সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার, অথচ কৃষকের হাতে নেই- এই বৈপরীত্য শুধু বিস্ময়কর নয়, উদ্বেগজনকও। আমন মৌসুমের শেষ পর্যায় এবং সামনে রবি মৌসুমের প্রস্তুতির সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষককে সার পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, কোথাও নির্ধারিত দামে সার মিলছে না, আবার কোথাও অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে- গুদামে সার থাকার পরও মাঠে এই হাহাকার কেন? সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান সত্য হলে দেশে সারসংকট থাকার কথা নয়। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন সারের চাহিদার বিপরীতে মজুদ প্রায় ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন। অর্থাৎ উদ্বৃত্ত থাকার কথা প্রায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন। তাহলে এই বিপুল মজুদ কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না কেন- এ প্রশ্নের জবাব এখন জরুরি।
সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া কিছু ডিলার, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং তাদের সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। কোথাও সরকারি গুদাম থেকে বরাদ্দের সার পুরোপুরি উত্তোলন না করা, কোথাও অবৈধ মজুদ, আবার কোথাও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এমনকি কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা নিছক ব্যবসায়িক অনিয়ম নয়; এটি কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ।
তবে শুধু ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ডিলারদের পক্ষ থেকেও বরাদ্দ ও সরবরাহ কম থাকার অভিযোগ রয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগনীতি বাস্তবায়ন, বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলারদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, বেসরকারি আমদানির প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের আশঙ্কার কথাও সামনে এসেছে। অর্থাৎ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করে তদন্তের বিকল্প তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কৃষক।
একজন কৃষক সার কিনতে গিয়ে যদি সারাদিন নষ্ট করেন, শ্রমিকের মজুরি হারান এবং শেষ পর্যন্ত বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হন, তবে সরকারি মজুদের হিসাব তার কাছে অর্থহীন। কৃষকের প্রয়োজন গুদামের সংখ্যা নয়- সময়মতো, পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া। তাই এখন দরকার রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে কঠোর ও স্বচ্ছ তদন্ত।
কোন জেলায় কত সার বরাদ্দ হয়েছে, কত উত্তোলন হয়েছে, কোন ডিলারের গুদামে কত মজুদ আছে এবং কত দামে বিক্রি হয়েছে- এসব তথ্য প্রকাশ্যে আনতে হবে। ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে গুদাম থেকে কৃষকের হাত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। কালোবাজারি বা অবৈধ মজুদের প্রমাণ পাওয়া গেলে দল-মত নির্বিশেষে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সার ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতি যদি প্রয়োজনীয় সংস্কার আনে, তাকে অবশ্যই স্বাগত জানাই। কিন্তু নীতি পরিবর্তনের মধ্যবর্তী সময়ে কৃষকের দুর্ভোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে নতুন ডিলার নিয়োগও যেন রাজনৈতিক আনুগত্যের নতুন বণ্টনব্যবস্থায় পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সার নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
গুদামে সার থাকলেই সংকট নেই- কৃষকের জমিতে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছানোই আসল সাফল্য। তাই কার কারসাজিতে সারে হাহাকার, সেটি রাজনৈতিক অভিযোগে নয়, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত উদ্ঘাটন করতে হবে। কৃষকের পকেট কেটে কোনো সিন্ডিকেট লাভবান হলে কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতায় উৎপাদন ব্যাহত হলে তার দায় কাউকে এড়াতে দেওয়া যাবে না। খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে সার বিতরণব্যবস্থায় এখনই জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









