২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে সচিবালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।
ববি হাজ্জাজ বলেন, সাক্ষরতা শুধু পড়তে, লিখতে ও গণনা করতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন সাক্ষর মানুষ তথ্য বুঝতে ও বিশ্লেষণ করতে পারেন, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকেন। শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে তিনি নিজের পাশাপাশি পরিবারের জীবনমান উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারেন। পাশাপাশি পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও সাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্যেও সাক্ষরতাকে শুধু পড়া, লেখা ও গণনার সক্ষমতা হিসেবে না দেখে মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন, পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক ও বয়স্ক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করার কাজ করছে।
তিনি জানান, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ সাক্ষরতা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। তবে এই অগ্রগতির পরও একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী কার্যকর সাক্ষরতা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার বাইরে রয়েছে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলার সদর উপজেলায় ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ (প্রাক-বৃত্তিমূলক পর্যায়)’ কার্যক্রম চলছে। প্রথম ধাপে প্রতি জেলা থেকে ৮০ জন করে মোট ৫ হাজার ১২০ জন ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রতিটি কোর্সে ৪৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১০০ ঘণ্টা কার্যকর সাক্ষরতা এবং ৩৬০ ঘণ্টা দক্ষতা প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর (বিএনকিউএফ) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষা থেকে কর্মে উত্তরণের সুযোগ তৈরি করা। বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন সক্ষম হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন, অর্থাৎ ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের কর্মসংস্থানের সংযোগ পেয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, উত্তীর্ণদের মধ্যে ৬০৩ জন সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন। ৮৭৯ জন শোভন কাজে শিক্ষানবিশ হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। ১ হাজার ৩০৪ জন উদ্যোক্তা হিসেবে কর্মে যুক্ত হয়েছেন এবং ৪৮৯ জন উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্যে পরামর্শকের অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করছেন।
এ ছাড়া ৪৫৮ জন বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর প্রথম স্তরে এবং ১০৪ জন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএসসি (ভোকেশনাল) কার্যক্রমে ভর্তি হয়েছেন।
ববি হাজ্জাজ বলেন, এসব পরিসংখ্যানই দেখায়, সাক্ষরতার সঙ্গে দক্ষতা যুক্ত করা গেলে তা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি জানান, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিকল্প শিক্ষা সুযোগ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলার নির্বাচিত ৬৪টি উপজেলায় ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১৯ হাজার ২০০ বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোরকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে আরও ১৯ হাজার ২০০ জন ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণকে জীবিকায়ন দক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতা কার্যক্রম দেশের আরও ১৬টি জেলায় সম্প্রসারণ করা হবে। এর মাধ্যমে তিন বছরে ১ লাখ কিশোর-কিশোরীকে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর চলমান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেই বিশেষ কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপে দেশের ৫০টি জেলায় আরও ৪ হাজার কিশোর-কিশোরীকে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
দেশকে নিরক্ষরতামুক্ত করতে ‘প্রত্যেকে একজনকে শেখাবে’ মডেলের আলোকে প্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষরতা ও কার্যকর সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাইলট পর্যায়ে ৪০টি জেলার ৪০টি উপজেলায় ৩৫ হাজার নিরক্ষর নারী-পুরুষকে প্রায়োগিক সাক্ষরতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাইলট কর্মসূচির অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে মূল কর্মসূচির আওতায় ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর নারী ও পুরুষকে প্রায়োগিক সাক্ষরতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেন, এসব কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে ২০৩১ সাল নাগাদ দেশের সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিশ্বব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হবে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য—‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









