সাদেক আর সায়মার অনেক দিনের সুখের সংসার। মনোরম বাড়ি, ব্যাংকে লাখ টাকা জমা, ফ্রিজে মাছ-মাংস, আলমারিতে কাপড়চোপড়—অভাব বলতে তেমন কিছুই নেই। কিন্তু একটা সমস্যা আছে, আর সেই সমস্যার নাম সাদেক।
সাদেক একটু কৃপণ প্রকৃতির মানুষ। তবে তাকে কৃপণ বললে সে ভীষণ রাগ করে। তার ভাষায়, সে কৃপণ নয়—সে ‘অর্থনৈতিকভাবে সচেতন’।
কেউ যদি বলে, ভাই, আপনি তো বেশ কৃপণ!
সাদেক সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করে দেয়,
কৃপণ বলবেন না। বলবেন, আমি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পরিহার করি।
একদিন পাশের বাড়ির করিম সাহেব তাকে বললেন,
সাদেক ভাই, আপনার বাসার সামনে যে বাতিটা লাগানো ছিল, সেটা কয়েকদিন ধরে জ্বলছে না কেন?
সাদেক গম্ভীর মুখে বলল, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করছি।
করিম সাহেব বললেন, কিন্তু বাতিটা তো সৌরবিদ্যুতের!
সাদেক একটু থেমে বলল, তাই নাকি? তাহলে সূর্যকে বলেছি, আলোটা যেন একটু কম দেয়।
করিম সাহেব আর কথা বাড়াননি। সাদেকের এমন কাণ্ডে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত সায়মা। সংসারের সব কাজ প্রায় একাই করতে হয় তাকে। রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার, বাজারের হিসাব, অতিথি এলে আপ্যায়ন—সবকিছু সামলাতে সামলাতে তার নিজের জন্য সময়ই থাকে না। তাই বহুদিন ধরে সায়মার একটাই দাবি—একজন কাজের মেয়ে রাখা হোক।
কিন্তু সাদেকের কাছে ‘কাজের মেয়ে’ মানেই মাস শেষে অতিরিক্ত খরচ। সে হিসাব করে দেখেছে, মাসে কয়েক হাজার টাকা দিতে হবে। বছরে কত দাঁড়ায়, পাঁচ বছরে কত দাঁড়ায়—এসব হিসাব করতে করতে তার মাথায় যেন ক্যালকুলেটর বসানো। একদিন সকালে সায়মা বলল,
শোনো, এবার কিন্তু একজন মানুষ রাখতে হবে। আমি আর পারছি না।
সাদেক খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বলল, মানুষ রাখার দরকার কী?
কাজ করার জন্য।
তুমি করো।
আমি কি মেশিন?
মেশিন হলে তো বিদ্যুৎ বিল লাগত।
সায়মা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
তুমি কি আমাকে মানুষ মনে করো?
সাদেক বলল, অবশ্যই। মানুষ বলেই তো এতদিন ধরে তোমাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছি।
সায়মা তখন বুঝল, তার স্বামীকে যুক্তি দিয়ে হারানো যাবে না। সে বলল, আমি কাজের মানুষ নই। আমারও বিশ্রাম দরকার।
সাদেক বলল, বিশ্রাম নেবে। দুপুরে খাওয়ার পর পাঁচ মিনিট বসে থেকো।
পাঁচ মিনিট?
হ্যাঁ। চাইলে দশ মিনিটও দিতে পারি।
সায়মা হতাশ হয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। কয়েকদিন পর আবার একই আলোচনা। সায়মা বলল, তোমার এত টাকা ব্যাংকে পড়ে আছে। একটা কাজের মেয়ে রাখলে কী এমন ক্ষতি হবে?
সাদেক সঙ্গে সঙ্গে বলল, ব্যাংকে টাকা পড়ে আছে বলেই তো সেটা খরচ করতে হবে—এমন কোনো নিয়ম আছে?
তাহলে ব্যাংকে রাখছ কেন?
বাড়িতে রাখলে তুমি খরচ করে ফেলবে।
আমি?
হ্যাঁ।
আমি কী খরচ করি?
সাদেক আঙুল গুনতে শুরু করল।
গত মাসে নতুন পর্দা। তার আগের মাসে কুশন। তার আগে ফুলের টব। তার আগে...
সায়মা বাধা দিয়ে বলল, এইগুলো সংসারের জিনিস।
সংসারের জিনিস হলেও টাকা তো আমার সংসার থেকেই গেছে!
এই নিয়ে প্রায়ই তাদের ঝগড়া হয়। অবশেষে একদিন সায়মা রাগে বলে বসল, তোমার সংসারের কাজকর্ম আমি আর করতে পারব না। সারাক্ষণ কাজ করতে করতে তুমি আমাকে কাজের বেটি বানিয়ে ফেলেছ!
সাদেক তখন সোফায় বসে চা খাচ্ছিল। সে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এমনভাবে বলল যেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি করতে যাচ্ছে।
তাহলে তুমি কত ভাগ্যবতী দেখো!
কীভাবে?
এই বাড়ির কাজের বেটি হয়েও তুমি আমার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকো, আমার সঙ্গে গল্প করো, আমার সঙ্গে খাও, একই বেডে ঘুমাও। পৃথিবীর আর কোনো কাজের বেটির এমন সৌভাগ্য আছে?
সায়মা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর রাগে মুখ লাল হয়ে গেল। সে কিছু না বলে রান্নাঘরে চলে গেল। পাতিলের তলায় জমে থাকা কালো দাগ ছাই দিয়ে ঘষতে ঘষতে মনে মনে বলল, ‘এই মানুষটার সঙ্গে সংসার করা সত্যিই কঠিন।’ কিন্তু সাদেকের মনে হলো, সে বোধহয় দারুণ একটা রসিকতা করেছে। সে একা একা হাসতে হাসতে বলল, 'আমার রসিকতা বুঝতে পারে না!'
পরদিন সকালে সায়মা নাশতা বানিয়ে টেবিলে রাখল। সাদেক এসে দেখল পরোটা, ডিমভাজি, সবজি—সব সুন্দর করে সাজানো। সে খুশি হয়ে বলল, বাহ! আজ এত আয়োজন!
সায়মা শান্ত গলায় বলল, হ্যাঁ। আজ থেকে আমি তোমার ‘কাজের বেটি’ হিসেবে শেষ দিনের দায়িত্ব পালন করছি।
সাদেকের মুখের হাসি একটু কমে গেল।
মানে?
আজ থেকে তুমি নিজের কাজ নিজে করবে।
সাদেক বলল, আমি তো নিজের কাজ নিজেই করি।
তাহলে খুব ভালো। আজ থেকে নিজের চা নিজে বানাবে। নিজের জামাকাপড় নিজে গুছাবে। নিজের প্লেট নিজে ধুবে।
সাদেক এবার গম্ভীর হয়ে বলল, এটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?
সায়মা বলল, কেন? কাজের বেটি তো আমি। তুমি তো মালিক।
সাদেক বুঝল, গতকালের কথাটা আজ তার গলায় দড়ি হয়ে ফিরে এসেছে। তবে সে সহজে হার মানার মানুষ নয়। সে বলল, ঠিক আছে। আমি কাজ শিখে নেব।
সায়মা মনে মনে বলল, ‘দেখি কতক্ষণ!’
সেদিনই সাদেক প্রথমবার রান্নাঘরে ঢুকল। প্রথম কাজ—চা বানানো। সে চা বানাতে গিয়ে চিনি দিতে গিয়ে ভুল করে লবণ দিয়ে ফেলল। এক চুমুক দিয়ে মুখ এমনভাবে বাঁকাল যে সায়মা হাসি চাপতে পারল না। সাদেক বলল, চুপ! এটা নতুন রেসিপি।
কী রেসিপি?
লবণ-চা।
এটা আবার কী?
চীনের মানুষ নাকি লবণ দিয়ে চা খায়।
তুমি চীন পর্যন্ত চলে গেলে কেন?
টাকা বাঁচানোর জন্য।
চীনেও টাকা বাঁচবে?
দেশ বদলালে খরচ কমে যেতে পারে।
এরপর শুরু হলো কাপড় ধোয়ার পালা। সাদেক ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ঢুকিয়ে এমন পরিমাণ ডিটারজেন্ট দিল যে ফেনা বেরিয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। সায়মা দৌড়ে এসে বলল,এ কী করেছ?
পরিষ্কার করছি।
এটা কাপড় ধোয়া নাকি ফেনার কারখানা?
ডিটারজেন্ট বেশি দিলে কাপড় বেশি পরিষ্কার হবে।
তাহলে এক কেজি ডিটারজেন্ট দিলে কাপড়ের সঙ্গে কাপড়ের আত্মীয়স্বজনও পরিষ্কার হয়ে যাবে!
সাদেক চুপ করে গেল। দুদিনের মধ্যেই তার আত্মবিশ্বাস অর্ধেক হয়ে গেল। তৃতীয় দিন সকালে সে নিজেই বলল, সায়মা, কাজের মেয়ে রাখলে কেমন হয়?
সায়মা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।
কী বললে?
বললাম, কাজের মেয়ে রাখা যায়।
তুমি?
হ্যাঁ।
কেন?
সাদেক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি বুঝেছি, টাকা বাঁচানোরও একটা সীমা আছে।
তাহলে অবশেষে বুদ্ধি হয়েছে!
তবে একটা শর্ত আছে।
কী?
যে মেয়েকে রাখব, সে যেন আমার হিসাবের খাতা ছোঁয় না।
কেন?
হিসাবের খাতায় হাত দিলে আমার মনে হয় টাকা কমে যাচ্ছে।
তোমার টাকা কমে না। তোমার সন্দেহ বাড়ে।
অবশেষে একজন কাজের মেয়ে রাখা হলো।
মেয়েটির নাম রুমা। সে প্রথম দিন এসেই বাড়ির কাজকর্ম দেখে বলল, আপা, কাজ তো অনেক!
সায়মা বলল, হ্যাঁ, অনেক।
রুমা সাদেকের দিকে তাকিয়ে বলল, বেতন কত দেবেন?
সাদেক সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
আগে কাজ দেখুন।
রুমা বলল, বেতন না জানলে কাজ দেখব কীভাবে?
সাদেক বলল, আপনি আগে কাজ করেন, পরে আলোচনা হবে।
রুমা বলল, না ভাই, আগে বেতন। আমি কাজ করতে এসেছি, বিনিয়োগ করতে না।
সায়মা পাশ থেকে মুখ চেপে হাসতে লাগল। শেষ পর্যন্ত বেতন ঠিক হলো। রুমা কাজ শুরু করার পর সায়মার জীবন যেন বদলে গেল। সে একটু সময় পেল নিজের জন্য। সকালে ঘুম থেকে উঠে আর দৌড়াতে হয় না। বিকেলে বারান্দায় বসে চা খেতে পারে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লম্বা সময় ধরে সাজতেও পারে। সাদেকও খুশি। তবে এক মাস পর বেতন দেওয়ার দিন আবার তার পুরোনো রোগ দেখা দিল।
রুমা এসে বলল,ভাই, আমার বেতনটা দেবেন?
সাদেক বলল, অবশ্যই দেব।
তারপর পকেট থেকে টাকা বের করে একবার দেখল। দুইবার দেখল। তিনবার দেখল।
রুমা বলল,
কী হলো?
টাকাগুলো আজকে কেমন যেন বেশি মনে হচ্ছে।
টাকা বেশি না, আপনার কষ্ট বেশি।
সায়মা পাশ থেকে বলল, দাও টাকা।
সাদেক টাকা দিল। রুমা চলে যাওয়ার পর সাদেক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মাসে মাসে এভাবে টাকা চলে যাবে!
সায়মা বলল, হ্যাঁ। আর তুমি বেঁচে যাবে।
কীভাবে?
আগে তুমি টাকা বাঁচাতে গিয়ে নিজেই কাজ করছিলে। এখন টাকা খরচ করে সময় বাঁচাচ্ছ।
সাদেক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, মানে সময়ও একটা সম্পদ?
অবশ্যই।
তা হলে আমি এতদিন খুব গরিব ছিলাম।
কেন?
আমার টাকা ছিল, কিন্তু সময় ছিল না।
এই কথাটা বুঝতে তোমার এত বছর লাগল?
টাকা বাঁচাতে গিয়ে অনেক সময় লাগে বুঝতে!
সেদিন রাতে সাদেক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কেন যে বিয়ে করতে গেলাম! কেবল খরচ আর খরচ।'


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









