কিছু মৃত্যু সংবাদ হয়ে আসে, কিছু মৃত্যু মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ভেতরে এসে একটি দীর্ঘ করিডোর অন্ধকার করে দিয়ে যায়। সিদ্দিক মাহমুদের চলে যাওয়ার সংবাদটি আমার কাছে তেমনই একটি সংবাদ। বহুমাত্রিক লেখক ও অনুবাদক সিদ্দিক মাহমুদ ১০ আগস্ট ২০২৬ রাত ৯টার দিকে ঢাকার উত্তরার আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
একজন লেখকের মৃত্যুতে তাঁর পাঠক শোক করেন, সহকর্মীরা শোক করেন, সাহিত্যাঙ্গন একজন সৃষ্টিশীল মানুষকে হারানোর হিসাব করে। কিন্তু কোনো কোনো মানুষের মৃত্যু ব্যক্তিগত জীবনে আরও গভীর ক্ষত তৈরি করে। সিদ্দিক মাহমুদের চলে যাওয়া আমার কাছে তেমনই এক ক্ষতি-কারণ তিনি শুধু আমার একজন লেখক ছিলেন না; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমার একজন অভিভাবকসুলভ মানুষ।
প্রথম দেখাতেই বাবার ছায়া-সিদ্দিক মাহমুদের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁর আচরণ আমাকে অদ্ভুতভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাঁর মধ্যে আমি আমার বাবার ছায়া দেখতে পেয়েছিলাম। তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ ছিল প্রবল। নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়, কখনো কখনো প্রচণ্ড জেদি। সহজে কারও ওপর নির্ভর করতে চাইতেন না। নিজের জীবন নিজের মতো করে পরিচালনা করার এক অদম্য শক্তি ছিল তাঁর মধ্যে।সম্ভবত এই জায়গাটিই তাঁকে আমার কাছে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে দিয়েছিল। একজন লেখকের সঙ্গে প্রকাশকের সম্পর্ক সাধারণত বই, পাণ্ডুলিপি, প্রকাশনা, হিসাব আর সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু সব সম্পর্ক কি আর নিয়ম মেনে তৈরি হয়?
সিদ্দিক মাহমুদের সঙ্গে আমার সম্পর্কও একসময় বইয়ের পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে জীবনের পৃষ্ঠায় এসে দাঁড়িয়েছিল।তাঁর পাঁচটি বই প্রকাশের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার সুযোগ হয়েছে। আমার নিজের প্রকাশনা-জীবনেরও নানা সংকট গেছে। এমন সময়ও এসেছে যখন অর্থকষ্টে প্রকাশনার কাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই দুর্দিনে সিদ্দিক মাহমুদ নিজে আমাকে অর্থ দিয়ে বই প্রকাশের কাজে সহযোগিতা করেছেন।একজন লেখক তাঁর প্রকাশককে যখন সংকটের সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তখন সেই সম্পর্কের অভিধান বদলে যায়। সেখানে আর শুধু ‘লেখক’ ও ‘প্রকাশক’ শব্দ দুটি থাকে না; সেখানে জন্ম নেয় বিশ্বাস।
মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো ঘটার সময় সাধারণ মনে হয়। পরে সেই মুহূর্তই স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল ছবি হয়ে ওঠে।সিদ্দিক মাহমুদের সঙ্গে আমার সেই শেষ সাক্ষাৎও এখন তেমনই একটি ছবি।লেখকদের আমি আত্মার আত্মীয় মনে করি। আমি দীর্ঘদিন ধরে লেখক ও প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত। আমার কাছে লেখকরা কেবল বইয়ের লেখক নন। তাঁদের স্বপ্ন, তাঁদের দুঃখ, তাঁদের সৃষ্টির আনন্দ, তাঁদের ব্যর্থতা-এসবের সঙ্গে আমারও এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়।আমি তাঁদের আত্মার আত্মীয় মনে করি।তাই কোনো লেখকের মৃত্যু আমার কাছে কখনো শুধু সাহিত্যাঙ্গনের একটি সংবাদ নয়। মনে হয়, আমার নিজের পৃথিবী থেকেই একটি মানুষ সরে গেলেন।
সিদ্দিক মাহমুদের চলে যাওয়া আমাকে আবারও সেই শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।কেন জানি আমার কাছের মানুষগুলো খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে। সিদ্দিক মাহমুদ আজ আমাদের মধ্যে নেই। তাঁর সঙ্গে আর কথা হবে না। তাঁর রাগ শুনব না, অভিমান ভাঙাব না, কোনো অনুষ্ঠানে তাঁকে ডাকব না।কিন্তু তাঁর লেখা আছে।একজন সৃষ্টিশীল মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় তাঁর সৃষ্টি। শরীরের মৃত্যু সেই আশ্রয়কে ধ্বংস করতে পারে না।
তাই তাঁর বই, তাঁর অনুবাদ, তাঁর সাহিত্যকর্ম পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা আমার কাছে শুধু প্রকাশকের দায়িত্ব নয়-এটি এখন এক ধরনের ব্যক্তিগত দায়ও। আমি চাই না, সিদ্দিক মাহমুদের নাম শুধু একটি মৃত্যুসংবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকুক। আমি চাই তাঁর সৃষ্টির কথা বলা হোক। তাঁর বই পড়া হোক। নতুন প্রজন্ম তাঁকে জানুক। তাঁর সাহিত্যিক অবদান নিয়ে আলোচনা হোক। কারণ একজন লেখককে সবচেয়ে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায় তাঁর বইয়ের ভেতর দিয়ে।
আজ সিদ্দিক মাহমুদের জন্য লিখতে বসে বারবার মনে হচ্ছে-আমি একজন লেখকের মৃত্যু নিয়ে লিখছি না; আমি একজন আপন মানুষকে হারানোর কথা লিখছি।একজন মানুষ, যার মধ্যে আমার বাবার ছায়া দেখেছিলাম।একজন মানুষ, যার সঙ্গে আমার বইয়ের সম্পর্ক ছিল, আবার জীবনেরও সম্পর্ক ছিল। একজন মানুষ, যিনি নিজের একাকিত্বের মধ্যেও অন্যের কাজে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
একজন মানুষ, যিনি অভিমান করেছেন, রাগ করেছেন, আবার ভালোও বেসেছেন তাঁর নিজের মতো করে।আজ তাঁর জন্য আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রার্থনা-মহান আল্লাহ তাঁর সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।সিদ্দিক মাহমুদ চলে গেলেন।কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার কিছু কথা অসমাপ্ত রয়ে গেল।কিছু অভিমানও।কিছু ভালোবাসাও।
আর কিছু দায়িত্ব। সেই দায়িত্বের নাম-তাঁর সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখা। মানুষের জীবন শেষ হয়।শব্দের জীবন শেষ হয় না। সিদ্দিক মাহমুদ তাঁর শব্দের ভেতর বেঁচে থাকুন- আমাদের পাঠে, স্মরণে এবং আগামী দিনের সাহিত্যে।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









