নির্মাণকাজ শেষ হতে না হতেই ছাদ ফুঁড়ে পড়ছে বৃষ্টির পানি, বেরিয়ে এসেছে বিমের রড, আর হাত দিয়ে চাপ দিলেই গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ছে দেয়ালের প্লাস্টার। বরিশাল জেলা পরিষদের অর্থায়নে মেহেন্দিগঞ্জের ভাসানচরে নির্মিত সাতগাঁ আজিজিয়া দাখিল মাদরাসার একতলা ভবনের করুণ চিত্র এটি। অভিযোগ উঠেছে, সরকারের প্রায় ১ কোটি টাকার এই প্রকল্পে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়েছে। আর এই পুরো অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল কারিগর হিসেবে আঙুল উঠেছে জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী বিপ্লব কুমার বিশ্বাসের দিকে।
উপজেলার ভাসানচর এলাকায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলা পরিষদের এডিপি বরাদ্দের আওতায় সাতগাঁ আজিজিয়া দাখিল মাদরাসার নতুন ভবন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ৮২ লাখ ৩৫ হাজার ১২২ টাকা ব্যয় ধরে ড্রয়িং, ডিজাইন ও প্রাক্কলন অনুমোদন করা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শুরু থেকেই জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী বিপ্লব কুমার বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে নজিরবিহীন অনিয়ম শুরু হয়।
মাদরাসার সুপার মাওলানা নুরুল আমিন কালাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ভবনের ঢালাইয়ের কাজ এতটাই নিম্নমানের হয়েছে যে মাত্র চার মাসের মাথায় সামান্য বৃষ্টিতেই ক্লাসরুমের ভেতর পানি পড়ছে। কাঠের যে দরজা লাগানো হয়েছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের, আর লোহার জানালাগুলো ঢিলা হয়ে খুলে নিচে পড়ে গেছে। এছাড়া ছাদে বসানো ৫শ লিটারের পানির ট্যাংকিটি পুরোপুরি ব্যবহারের অনুপযোগী।
অনিয়মের মাত্রা বোঝাতে গিয়ে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আঃ গনি হাওলাদার বলেন, একেবারে ৩য় গ্রেডের বা চার নম্বর পোড়ামাটির ইট দিয়ে ভবনটি তৈরি করা হয়েছে। পর্যাপ্ত সিমেন্ট না দেওয়ায় ছাদ থেকে খোঁয়া ও বালু উঠে আসছে। অনিয়মের একটা সীমা থাকে, কিন্তু একতলা এই ভবনটিতে সব সীমা অতিক্রম করা হয়েছে। আমি ঠিকাদারকে দুষব না, কারণ প্রকৌশলী বিপ্লব সব সময় দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করতেন এবং ঠিকাদারের প্রশংসা করতেন। এতে বুঝতে বাকি থাকে না কার পকেটে টাকা গেছে।
অন্যান্য বাসিন্দারা জানান, ৩ নম্বর ইট হাত দিয়ে চাপ দিলেই ভেঙে যেত, সেই ইট দিয়েই তৈরি হয়েছে জ্ঞানের এই আলো ছড়ানো প্রতিষ্ঠানটি। নির্মাণের চার মাসের মাথায় যদি এই দশা হয়, তবে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা কীভাবে এখানে ক্লাস করবে, তা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মোহাম্মদ আলী স্বপন ও আজগর আলী। তাদের দাবি, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে নিম্নমানের কাজ দেখেও না দেখার ভান করেছেন সহকারী প্রকৌশলী।
ইতিমধ্যেই দুর্নীতির প্রতিকার ও তদন্তের দাবি জানিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন মাদরাসার সুপার ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের গণস্বাক্ষরও যুক্ত করা হয়েছে।
মাদরাসার সুপার মাওলানা নুরুল আমিন কালাম বলেন, আমরা এই অনিয়ম ও দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত চাই। সরকারি এতগুলো টাকা বরাদ্দের পর এই নিম্নমানের কাজ করায় কার পকেটে কত টাকা ঢুকেছে, তা বের করে সহকারী প্রকৌশলী বিপ্লব কুমার বিশ্বাসসহ জড়িত সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
অনিয়মের সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বরিশাল জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী বিপ্লব কুমার বিশ্বাস বলেন, ফাইনাল বিল নিয়ে ঠিকাদারের সাথে একটু ঝামেলা ছিল, সেটি পাস হয়ে গেছে। কাজের কিছু কাজ এখনো বাকি আছে, যে সমস্যাগুলো দেখা দিয়েছে তা ঠিক করে দেওয়া হবে। বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) ইমতিয়াজ মাহমুদ জুয়েলের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান। তিনি বলেন, অভিযোগের কাগজপত্র এখনো হাতে পাইনি, তবে নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









