সাতক্ষীরা জেলায় হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় অভিভাবকদের মাঝে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। দ্রুত হামের টিকা ও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে অন্যান্য ব্যবস্থা না নিলে ছোঁয়াচে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার মত সাতক্ষীরায় ও শিশুদের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছে অভিভাবক সহ সচেতন মহল। অভিভাবকদের কাছে বর্তমানে হাম যেন নতুন এক আতঙ্কের নাম।এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ, সদর হাসপাতাল সহ উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হাম এর রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন কোন গুজবে কান না দিয়ে হাম দেখা দিলে অন্য কারও পরামর্শ না নিয়ে সরাসরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসার জন্য বলছেন।
বিশেষ করে শিশুদের জন্য এই রোগ বর্তমানে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় স্বাস্থ্য বিশ্রণ সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন।
সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায় ইতিমধ্যে জেলা থেকে ৪০ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এগুলোর মধ্যে একজনের হাম পজিটিভ এবং আরেকজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে।
সোমবার ০৬ এপ্রিল সাতক্ষীরায় ১৩ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এটি ছিল হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সর্বেোচ্চ রোগী। এর আগে থেকে সাতক্ষীরায় ১৬ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।
সাতক্ষীরা আশাশুনি এলাকার সুব্রত কুমার জানান, তার ছেলের হাম হয়েছিল। প্রথমে কবিরাজ ও গ্রাম্য ডাক্তার দেখিয়েও সারেনি। পরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে এলে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়। চিকিৎসকদের সেবায় এখন ছেলে সুস্থ হয়েছে।
সাতক্ষীরা সরকারি শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শামছুর রহমান হামের লক্ষণ সম্পর্কে বলেন, প্রাথমিক ধাপ : প্রচণ্ড জ্বর, সঙ্গে ক্রমাগত কাশি ও নাক দিয়ে পানি পড়া। চোখের সমস্যা : চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও আলোর দিকে তাকাতে কষ্ট হওয়া। র্যাশ বা ফুসকুড়ি : কয়েক দিন পর মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়া। চোখ লাল ও আলো সহ্য করতে না পারার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক ও ছোঁয়াচে। এতে আক্রান্ত হলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। তখন শিশু নিউমোনিয়া ও মারাত্মক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এসবের ফলে পুষ্ঠিহীনতাও দেখা দেয়। সব মিলিয়ে শিশুর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে হাম।
সম্প্রতি হামের লক্ষণ বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি আরো বলেন টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, শিশুদের মায়ের বুকের দুধ ঠিকমতো পান না করানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ওষুধ না খাওয়ানো এবং অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) থেকে অনেক শিশু বাদ পড়ে যাওয়ায় তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। আবার অনেকের ক্ষেত্রে প্রথম ডোজ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ না দেওয়ায় এই রোগের ঝুঁকি বেড়েছে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া জন্মের নয় মাস পর টিকা দেওয়ার সময় শিশু অসুস্থ থাকায় অনেককে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি, পরবর্তীতে সেসব শিশু আক্রান্ত হচ্ছে
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রিয়াদ হাসান বলেন, হামের রোগী এলে প্রথমে উপসর্গভিত্তিক পরিচর্যা, ভিটামিন-এ ক্যাপসুল প্রদান ও আইসোলেশনের ওপর জোর দেওয়া হয়। গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ ব্যবস্থা ও বিশেষ ওয়ার্ডে রাখা হচ্ছে। বাড়িতে থাকা রোগীদের খোঁজ নিয়ে তাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা ও মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. জয়ন্ত সরকার জানান, শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ দেওয়া হয় নয় মাস পূর্ণ হলে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে।
জেলা সিভিল সার্জন আব্দুস সালাম জানান সাতক্ষীরায় জরুরি বিভাগ সহ বিভিন্ন বিভাগে ৩২৬জন চিকিৎসক এর বিপরিতে আছে মাত্র ১২৫ জন চিকিৎসক। এজন্য সেবা দিতে আমাদেরকে সবসময় হিমশিম খেতে হচ্ছে তারপর ও আমাদের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামের রোগী খোঁজার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি সচেতনতামূলক বার্তা ছড়িয়ে দেবে এবং রোগীদের নমুনা সংগ্রহের পর তা পাঠাবে। প্রান্তিক পর্যায়ে বাড়িতে বাড়িতে স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন সাধারণ মানুষ গুজবে কান না দেয়। হাম দেখা দিলে অন্য কারও পরামর্শ না নিয়ে সরাসরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসার বিষয়েও ক্যাম্পেইন চলছে।
এলাকার সচেতন নাগরিকরা বলেন, হাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে। গত কয়েক বছরে হাম নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি, যার ফলে মানুষ এখন আতঙ্কিত। স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে দাবি, তারা যেন প্রান্তিক পর্যায়ে গিয়ে মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে, ক্যাম্পেইন ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









