নারীর পক্ষ শব্দটা শোনার পর মনের ভেতর একটি দ্বন্ধ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ শব্দটি একটি পক্ষের কথা বলছে। তাই মনে হবে এটি পক্ষপাতদুষ্ট বিষয়। কারণ পক্ষপাতিত্ব অর্থ হলো কোনো ন্যায্য বিচার বা নিরপেক্ষতা বজায় না রেখে জেনে-শুনে বা প্রভাবে পড়ে নির্দিষ্ট একটি পক্ষ, ব্যক্তি বা দলের প্রতি ঝোঁক, সমর্থন বা দুর্বলতা দেখানো। ইংরেজিতে একে ‘বায়াস’ বা ‘পার্শিয়ালিটি’ বলা হয়।
তবে নারী পক্ষের কার্যপরিধি এবং কার্যক্রমের গণ্ডির পরিধি নিরীক্ষণে এই সংজ্ঞার ফ্রেমে আবদ্ধ করা যায় না। কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই শব্দটি নিয়ে গঠিত সংস্থা পক্ষপাতে দুষ্ট না, কেন না তা জানা দরকার। তার কারণ হলো বাংলাদেশে নারীর প্রতি অবজ্ঞা ও সহিংসতার চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক।
আইন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে গেলেও সমাজ ও পরিবারে তারা নানাভাবে বৈষম্য, অবমূল্যায়ন এবং নির্যাতনের শিকার হন। বিভিন্ন সরকারি ও মানবাধিকার সংস্থার জরিপে দেখা যায়, দেশের একটি বড় অংশের নারী ঘর ও বাইরে নানা মাত্রায় অবজ্ঞা ও সহিংসতার মুখোমুখি হন।
সুতরাং এই ভয়াবহ বৈষম্য থেকে নারী রক্ষা করতে নারীদের নিজস্ব একটি প্ল্যাটফর্ম দরকার। আর এই প্ল্যাটফর্মটি হলো নারী পক্ষ। তাই নারী পক্ষকে দেখা হয় সাম্যের সমাজ গড়ার নারী আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম।
নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যে শব্দটি চলে আসে তা হলো জেন্ডার। জেন্ডার হলো সমাজ ও সংস্কৃতি তৈরি করা নিয়ম, যা দিয়ে নারী, পুরুষ বা অন্য মানুষের পরিচয়, কাজ এবং আচরণ ঠিক করা হয়। এটি জন্মগত শারীরিক গঠন নয়, বরং সমাজের ঠিক করে দেওয়া ভূমিকা।
সমাজ ও রাষ্ট্রে জেন্ডার বা লৈঙ্গিক ধারণাটি বোঝার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এটি সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত নারী ও পুরুষের সামাজিক ভূমিকা, অধিকার এবং দায়িত্বগুলো পরিষ্কার করে। জেন্ডার বৈষম্য দূর করে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে, দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিতে এবং মানবাধিকার রক্ষা করতে জেন্ডার সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আর নারী পক্ষ এই কাজটি করছেন।
আবার কোনো কোনো সময় জেন্ডার শব্দটি লিঙ্গ ভূমিকা, যা যৌন ভূমিকা নামেও পরিচিত। এটি হলো একটি সামাজিক ভূমিকা, যা বিভিন্ন আচরণ এবং মনোভাবকে অন্তর্ভুক্ত করে। সাধারণত একজন ব্যক্তির লিঙ্গের ওপর ভিত্তি করে গ্রহণযোগ্য, উপযুক্ত বা কাঙ্ক্ষিত বলে বিবেচিত হয়।
লিঙ্গ ভূমিকা সারসত্তাবাদের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, এই ধারণা যে মানুষের লিঙ্গের ওপর ভিত্তি করে তাদের পরিচয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা ‘যৌন ভূমিকা’র পরিবর্তে ‘লিঙ্গ ভূমিকা’ শব্দটি ব্যবহার করতে পছন্দ করেন, কারণ লিঙ্গের সমাজ-সাংস্কৃতিক ধারণা যৌনতার জৈবিক ধারণা থেকে আলাদা। এতদ্বিষয়ে একাধিক তত্ত্ব রয়েছে, যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে লিঙ্গ ভূমিকা দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দিককে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য নারীর ইস্যুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কারিগর নারী। শুধু পোশাকশিল্পেই নয়, কৃষি ও অকৃষি খাতে ক্রমবর্ধমান হারে নারীর কর্মে নিযুক্তি বাংলাদেশে এ উন্নয়ন এনে দিয়েছে। কিন্তু এ দেশে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে—এ কথা যারা বলেন, ভুল বলেন। তারা জানেন না ক্ষমতায়ন বলতে কী বোঝায়। তবে নারীর ক্ষমতায়নই নারী অধিকারের মূল কথা।
নারীর ক্ষমতায়ন হয়নি তার দুটি উপাদান লক্ষ করলে বোঝা যায়। এক. নারী-পুরুষের মধ্যে মজুরি-বৈষম্য। দুই. পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র ও রাষ্ট্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। বস্তুত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই ক্ষমতায়নের মাপকাঠি। এই দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে।
অপরদিকে আমরা যদি বিশ্ব প্রেক্ষাপটের দিকে নজর দিই, তাহলে দেখতে পাব, রাশিয়া বা সোভিয়েত রাশিয়ায় নারীরা ১৯১৭ সালে ভোট দেওয়ার অধিকার লাভ করে। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে রাশিয়ার অস্থায়ী সরকার নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করে, যা পরবর্তীতে ওই বছরের শেষের দিকে বলশেভিক বিপ্লব এবং ১৯১৮ সালের সোভিয়েত সংবিধানেও পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়।
রাশিয়ার সংবিধানে অক্টোবর বিপ্লবের পর সোভিয়েত সরকার রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করে। অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯২০ সালে নারীদের ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া, ১৯৬৪ সালে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করা, ১৯৭৮ সালে গর্ভবতী মহিলাদের প্রতি বৈষম্য নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদি আইনের মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়নের পথে অগ্রসর হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
তবে নারী অধিকার এবং সাম্যবাদের মূল মিল হলো শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। সাম্যবাদ সব ধরনের শ্রেণিগত শোষণ দূর করতে চায়। নারী অধিকার সমাজে নারীর ওপর চলা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও নির্যাতন দূর করতে সাম্যবাদ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
সাম্যবাদ মানুষকে মানুষ হিসেবে সমান মূল্য দিতে বলে, এখানে লিঙ্গ, ধর্ম বা বর্ণের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো আলোচনা নেই, কারণ সবাই সমান। পুঁজিবাদী বা শ্রেণিভিত্তিক সমাজে নারী ও শ্রমিক উভয়েই শোষণের শিকার হয়। অপরদিকে সাম্যবাদ ও নারী অধিকার উভয়ই এই শোষণ থেকে মুক্তি চায়।
সাম্যবাদের মতো নারী আন্দোলনেও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। কাজ ও মজুরিতে সমতা আনার কথা বলা হয়। সাম্যবাদী তত্ত্বে নারীদের ঘরের কাজে আটকে রাখাকে এক ধরনের বন্দিত্ব বলা হয়েছে। নারী অধিকারও ঘরের কাজের ন্যায্য মূল্যায়ন ও সামাজিকীকরণের দাবি জানায়। সাম্যবাদে শিক্ষা, চাকরি ও রাষ্ট্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করে।
নারীকে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নারীপক্ষ কাজ করে আসছে। নারী পক্ষ একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
সংগঠনটি নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদা অর্জনের জন্য নিয়েছে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট ও ভিন্নমুখী কর্মসূচি, যেমন: নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিবীক্ষণ, স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, নারী নির্যাতন বিষয়ক গবেষণা, নির্বাচন পূর্বে প্রার্থীদের সঙ্গে নারীর জন্য করণীয় বিষয়ে সংলাপ ইত্যাদি।
তারা জনজীবনে নারীর নেতৃত্বের বিকাশে কাজ করছে। কারণ নারী জাতীয় পর্যায়ে আইন প্রণয়নসহ নানা বিধ কর্মকাণ্ডে নারী অংশগ্রহণ কমছে। তাই নারীপক্ষ নারীর নেতৃত্ব বিকাশে নিয়েছে বেশ কিছু গণতান্ত্রিক কর্মসূচি। এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ১৯৭৩-১৯৭৫ মেয়াদের প্রথম জাতীয় সংসদে ১৫টি সংরক্ষিত আসনের প্রতিনিধিরাই ছিলেন সংসদের নারী প্রতিনিধিত্ব।
১৯৭৯-১৯৮২ মেয়াদে দ্বিতীয় সংসদে ২ জন নির্বাচিত ও ৩০টি নারী আসন মিলিয়ে মোট ৩২ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৮৮-৯০ মেয়াদে চতুর্থ সংসদে সংরক্ষিত আসন ছিল না। ৪ জন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন।
১৯৯১-১৯৯৫ মেয়াদে পঞ্চম সংসদে ৫ জন নির্বাচিতসহ ৩৫ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপির একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন। ৩০টি সংরক্ষিত আসন ছিল। ওই নির্বাচনটি বাতিল হয়ে ওই বছরের জুন মাসে সপ্তম সংসদ নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে সরাসরি নির্বাচিত হন ৮ নারী; মোট নারী প্রতিনিধি ছিলেন ৩৮ জন।
অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে ৭টি আসনে সরাসরি ও ৪৫টি সংরক্ষিত আসনসহ মোট ৫২ জন নারী সংসদ সদস্য হন। নবম জাতীয় সংসদে ২১ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন। এরপর সংরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়। এই সংসদে মোট নারী সংসদ সদস্য হন ৭০ জন।
আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল একতরফা, বিতর্কিত। এ তিনটি নির্বাচনে যথাক্রমে ১৮, ২৩ ও ১৯ জন নারী নির্বাচিত হয়েছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭ জন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাদের মধ্যে ৬ জন বিএনপির, একজন স্বতন্ত্র। আর ৫০ জন হন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য।
উপরোল্লিখিত তথ্যালোকে দেখা যায়, নারী নেতৃত্ব বিকশিত হচ্ছে না। নারী পক্ষ তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব বিকাশের কিছু কার্যক্রম নিয়েছে। তাদের কার্যক্রম দলনিরপেক্ষ। তাদের এই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হলো গণতান্ত্রিক কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো।
নারী পক্ষ বিশ্বাস করে, তৃণমূলে নারী নেতৃত্ব বিস্তার ঘটাতে পারলে তার প্রতিফলন জাতীয় পর্যায়ে ঘটবে। তাই রাজনৈতিক এবং অধিকার বিষয়ে নারীকে সচেতন করার লক্ষ্যে তাদের রয়েছে কিছু কর্মসূচি।
সর্বোপরি কথা হলো, দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই নারী। এই নারীরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন না হলে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ আশা করা যায় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হলে, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোটা জরুরি।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









