ভোর তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। রাতের শেষ অন্ধকারটুকু উঠানের কোণে কোণে বসে আছে। শিশিরভেজা বাতাসে গ্রামটি যেন ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সেই নিস্তব্ধতার মধ্যেই দবির উঠেছিল বেলালের নারিকেলগাছে। মানুষের লোভেরও বোধহয় নিজস্ব সময় আছে। কারও লোভ দুপুরে জাগে, কারও সন্ধ্যায়; দবিরের লোভ জেগেছিল ভোরের আগে। হাতে ছোট একটি দা। লক্ষ্য—গাছের মাথায় দুলতে থাকা কয়েকটি কচি ডাব।
ডাবগুলো বেলালের।এই সামান্য তথ্যটুকুই দবিরের অভিযানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
গাছের পাতাগুলো তখন অন্ধকারে মৃদু শব্দ করছিল। দবির সাবধানে দা চালায়। একটি ডাব কেটে নিচে ফেলল।
টুপ করে শব্দ হলো।তারপর আরেকটি।কিন্তু পৃথিবী কখনো কখনো মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে বড় গল্প লিখে রাখে।
তৃতীয়বার দা চালাতেই গাছের কোথাও যেন অদৃশ্য এক দরজা খুলে গেল।একঝাঁক ভিমরুল বেরিয়ে এল। প্রথমে দবির হয়তো ভাবল, এ সামান্য ব্যাপার। হাত নেড়ে তাদের সরিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু ভিমরুলের নিজস্ব বিচারবোধ আছে; তারা দবিরের সঙ্গে কোনো আপসের প্রস্তাব নিয়ে আসেনি।
মুহূর্তের মধ্যে গাছের মাথায় তার শান্ত অভিযান পরিণত হলো এক অপ্রত্যাশিত বিশৃঙ্খলায়।
দবিরের হাত কেঁপে উঠল। পায়ের নিচের ডাল যেন হঠাৎ অপরিচিত হয়ে গেল।
ভোরের মাটিতে তার সঙ্গে পড়ে রইল কয়েকটি ডাব।কিছুক্ষণ পর উঠানের নীরবতা আবার ফিরে এল।শুধু গাছের পাতাগুলো আগের মতোই দুলছিল।
সকাল হলো। বেলালের ঘুম ভাঙল দবিরের কাতর ডাক শুনে।প্রথমে সে বুঝতে পারেনি, কে ডাকছে। বাইরে এসে দেখল—গাছের নিচে দবির পড়ে আছে। পাশে কয়েকটি কাটা ডাব।
বেলাল কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর বলল, 'দবির, তুমি এহানে কী করছ?'
দবির চোখ মেলে তাকাল। মুখে ব্যথার ছাপ, কণ্ঠে পরাজয়ের ক্লান্তি।
'ভাই, আগে আমারে ওঠা।'
বেলাল কাছে গিয়ে ডাবগুলোর দিকে তাকাল।
কিছু কিছু সত্য মানুষের মুখে বলার প্রয়োজন হয় না। পাশে পড়ে থাকা কাটা ডাবই যথেষ্ট সাক্ষ্য।
পুলিশ এলো।দবিরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হলো।যাওয়ার সময় একজন পুলিশ সদস্য মৃদু হাসিতে বললেন,
'ডাব চুরি করতে এসেছিলি?'
দবির কোনো উত্তর দিল না।হয়তো তখন তার মনে হচ্ছিল, মানুষ জীবনে অনেক কিছুই বিনা মূল্যে পেতে চায়—অন্যের গাছের ডাব, জমির ফসল অথবা সৌভাগ্য।কিন্তু প্রকৃতি বিনা মূল্যে কিছু দেয় না।কখনো তার মূল্য দিতে হয় টাকায়, কখনো লজ্জায়, কখনো হাসপাতালে গিয়ে।আর কোনো কোনো দিন—ভিমরুলের হাতে। সেদিন বেলালের গাছের ডাবগুলো শেষ পর্যন্ত আর দবিরের হলো না।তবে দবির কিছু একটা নিয়ে ফিরেছিল।ভিমরুলের ডানা ঝাপটানোর শব্দের মাঝে হুল ফোটানোর কাব্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









