কক্সবাজারের রামু দক্ষিণ মিঠাছড়ি গ্রামের শেষ প্রান্তে পাহাড়ঘেরা ছোট্ট একটি টিনের ঘর। কয়েক মাস আগেও যেখানে সকাল শুরু হতো শিশুর হাসিতে, রাত শেষ হতো কোলের আদরে। আজ সেই উঠান নিস্তব্ধ। বাতাসে নেই কোনো কান্না, নেই শিশুর শব্দ—শুধু গভীর শূন্যতা।
কৃষক আজিজুল হকের সেই ঘরেই গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে জন্ম নিয়েছিল যমজ কন্যা রৌশনি ও রাবেয়া। পরিবারে যেন নেমে এসেছিল উৎসব। দুই রাজকন্যার মুখ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিল আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
আজিজুল হক স্মৃতির ভেতর ডুবে গিয়ে বলেন, “মনে হইছিল আল্লাহ একসাথে দুইটা জান্নাত পাঠাইছে আমার ঘরে।”
যমজ সন্তান জন্মের পর সংসারে যেন বদলে যায় সবকিছু। ক্ষেতের ফলন বাড়ে, সংসারে হাসি বাড়ে, স্বপ্ন বাড়ে। মা মরিয়ম বেগম দিনরাত দুই মেয়েকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। একই সঙ্গে দু’জনকে দুধ খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, কোলে নেওয়া—ক্লান্তি থাকলেও মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি।
সাত মাসের ছোট্ট জীবনে রৌশনি ও রাবেয়া হয়ে উঠেছিল পুরো পরিবারের প্রাণ। কিন্তু সুখের সেই আলো হঠাৎ নিভে গেল অদৃশ্য এক হাম নামের শত্রুর আঘাতে।
ঈদের পরদিন হঠাৎ জ্বর, সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত হয় দুই শিশু। প্রথমে সাধারণ অসুখ ভেবেই শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু জ্বর কমেনি। শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। উদ্বিগ্ন বাবা-মা ছুটে যান কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকেরা জানান—দুই শিশুই হাম রোগে আক্রান্ত।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের হাম ইউনিটে পাশাপাশি শুয়ে ছিল দুই বোন। কখনো একজন কাঁদলে আরেকজনও কেঁদে উঠত। মা মরিয়ম দুই কোল বদলে বদলে আদর করতেন। বাবা আজিজুল হাসপাতালের করিডোরে বসে শুধু দোয়া পড়তেন।
তিনি বলেন, “ভাবছিলাম দুইজনই সুস্থ হইয়া বাড়ি ফিরবো। ঘর আবার আগের মতো ভইরা উঠবো।” কিন্তু নিয়তি যেন অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।
১৩ দিনের চিকিৎসার পর গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রথমে নিভে যায় রৌশনির জীবনপ্রদীপ। মেয়ের জানাজা ও দাফনের জন্য গ্রামে ছুটে যান বাবা। আর হাসপাতালের বিছানায় তখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল রাবেয়া। মাত্র দুই দিন পর, ৪ এপ্রিল শনিবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস নেয় দ্বিতীয় কন্যাটিও। একসঙ্গে পৃথিবীতে আসা দুই বোন—দুই দিনের ব্যবধানে একসঙ্গে চলে গেল না ফেরার দেশে।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বসে থাকা মা মরিয়ম বেগম তখন আর কাঁদতেও পারছিলেন না। শূন্য চোখে শুধু বলছিলেন, “আল্লাহ, আমার দুই মাইয়া একসাথে দিছিলা, একসাথে কইরা নিয়া গেলেন ক্যান?” তার চোখ শুকনো। কান্না যেন জমাট বেঁধে আছে বুকের ভেতর।
আজিজুল হক বলেন, “হাসপাতাল বদলাইছি, ডাক্তার দেখাইছি, চট্টগ্রাম নেওয়ার চেষ্টাও করছি। কিন্তু আমার মামণিদের বাঁচাইতে পারলাম না।” ঘরে ফিরে এখন তিনি মেয়েদের ছোট জামা, দোলনা আর খেলনার দিকে তাকিয়ে থাকেন। উঠানের কোণে পড়ে থাকা শিশুর কাপড়গুলো যেন প্রতিদিন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—এই ঘর একসময় ভরা ছিল জীবনের শব্দে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম জানান, যমজ দুই শিশুসহ হাম আক্রান্ত হয়ে এই ইউনিটে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ শিশু হাম ছাড়াও নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় ভুগছিল।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দুর্গম পাহাড়ি ও দ্বীপাঞ্চলের অনেক শিশু এখনো টিকার আওতার বাইরে থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে। তাই রামু ও মহেশখালী এলাকায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। কিন্তু টিকা কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই নিভে গেছে রৌশনি ও রাবেয়ার জীবন।
দক্ষিণ মিঠাছড়ির সেই টিনের ঘরে এখন আর কোনো কান্না শোনা যায় না। শুধু সন্ধ্যা নামলে উঠানে বসে থাকেন আজিজুল হক। মাঝে মাঝে মনে হয়, বুঝি আবার শুনবেন দুই মেয়ের কান্না। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “কী থেকে কী হইয়া গেল বুঝি না… আমার ঘরের আলোডা আর নাই।”
এক সময় যে ঘরে দুইটি প্রাণ আলো হয়ে এসেছিল, আজ সেখানে শুধু স্মৃতি, দীর্ঘশ্বাস আর এক বাবা-মায়ের অসীম শোক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









