রাষ্ট্রের অর্থে ভর্তুকি দিয়ে নিত্যপণ্য বিক্রি করা দরকার হলেও সেই অর্থের অপচয় ও অদক্ষতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভর্তুকির চাপ কমাতে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) যে ‘মিশন জিরো’ পরিকল্পনা নিয়েছে, তা তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। তবে ভর্তুকি কমানোর চেষ্টায় টিসিবির মূল সামাজিক দায়িত্ব যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
টিসিবির পরিকল্পনায় ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রির পাশাপাশি সাবান, ডিটারজেন্ট, চা, লবণ, আটা, ভোজ্যতেল ও মসলার মতো লাভজনক পণ্যের ব্যবসায় নামার কথা বলা হয়েছে। এসব পণ্য সাধারণ ক্রেতাদের কাছেও বিক্রি করা হবে। টিসিবির হিসাবে, নতুন ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে প্রায় ৯৪০ কোটি টাকা সাশ্রয় এবং ভর্তুকি প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব। ২০৩০ সালের মধ্যে ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও রয়েছে।
পরিকল্পনার ইতিবাচক দিক হলো, টিসিবি এবার শুধু ভর্তুকি কমানোর কথা বলছে না, বরং ব্যয় কমানোর কাঠামোগত উদ্যোগও নিচ্ছে। ডিলারদের কাছ থেকে সরাসরি অর্থ গ্রহণ, নিজস্ব গুদাম ব্যবহার, সরবরাহকারীদের দ্রুত পাওনা পরিশোধ এবং ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর ফলে অর্থের প্রবাহ ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমতে পারে। উৎপাদনকারীর কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করে মধ্যস্বত্বভোগীদের কয়েকটি স্তর বাদ দেওয়ার উদ্যোগও প্রশংসনীয়। এতে তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে টিসিবির বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। টিসিবি মূলত সামাজিক সুরক্ষার প্রতিষ্ঠান, সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। লাভজনক পণ্যের ব্যবসা করতে গিয়ে যদি সংস্থাটি মুনাফাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নেয়, তাহলে তার মূল দায়িত্বই দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও ভর্তুকি কার্যক্রম আলাদাভাবে পরিচালনা করা উচিত। কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কোথা থেকে কত আয় হচ্ছে এবং সেই আয় কীভাবে ভর্তুকির চাপ কমাতে ব্যবহৃত হচ্ছে—তার স্বচ্ছ হিসাব থাকা জরুরি।
টিসিবির পণ্য নিয়ে আরেকটি বড় উদ্বেগ পুনর্বিক্রয় ও কালোবাজারি। বিশেষ করে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রির পরিমাণ বাড়লে এ ঝুঁকি বাড়তে পারে। পয়েন্ট অব সেল (পিওএস), ডিজিটাল লেনদেন ও বাংলা কিউআরের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্রয় ও বিক্রয়ের তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ভর্তুকির পণ্যের দাম প্রতি তিন মাসে সমন্বয়ের পরিকল্পনাও সতর্কতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। বাজারদরের পরিবর্তনের সঙ্গে দাম সমন্বয় যুক্তিসংগত হলেও এমন মূল্য নির্ধারণ করা যাবে না, যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য টিসিবির পণ্য আর সাশ্রয়ী না থাকে।
টিসিবির ভর্তুকি কমানো প্রয়োজন, কিন্তু ভর্তুকি শূন্যে নামানোই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। অপচয়, অদক্ষতা, অতিরিক্ত সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমিয়ে কম অর্থে বেশি মানুষের কাছে সাশ্রয়ী পণ্য পৌঁছে দেওয়াই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। ‘মিশন জিরো’ তাই শুধু ভর্তুকি শূন্য করার কর্মসূচি নয়; এটি হওয়া উচিত অপচয় ও অনিয়ম কমিয়ে টিসিবিকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ। ভর্তুকির বোঝা কমবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা যেন কোনোভাবেই কমে না—এটাই নিশ্চিত করতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









