বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় বায়ুদূষণ এখন সবচেয়ে বড় কিন্তু সবচেয়ে অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সংকটগুলোর একটি। প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন মানুষের অকালমৃত্যু এবং বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি—এই দুটি পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে যে বায়ুদূষণ আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি বড় হুমকি।
এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, দেশের ছয়টি প্রধান শহরে সূক্ষ্ম বস্তুকণা (পিএম২.৫) দূষণের কারণে বছরে প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে। হৃদরোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রাজধানী ঢাকাই এ সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, ইটভাটা, শিল্পকারখানার নির্গমন, পুরোনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং দুর্বল পরিবেশ ব্যবস্থাপনার কারণে রাজধানীর বাতাস ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
বায়ুদূষণের ক্ষতি শুধু মানুষের জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের অর্থনীতিকেও বড় ধরনের আঘাত করছে। অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, উৎপাদনশীলতা কমছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে বছরে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় পাঁচ শতাংশের সমান। উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য এ ধরনের ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বায়ুদূষণ রোধে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। অবৈধ ইটভাটা, নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণে উদাসীনতা, নিম্নমানের জ্বালানির ব্যবহার এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ অমান্যকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি স্পষ্ট। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা, পুরোনো যানবাহন পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার, নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করা, সবুজায়ন বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত বায়ুমান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য প্রকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুর গুণগত মান নির্দেশিকা বাস্তবায়নের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
বায়ুদূষণ এমন এক নীরব ঘাতক, যা প্রতিদিন অসংখ্য পরিবারকে শোকাহত করছে এবং দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়; মানুষের সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর, কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় এই নীরব সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিয়ে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করবে। নীরব ঘাতক বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









