একটি যুদ্ধ কখনো শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর বিস্ফোরণ ঘটে বিশ্ববাজারেও। কোথাও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত, কোথাও সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে অচলাবস্থা- আর তার ঢেউ এসে লাগে হাজার কিলোমিটার দূরের কৃষকের জমিতে, বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে এবং সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তায়। মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে চলমান অস্থিরতার মধ্যে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) বাংলাদেশ-সম্পর্কিত সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা সেই কঠিন বাস্তবতারই স্মারক।
কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ ইউরিয়া সারের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, সারবাজার এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর কৃষি অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগের।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করা হয়। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা নৌপথে অস্থিরতা দেখা দিলে এর প্রভাব সরাসরি পড়ে দেশের সার সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া এবং দেশের কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। কৃষি উৎপাদনের মৌসুমে যদি সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
খাদ্য নিরাপত্তা কেবল খাদ্যের প্রাপ্যতার বিষয় নয়; এটি মূল্য, ক্রয়ক্ষমতা এবং মানুষের পুষ্টির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্যের দাম বাড়বে, যার সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। এমন পরিস্থিতিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং অপুষ্টির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে সংকটের পূর্বাভাস মানেই বিপর্যয় অনিবার্য- এমন নয়। সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সরকারকে এখন থেকেই বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে, রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত পুনরুদ্ধারে গুরুত্ব দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের কাছে সঠিক সময়ে সার পৌঁছে দেওয়া এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট বা মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে কৃষিখাতে আমদানি-নির্ভরতা কমানোর কৌশল গ্রহণ করতে হবে। দেশীয় সার উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, সুষম সার ব্যবহারে কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক সংঘাত এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে একটি শক্তিশালী খাদ্য নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন অপরিহার্য।
বিশ্বের সংঘাত বাংলাদেশের সীমানার অনেক দূরে ঘটলেও তার অভিঘাত আমাদের কৃষক, ভোক্তা এবং অর্থনীতিকে স্পর্শ করে। তাই এই সতর্কবার্তা আতঙ্কের নয়, বরং প্রস্তুতির বার্তা হিসেবে গ্রহণ করাই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল কৃষিনীতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









