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। তবে উৎপাদন খরচ কমাতে ও পাট চাষ আরও লাভজনক করতে সরকারি প্রণোদনা ও অন্যান্য সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে জেলায় পাটের ফলন ভালো হয়েছে। বাজারেও কৃষকেরা সন্তোষজনক দাম পাচ্ছেন। পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে গ্রামের নারীদের অংশগ্রহণ তাঁদের পরিবারের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, কৃষকদের আগ্রহের কারণে এবার জেলার পাট আবাদের পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেড়েছে। কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা পাট চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিয়েছেন।
উল্লেখ, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৪০ হেক্টর। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৭২৭ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬৮৭ হেক্টর বেশি জমিতে এবার পাট চাষ হয়েছে।
শিবগন্জের দুর্লভপুর ইউনিয়নে নারীরা পাঠের আঁশ ছড়াতে ব্যাস্থ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









