কিছু দশক আগেও চাকরি মানে ছিল নির্দিষ্ট অফিস, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন। ডিজিটাল প্রযুক্তি বিস্তারের সঙ্গে সেই চিত্র দ্রুত বদলে গেছে। এখন কাজের জন্য সবসময় অফিসে যেতে হয় না, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কর্মী হওয়াও অপরিহার্য নয়। একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাজ পাওয়া যাচ্ছে, কাজ শেষ হলে পারিশ্রমিক মিলছে।
ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইনভিত্তিক কাজ, রাইড-শেয়ারিং, খাবার ও পণ্য সরবরাহসহ বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি বা কাজভিত্তিক কর্মসংস্থানের সমন্বিত রূপই গিগ ইকোনমি নামে পরিচিত। বিশ্বব্যাংকের ‘Working Without Borders: The Promise and Peril of Online Gig Work’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, অনলাইন গিগ কাজ দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে পরিচালিত গবেষণায় বিশ্বব্যাপী অনলাইন গিগ কর্মীর সংখ্যা আনুমানিক ১৫৪ মিলিয়ন থেকে ৪৩৫ মিলিয়নের মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
গবেষণাটি একই সঙ্গে দেখিয়েছে, এই কাজের বাজার বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তরুণদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও গিগ ইকোনমি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। প্রচলিত চাকরির বাজারে সীমিত সুযোগের পাশাপাশি ইন্টারনেটভিত্তিক কাজ অনেককে দেশের সীমানার বাইরে থাকা গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে। গ্রাফিক ডিজাইন, প্রোগ্রামিং, ব্লগিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, অনুবাদ, ডেটা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজসহ নানা ধরনের সেবা এখন ঘরে বসেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব। আবার শহরাঞ্চলে রাইড-শেয়ারিং ও ডেলিভারি সেবাও তৈরি করেছে আরেক ধরনের প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মসংস্থান। এই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো নমনীয়তা। প্রচলিত চাকরির মতো সবসময় নির্দিষ্ট সময় ও কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই। নিজের সময় ও সামর্থ্য অনুসারে কাজ বেছে নেওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই থাকে।
শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে পারে, কেউ অতিরিক্ত আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে, আবার কেউ এটিকে পূর্ণকালীন পেশায় পরিণত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও অনলাইন গিগ কাজকে তরুণ, নারী এবং অপেক্ষাকৃত সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য আয়ের নতুন সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সবকিছুর পরেও একটি প্রশ্ন অমূলক নয়। সেটি হলো- গিগ ইকোনমি কি সত্যিই স্বাধীন পেশা? বাইরে থেকে দেখলে গিগ কর্মী নিজের সময়ের নিজেই মালিক। কিন্তু কাজের পরিমাণ, আয়, পারিশ্রমিক কিংবা ভবিষ্যতের কাজের নিশ্চয়তা সবসময় তার হাতে থাকে না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের রেটিং ব্যবস্থা, গ্রাহকের চাহিদা, অ্যালগরিদম এবং প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব নীতিমালা একজন কর্মীর কাজের সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।
অর্থাৎ কর্মী হয়ত প্রতিষ্ঠানের সরাসরি কর্মচারী নন, কিন্তু তার কাজের ওপর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার প্রভাব রয়েছে। এখানেই আসে-আয় অনিশ্চয়তার প্রশ্ন। স্থায়ী চাকরিতে একজন কর্মী সাধারণত মাস শেষে কত টাকা পাবেন, তা আগে থেকেই জানেন। গিগ কর্মীর ক্ষেত্রে আয় নির্ভর করতে পারে কাজের সংখ্যা, সময়, চাহিদা, প্ল্যাটফর্মের কমিশন এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর। কাজ থাকলে আয় আছে, কাজ কমে গেলে আয়ও কমে যায়। ফলে, ‘নিজের বস’ হওয়ার স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত হয় ‘নিজের ঝুঁকি নিজেকেই বহন করার’ বাস্তবতা। সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতিও বড় সমস্যা। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, কর্মক্ষমতা হারানো, অবসর বা কাজের সাময়িক সংকট এসব পরিস্থিতিতে গিগ কর্মীরা অনেক সময় প্রচলিত চাকরির কর্মীদের মতো সুরক্ষা পান না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, ডিজিটাল শ্রম প্ল্যাটফর্মগুলোতে আয়ের সুযোগ বাড়ালেও অনেক দেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি।
ফলে, শ্রমিকের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, গিগ অর্থনীতিতে অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ একটি নতুন বাস্তবতা। একজন কর্মী কখন কাজ পাবেন, কীভাবে তার কর্মদক্ষতা মূল্যায়িত হবে কিংবা তার অ্যাকাউন্টের অবস্থান কী হবে- এসব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে, কর্মী স্বাধীন হলেও প্ল্যাটফর্মের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার ওপর তার নির্ভরতা তৈরি হয়। এই কারণেই গিগ কর্মীদের অধিকার এখন আন্তর্জাতিক শ্রমনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। ২০২৬ সালের জুনে আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলন প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিতে শোভন কাজ নিশ্চিত করার জন্য ILO Convention No. 193 গ্রহণ করেছে। তথ্য অনুসারে, এটি প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে গৃহীত প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমমান। এতে পারিশ্রমিকের স্বচ্ছতা, সামাজিক সুরক্ষা, অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তথ্য, কর্মপরিবেশ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ, দেশে ডিজিটাল কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গিগ কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে নীতিগত আলোচনাও প্রয়োজন। শুধু তরুণদের ‘ফ্রিল্যান্সিং শিখুন’ বা ‘ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করুন’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কাজের পারিশ্রমিকের স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং ন্যায্য কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচিত গিগ কর্মীদের বাস্তব অবস্থানকে নীতিনির্ধারণের আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া। প্ল্যাটফর্মগুলোরও দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। কর্মীদের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, চুক্তির শর্ত বোঝা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনার সক্ষমতা। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো জরুরি, যাতে একজন কর্মী একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে নিজের দক্ষতার ভিত্তিতে একাধিক কর্মক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি করতে পারেন। তবে, গিগ ইকোনমিকে কেবল অনিশ্চয়তার প্রতীক হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না।
এটি শ্রমবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। বিশেষ করে, দক্ষ তরুণদের জন্য এটি আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করেছে। একজন মানুষ নিজের দক্ষতা ও সময়কে ভৌগোলিক সীমার বাইরে কাজে লাগাতে পারছেন। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তন। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাও দেখায়, অনলাইন গিগ কাজ উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জন্য আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন তার সঙ্গে নিরাপত্তা ও মর্যাদা থাকে।
একজন কর্মী যদি নিজের সময় বেছে নিতে পারেন, কিন্তু অসুস্থ হলে আয় হারান; যদি কাজের সুযোগ থাকে, কিন্তু পারিশ্রমিকের কাঠামো স্বচ্ছ না হয়; যদি প্ল্যাটফর্মে কাজ করেন, কিন্তু সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার না থাকে। তাহলে সেই স্বাধীনতা কতটা টেকসই, সেটি ভাবার বিষয়। গিগ ইকোনমি তাই একই সঙ্গে স্বাধীনতার নতুন দরজা এবং অনিশ্চিত কর্মজীবনের সম্ভাব্য ফাঁদ। প্রযুক্তিকে থামিয়ে দেওয়া সমাধান নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কর্মব্যবস্থাকে ন্যায়সংগত ও মানবিক করে তোলা প্রয়োজন।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









