প্রতি বছরের জুন মাস এলেই যেন দেশের লাখো বিদ্যুৎ গ্রাহকের জীবনে নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে ‘ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল’। এ বছরও রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত অসংখ্য গ্রাহক প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিদ্যুৎ বিল হাতে পেয়েছেন। কারও মাসিক ৪০০-৫০০ টাকার বিল বেড়ে হয়েছে আড়াই হাজার টাকা, আবার কারও ৬-৭ হাজার টাকার বিল এক লাফে ৫০ হাজার টাকারও বেশি। এক-দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলে তা মানবিক ভুল বলে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু বছরের পর বছর একই সময়ে, একই ধরনের অভিযোগ যখন দেশজুড়ে ওঠে, তখন তা আর নিছক ভুল নয়; বরং বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থার দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং জবাবদিহির সংকটেরই প্রতিফলন।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, কোথাও কোথাও করণিক ভুল হয়েছে, যা সংশোধন করা হচ্ছে। আবার ব্যবহার বৃদ্ধি ও উচ্চতর ট্যারিফ স্ল্যাবে চলে যাওয়াকেও বিল বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ভুক্তভোগী গ্রাহকের দাবি- তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার আগের মতোই ছিল। যদি সত্যিই কেবল ব্যবহার বৃদ্ধিই কারণ হতো, তাহলে একই ধরনের অভিযোগ একযোগে এত বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত না। বরং এটি স্পষ্ট, মিটার রিডিং, বিল প্রস্তুত এবং তদারকির পুরো ব্যবস্থাতেই গুরুতর ত্রুটি রয়ে গেছে।
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বক্তব্যে অর্থবছরের শেষে রাজস্ব সমন্বয়, সিস্টেম লস কমিয়ে দেখানো কিংবা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপের বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। কারণ, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, হিসাবের গরমিল বা আর্থিক ঘাটতির বোঝা সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু অনিয়ম নয়, জনগণের সঙ্গে চরম অবিচার।
ভুল বিলের সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হন সাধারণ গ্রাহক। অতিরিক্ত ইউনিট দেখানোর ফলে অনেকেই উচ্চ ট্যারিফ স্ল্যাবে চলে যান এবং অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য হন। পরে বিল সমন্বয় করা হলেও সেই আর্থিক ক্ষতি সবসময় পুরোপুরি পূরণ হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিদ্যুৎ অফিসে দিনের পর দিন ঘুরে বেড়ানো, অভিযোগ জানাতে হয়রানি, অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ভয় দেখানোর মতো ঘটনাও। একটি প্রশাসনিক ভুলের জন্য কেন একজন সৎ গ্রাহককে এমন ভোগান্তি পোহাতে হবে- এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশে এখনও বিপুলসংখ্যক গ্রাহক পোস্টপেইড মিটারের আওতায় রয়েছেন। অনেক জায়গায় নিয়মিত মিটার রিডিং নেওয়া হয় না, কোথাও অনুমাননির্ভর বিল তৈরি হয়, আবার কোথাও একাধিক মাসের ইউনিট একসঙ্গে যোগ করে বিল করা হয়। ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে এমন অদক্ষতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্মার্ট মিটার ও প্রিপেইড মিটারের সম্প্রসারণ, ডিজিটাল মিটার রিডিং, বিল প্রস্তুতের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা এবং স্বয়ংক্রিয় যাচাইব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যুৎ মানুষের মৌলিক সেবাগুলোর অন্যতম। এই সেবার সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি সরাসরি জড়িত। তাই বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অনিশ্চয়তা বা অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারের উচিত অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার পরিবর্তে জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা। স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে জনসেবার মূলভিত্তি হলো জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থা টিকিয়ে রাখতে বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা ও জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই। ‘জুনের ভূত’ যেন আর কোনো বছর ফিরে না আসে- সেটিই এখন রাষ্ট্র, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বিতরণ সংস্থাগুলোর বড় দায়িত্ব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









