সবসময় স্বামীকে চোখে চোখে রাখবে,বুঝলে বুঝলে বউমা। কোথায় যায়, কার সাথে আড্ডা মারে, কার সাথে মোবাইলে চ্যাট করে। সবকিছু মনোযোগ দেখবে আর শুনবে। সেলিনা বেগম বললেন। রাবুর খালা শ্বাশুড়ি। মাঝে মাঝেই ফোন করে ওর আর সেলিমের খোঁজখবর নেন।
জি খালাম্মা। শান্ত গলায় বলল রাবু।
অফিস থেকে যখন ফিরবে তখন ভালো করে গায়ের জামা পরীক্ষা করে দেখবে।
কেন খালাম্মা?
তুমি দেখি কিছুই বোঝ না বউমা। অফিসে কত মেয়ে কলিগ থাকে। তাদের সাথে অফিসে কোনো উল্টাপাল্টা করে কি না বুঝবে কীভাবে?
কীভাবে খালাম্মা?
শার্ট চেক করবে। অনেক সময় শার্টে লিপস্টিকের দাগ লেগে থাকে। শার্টের বোতাম ছেড়া থাকে। শার্টে লম্বা চুল লেগে থাকে। তোমার খালুকে তো এভাবেই টাইট দিয়ে রেখেছিলাম।
একবার হয়েছে কী শুনবে?
বলুন। বলতে বলতে হাই তুলল রাবু। খালুর শার্টের বোতাম ছিঁড়ে গিয়েছিল। সেই বোতাম কীভাবে অফিসে গিয়ে খালুর পিএ-র ব্যাগ থেকে উদ্ধার করেছিলেন তারই সরস বর্ণনা আরেকবার দিলেন সেলিনা খালা।
আসল কথা আমি কাউকে বলিইনি। ফিসফিস করে বললেন তিনি।
কী কথা খালাম্মা?
আমি যদি বুদ্ধি করে সেদিন ঐ মেয়েটার ব্যাগে বোতামটা না রাখতাম তাহলে ঐ মেয়ের চাকরিও যেত না আর আজ মলি নামের ঐ সেক্রেটারিটা আমার সতীন হয়ে থাকত।
খিলখিল করে হেসে উঠলেন সেলিনা।
ঠিক তখনই বাসার কলিংবেল বেজে উঠল।
খালাম্মা, এখন রাখি। আপনার ছেলে বোধহয় অফিস থেকে এসেছে।
ঠিক আছে। যেমনটা বললাম। সেলিমকে চোখে চোখে রেখ কিন্তু।
আবার কলিংবেল বেজে উঠল।
ফোন রেখে তড়িঘড়ি করে ছুটল রাবু।
কোথায় থাক এতক্ষণ। কখন থেকে বেল চাপছি। ঘরে ঢুকতে বলল সেলিম।
বাথরুমে ছিলাম। হড়বড় করে বলল রাবু।
আজ ফেরার পথে বাসে খুব ভীড় ছিল। ভেবেছিলাম মানিব্যাগ পিকপকেট হয়ে যাবে। কিন্তু মানিব্যাগ যায়নি। গিয়েছে অন্যকিছু। সেলিম হেসে বলল। আগে সেলিম সিএনজিতেই অফিসে যেত। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। বেতনের টাকায় সংসার চালানোই মুশকিল হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে নতুন উপায় বেছে নিয়েছে ও। অফিস যাওয়ার সময় সিএনজিতেই যায়। ফেরার সময় বাসে চড়ে।
কী গিয়েছে? রাবু সেলিমের ব্যাগ রাখতে রাখতে জানতে চাইল।
শার্টের বোতাম ছিঁড়ে গিয়েছে।
সাথে সাথে রাবুর মনের ভেতর কু গেয়ে উঠল।
এত লোক থাকতে তোমারই বোতাম ছিঁড়েছে! বাসে ছিঁড়ে গেছে না কি অফিসে কোন মেয়ের হাতে ছিঁড়ে গেছে?
কী যে বলো না! হাসতে হাসতে ওয়াশরুমে চলে গেল সেলিম।
একটু পরেই চায়ের টেবিলে প্রসঙ্গটা আবার
তুলল রাবু।
যত যাইই বলো এসব ব্যাপার অফিসেই বেশি ঘটে।
কোনসব ব্যাপার?
এই যে অফিস ফেরতা স্বামীর শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যাওয়া, শার্টে লিপস্টিকের দাগ অথবা জামাতে মেয়েদের চুলের অস্তিত্ব। এসব দেখে মাঝে মাঝে আমার জানতে ইচ্ছে করে অফিসে আসলে তোমরা কী করতে যাও-চাকরি করতে না কি প্রেম করতে?
জবাবে খুকখুক করে কাশল সেলিম।
আমার শার্টে তুমি আবার কবে লিপস্টিকের দাগ দেখলে? চুলই বা কবে আবিষ্কার করলে?
করিনি। করতে কতক্ষণ। অফিসে প্রেম নিয়ে আজকাল যা শুনি- ছিঃ ছিঃ। হঠাৎই রেগে গেল রাবু।
আজকে তো আমার শার্টের বোতামটা বাসেই ছিঁড়ে গেল। এনিয়ে রাগ করার কী আছে।
বাসে ছিঁড়েছে নাকি অফিসে কোনো মেয়ে ছিঁড়েছে-আমি কি দেখতে গিয়েছি! আমি যেন আর কখনো বোতাম ছেঁড়ার গল্প না শুনি।
রেগেমেগে উঠে রান্নাঘরে চলে গেল রাবু।
অসহায়ের মতো মাথা ঝাঁকাল সেলিম।
যদিও বোতাম ছেঁড়ার ব্যাপারটা মাথা থেকে গেল না ওর।
বাসে করে অফিস থেকে ফেরা বন্ধ করে দিল ও। তার বদলে মোটরসাইকেল রাইডে বাসায় ফিরতে শুরু করল।
তারপরও ঘটনা একটা ঘটেই গেল।
অফিস থেকে ফেরার পথে একদিন হঠাৎ করেই পাপ্পুর সাথে দেখা হয়ে গেল সেলিমের। স্কুল জীবনের বন্ধু। অনেকদিন পর দেখা। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল।
অনেক বদলে গেছিস তুই। আরো সুন্দর হয়েছিস। পাপ্পু বলল।
তুইও তো বেশ মোটা আর সুন্দর হয়েছিস। থাকিস কোথায়?
আমি গ্রামের বাড়িতেই আছি। ব্যবসা করি। তুই?
দুজনে রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে গল্প করতে লাগল।
পাপ্পু নিজের জীবনের গল্প বলতে শুরু করল। সেলিমই খেয়ালই করল না কথা বলার ফাঁকে পাপ্পু ওর শার্টের বোতাম মোচড় দিচ্ছে। ছোটবেলায় ওর এরকম বদভ্যাস ছিল-বন্ধুদের পেটে কথায় কথায় চিমটি দিত। ভয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়ে কেউ আলাপ জুড়ত না।
একটুপরই সাড়ে সর্বনাশের সংবাদটা দিল পাপ্পু।
এই যা! কথায় কথায় আমি তোর শার্টের বোতাম ছিঁড়ে ফেলেছি। হাসতে হাসতে বলল ও।
অসুবিধা নেই। আমি তোর ভাবিকে বলব লাগিয়ে দিতে। একদিন বাসায় আয়।
চিন্তিত মনে বোতাম হাতে নিয়ে বাসায় ফিরল সেলিম। ফেরার পথে একটা দোকান থেকে সুঁই আর সুতা কিনে নিল। রাবুকে এ বিষয়ে কিছু বলল না।
সাধারণত একই শার্ট পরপর তিনদিন পরে অফিসে যায় সেলিম। আজ মাত্র প্রথম দিন। কাজেই কাল পরশুও এই শার্টই পড়তে হবে ওকে।
তাই বোতাম ছিঁড়ে গেছে বা বন্ধু ছিঁড়ে ফেলেছে এই গল্প রাবুকে শোনানো যাবে না। সেলিম ঠিক করল রাবু ঘুমিয়ে পড়লে চুপিচুপি শার্টে বোতাম লাগিয়ে ফেলবে।
তাই করল।
রাতের খাওয়া শেষে সেলিম রিডিংরুমে ঢুকল।
অফিসের কয়েকটা কাজ বাকি আছে। আমি সেগুলো সেরে আসছি। তুমি ঘুমিয়ে পড়।
রিডিংরুমের দরজা আটকে কাজে লেগে পড়ল সেলিম। সুঁইয়ে সূতা ঢুকাতে লেগে পড়ল ও। বিপদটা টের পেল তখনই।
সুঁইতে সূতা ঢোকানো অত সহজ নয়।
অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও পারল না। হতাশ হয়ে ইউটিউবে ভিডিও সার্চ করল সেলিম। অবাক হয়ে লক্ষ করল,এ বিষয়ে হাজার হাজার ভিডিও আছে সেখানে। তারমানে সুঁইয়ে সূতা ঢোকানো একটা বৈশ্বিক সমস্যা!
শেষ পর্যন্ত ঘন্টা দুয়েক পরে সূতা ঢোকাতে পারল সেলিম।
বোতাম কই?
তখনই মনে পড়ল বোতাম আছে প্যান্টের পকেটে। আর প্যান্ট আছে বেডরুমে।
পা টিপে টিপে বেডরুমে প্রবেশ করল সেলিম। ঘরে ডিমলাইট জ্বলছে।
চুপিচুপি প্যান্টের পকেটে হাতড়াতে শুরু করল ও।
সর্বনাশ! বোতাম কই!
তন্নতন্ন করে খুঁজল সেলিম।
নেই! বোতাম নেই!
কী খুঁজছ? বিছানা থেকে জানতে চাইল রাবু। বউ দেখি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও জেগে থাকে!
একটা কাগজ। প্যান্টের পকেটে রেখেছিলাম মনে হচ্ছে।
প্যান্টে কোনো কিছু নেই। আমি চেক করে দেখেছি। তুমি অফিসে আসা যাওয়া করার জন্য যে ব্যাগ নিয়ে যাও, সেখানে দেখ।
বিদ্যুৎ চমকের মতো সেলিমের মনে পড়ল।
আরে! বোতাম তো ব্যাগেই রেখেছি।
রিডিং রুমে ফিরে এলো সেলিম। ব্যাগ থেকে বোতাম নিয়ে ঝটপট শার্টে সেলাই করে ফেলল। বেশ কয়েকবার সুঁইয়ের খোঁচা খেল কিন্তু শেষ পর্যন্ত বোতামটা শার্টে লাগাতে সক্ষম হলো সেলিম।
নিশ্চিন্ত মনে বেডরুমে ফিরল ও।
যাক! রাবু কিছু টের পায়নি।
সে রাতে শান্তির ঘুম হলো সেলিমের।
পরদিন সকালে অফিস যাওয়ার সময় শার্টটা গায়ে দিতেই বিপদটা টের পেল ও।
শার্টটা খুলে হাত যে ঢোকাবে সেটাই পারছে না!
রাবু! দেখ তো শার্টটা ঢুকছে না কেন! বলার পর সেলিম বুঝতে পারল কী ভুল করেছে।
রাবু এসে শার্টটা হাতে নিয়ে হাসতে লাগল।
এটা নিশ্চয়ই তোমার কাজ। বোতাম সেলাই করতে গিয়ে শার্টের হাতার মুখও সেলাই করে দিয়েছ। যে কাজ পার না সেই কাজ করতে যাও কেন!
রাবুর কথা শুনে নিজেকে ‘বোতাম বোতাম’ মনে হলো সেলিমের।
সব সহ্য করা যায়, সুঁইয়ের খোঁচার মতো বউয়ের কথা সহ্য করা যায় না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









