জার্মান শিল্পী ও লেখক ফিলিপ রুখের নতুন বইয়ের মূল যুক্তি হলো—হিটলারের নাৎসি দলের উত্থানকে পরবর্তী ‘থার্ড রাইখ’-এর ভয়াবহ পরিণতির আলোয় দেখার ফলে আমরা হয়তো তার রাজনৈতিক উত্থানের প্রকৃত ইতিহাসটাই আড়াল করে ফেলেছি। বিশেষ করে ১৯৩০ সালের নির্বাচন, তার মতে, ১৯৩২ বা ১৯৩৩ সালের ঘটনাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আপনার শিল্পগোষ্ঠী ‘সেন্টার ফর পলিটিক্যাল বিউটি’ একসময় এক এএফডি রাজনীতিকের বাড়ির পাশের জমিতে হলোকাস্ট স্মৃতিসৌধের একটি প্রতিরূপ নির্মাণ করেছিল। এবার আপনি নাৎসিদের ক্ষমতায় উত্থান নিয়ে একটি ইতিহাসের বই লিখেছেন। ১৯৩২ সালের নির্বাচন, রাইখস্টাগে আগুন এবং ১৯৩৩ সালের ‘এনাবলিং অ্যাক্ট’—এসব নিয়ে তো আমরা অনেক কিছুই জানি। নতুন করে বলার কী আছে?
ফিলিপ রুখ: প্রায় তিন বছর আগে আমার মনে প্রশ্নটি জাগে—জার্মানি তখনো গণতন্ত্র থাকা অবস্থায় হিটলারের ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি বা এনএসডিএপি কীভাবে এত দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠল? আমি ভেবেছিলাম, এই ইতিহাস হয়তো আজকের ডানপন্থী উগ্র রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো বোঝার ক্ষেত্রেও কিছু শিক্ষা দিতে পারে। ঐতিহাসিক নথিপত্র দেখতে গিয়ে বুঝলাম, ১৯৩০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরের রাইখস্টাগ নির্বাচন আসলে ১৯৩২ বা ১৯৩৩ সালের ঘটনাগুলোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে মনে হয়েছিল, বিষয়টির উত্তর খুব সহজেই পাওয়া যাবে। কিন্তু যত গভীরে গেলাম, ততই দেখলাম—নাৎসিদের উত্থান ব্যাখ্যা করার জন্য আমরা যে প্রচলিত গল্পগুলো শুনে এসেছি, সেগুলোর অনেকটাই তথ্যের সঙ্গে মেলে না। সংখ্যাগুলো বরং আরও অন্ধকার একটি গল্প বলে।
১৯২৮ সালে এনএসডিএপি পেয়েছিল প্রায় আট লাখ ভোট এবং রাইখস্টাগে ১২টি আসন। ১৯৩০ সালের নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগেও হিটলারের প্রচারপ্রধান জোসেফ গোয়েবেলস মনে করেছিলেন, সর্বোচ্চ ৫০ বা ৬০টি আসন পাওয়া যেতে পারে। অথচ নির্বাচনের ফল বেরোল—নাৎসিরা পেয়েছে ৬৪ লাখ ভোট এবং ১০৭টি আসন। মাত্র দুই বছরে ভোট বেড়েছে প্রায় নয় গুণ। এক রাতেই প্রান্তিক একটি দল ডানপন্থী তিন প্রতিষ্ঠিত দল—সেন্টার পার্টি, ডিভিপি ও ডিএনভিপি—কে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হলো। সামনে শুধু সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা। এটি শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য ছিল না; এটি ছিল সামাজিক মানসিকতার এক নাটকীয় পরিবর্তন। বর্ণবাদী, সহিংস এবং চরমপন্থী একটি দল হঠাৎ করে রাজনৈতিক বৈধতা পেয়ে গেল।
আপনি এনএসডিএপিকে ‘ক্র্যাঙ্কদের দল’ বলেছেন। কিন্তু হিটলারের কি এক ধরনের অন্ধকার আকর্ষণ ছিল না?
ফিলিপ রুখ: জার্মান ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল—হিটলারের ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন এক অদৃশ্য আকর্ষণ ছিল, যা মানুষকে সম্মোহিত করত। আরেকটি ধারণা হলো *ফ্যুরারকাল্ট*—অর্থাৎ নেতাকে ঘিরে এক ধরনের ব্যক্তিপূজা। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জার্মানদের কর্তৃত্ববাদী নেতার প্রতি আকাঙ্ক্ষাই হিটলারকে এত শক্তিশালী করে তুলেছিল।
কিন্তু ১৯৩০ সালের নির্বাচনের আগে এর পক্ষে খুব বেশি প্রমাণ পাওয়া যায় না। সে সময় প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই তাদের নেতাকে ঘিরে ব্যক্তিপূজা তৈরি করছিল। এমনকি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরাও। কাজেই হিটলার এ ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু করছিলেন—এমন নয়। বরং এনএসডিএপির ভেতরেই অনেকে হিটলারকে ঘিরে এই ‘তারকা-সংস্কৃতি’ নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। দলের প্রচারণাও তখন পুরোপুরি হিটটলারকেন্দ্রিক ছিল না। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। ১৯৩০ সালে হিটলার নিজেই জার্মানির নাগরিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিদেশি, অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এবং বহিষ্কারের ঝুঁকিতে ছিলেন। অর্থাৎ পরবর্তী ইতিহাসের আলোয় যে হিটলারকে আমরা দেখি, ১৯৩০ সালে তিনি সেই সর্বময় নেতা ছিলেন না।
আমি নিজেও ছোটবেলা থেকে হিটলারকে একটি দানব হিসেবে দেখেছি—তবে এমন এক দানব, যার রাজনৈতিক প্রতিভা ছিল। ১৯৩০ সালের পরের ইতিহাসে এই ধারণার কিছু ভিত্তি আছে। কিন্তু ১৯২৮ থেকে ১৯৩০ সালের সময়টাকে আলাদা করে দেখলে ছবিটা অন্যরকম।
হিটলারের জীবনীকার ইয়ান কারশও মনে করেন, ওই সময় এনএসডিএপির সাফল্যের সঙ্গে হিটলারের ভূমিকার সম্পর্ক খুব সীমিত ছিল। তিনি তখন কার্যত ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিলেন। ১৯২৯ সালে মাত্র ২৯টি বক্তৃতা দিয়েছিলেন—যা স্বাভাবিক সংখ্যার অর্ধেক। তার মধ্যে ২১টিই হয়েছিল বাভারিয়ায়। গোয়েবেলস তখন হিটলারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে বিরক্ত। তিনি মিউনিখে গিয়ে দলীয় নেতাকে খুঁজতে গিয়ে দেখলেন, দলের সদর দপ্তরের চেয়ে হিটলার যেন বেশি আগ্রহী ক্যাফে কিংবা সিনেমা নিয়ে। তার ভাষায়, ‘রাইখ নেতৃত্ব’ তখন ক্যাফে হেক কিংবা সিনেমা হলে।
তাই ১৯৩০ সালের হিটলারকে আজকের পরিচিত ‘রাজনৈতিক প্রতিভা’ হিসেবে দেখলে ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায় হয়। তিনি তখন ছিলেন অলস এক অপরাধী—যিনি দুপুর পর্যন্ত ঘুমাতেন।
তাহলে কি নাৎসিদের উত্থানের আসল কারিগর ছিলেন প্রচারপ্রধান গোয়েবেলস? কেউ কেউ এখন বলছেন, রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে প্রায়ই গণমাধ্যমের সংকটও আসে। নাৎসিরা কি নতুন ধরনের গণমাধ্যম—ছবির সংবাদপত্র, রেডিও, চলচ্চিত্র—দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেনি?
ফিলিপ রুখ: নাৎসিদের কথা বললেই আমাদের চোখের সামনে কিছু দৃশ্য ভেসে ওঠে—নুরেমবার্গের বিশাল সমাবেশ, আলোয় তৈরি স্থাপত্য, হাজার মানুষের একসঙ্গে মিছিল। মনে হয় যেন তারা শুরু থেকেই এক নিখুঁত প্রচারযন্ত্রের মালিক ছিল।
কিন্তু ১৯৩০ সালের আগের বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি বিশৃঙ্খল। গোয়েবেলস প্রচারের জন্য ‘ডের অ্যাঙ্গ্রিফ’, ‘ফল্কিশার বেওবাখটার’ ও ‘ইলুস্ট্রিয়ার্টার বেওবাখটার’-এর মতো সংবাদপত্র তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সেগুলোর মান ছিল অনেক সময় অপেশাদারসুলভ, এমনকি হাস্যকর। উদাহরণ হিসেবে ‘ইলুস্ট্রিয়ার্টার বেওবাখটার’-এর ছবি দেখলে বোঝা যায়, প্রচারণার এই যন্ত্র তখনো কতটা অপরিণত ছিল। বিক্রিও ছিল নগণ্য। অন্য দলগুলোর হাতে বরং অনেক বেশি কার্যকর প্রচারের উপায় ছিল—রাস্তার মোড়ে নিয়ন সাইন, এমনকি আকাশপথে বিজ্ঞাপন। তাই শুধু প্রচার দিয়ে এনএসডিএপির সাফল্য ব্যাখ্যা করা যায় না।
অর্থনীতির ভূমিকা কী? ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারবাজার ধস নেমেছিল এক বছর আগে, জার্মানির রপ্তানি কমছিল, বেকারত্ব বাড়ছিল। ফ্যাসিবাদের উত্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতির দিকে তাকানো খুব স্বাভাবিক। আজও আমরা প্রায় একই ধরনের কথা শুনি—অর্থনীতি খারাপ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, তাই মানুষ উগ্র ডানপন্থার দিকে ঝুঁকবে। কিন্তু ইতিহাসে একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, মানুষ এত সরল নয়।
উদাহরণ হিসেবে বেকারত্বের কথা ধরা যাক। গত কয়েক দশকের গবেষণা থেকে আমরা মোটামুটি জানি, কোথায় এনএসডিএপি বেশি ভোট পেয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যেসব অঞ্চলে বেকারত্ব বেশি ছিল, সেখানে নাৎসিদের ফল তুলনামূলকভাবে খারাপ হয়েছিল। অর্থাৎ বেকারত্ব হয়তো মানুষকে ফ্যাসিবাদের দিকে ঠেলে দেয়নি; বরং কিছু ক্ষেত্রে তা ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধকে শক্তিশালী করেছিল।
তরুণ ভোটারদের ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রথমবার ভোট দেওয়া মানুষের সংখ্যা যেখানে বেশি, সেসব এলাকাতেও এনএসডিএপির ফল বিশেষ ভালো ছিল না। তরুণরা বরং দলটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ১৯৩২ সালে নাৎসিদের ভোট দ্বিগুণ হয়ে ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছানোর ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু ১৯৩০ সালে মাত্র দুই বছরে নয় গুণ ভোট বৃদ্ধির ব্যাখ্যা হিসেবে এটি যথেষ্ট নয়। ওয়াল স্ট্রিটের ধসের প্রকৃত অভিঘাত জার্মানিতে তীব্র হয়ে ওঠে ১৯৩১ সালের জুলাইয়ে, যখন কয়েকটি বড় ব্যাংক ধসে পড়ে। অর্থাৎ ১৯৩০ সালের নির্বাচনের ১০ মাস পরে।
পরের দুই বছরে ওয়াইমার জার্মানির জিডিপি ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়। কিন্তু ১৯৩০ সালের শেষে সংকোচন ছিল প্রায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ। পরবর্তী ধসকে আগের নির্বাচনের কারণ হিসেবে ব্যবহার করলে আমরা কারণ ও ফলাফলকে গুলিয়ে ফেলতে পারি।
তাহলে গণতান্ত্রিক দলগুলোর দিকে তাকালে কী দেখা যায়?
ফিলিপ রুখ: এনএসডিএপির প্রচারের একটি বড় অস্ত্র ছিল প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর কথিত দুর্নীতি। কিন্তু তার পক্ষে তেমন শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না।
বরং সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ওয়াইমার প্রজাতন্ত্রের তিন বড় ডানপন্থী দলই ১৯২৮ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে নিজেদের নেতৃত্বে আরও কট্টরপন্থী নেতাদের এনেছিল। অর্থাৎ ভোটাররা যদি সত্যিই আরও কঠোর ডানপন্থী রাজনীতি চাইতেন, তাহলে তাদের সামনে বিকল্পের অভাব ছিল না। ছিল ক্যাথলিক সেন্টার পার্টি, জাতীয়তাবাদী-উদারপন্থী ডিভিপি এবং রাজতন্ত্রপন্থী ডিএনভিপি। প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের মতো রাজনৈতিক অবস্থানও তাদের ছিল।
অনেক রক্ষণশীল দল এখন যে সমস্যার মুখে পড়ছে, সেটাই কি তখনও ঘটেছিল? অর্থাৎ মূলধারার দল যখন উগ্র ডানপন্থার অবস্থান নকল করে, ভোটাররা কি আসল উগ্র দলটিকেই বেছে নেয়?
ফিলিপ রুখ: আমি মনে করি, কথাটা এত সরল নয়। ১৯৩০ সালে হিটলার কোনো ‘মূল’ উগ্র ডানপন্থী ছিলেন না। বরং ডিভিপি বা ডিএনভিপির তুলনায় তাঁর দল অনেক ক্ষেত্রে তাদেরই ফিকে সংস্করণ ছিল। ডিএনভিপি তো হিটলারের চেয়েও বেশি ইহুদিবিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়েছিল। অথচ নির্বাচনে তারাই সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে—তাদের ভোট কমে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। ১৯৩০ সালে জাতীয়তাবাদী-উদারপন্থী ডিভিপি নিজের সংবাদপত্রগুলোর কাছেই সমালোচিত হচ্ছিল। অভিযোগ ছিল, দলটি তার প্রয়াত নেতা গুস্তাভ স্ট্রেসেমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে সরে গেছে। আজকের জার্মানির খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রীদের সঙ্গে এর একটি তুলনা করা যায়। আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সময় দলটি ছিল মধ্যপন্থী এবং দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বস্ত ভোটার ধরে রেখেছিল। পরে ডানপন্থী ঘরানার নেতা ফ্রিডরিশ মের্ৎস নেতৃত্বে আসেন। এরপর কিছু ভোটার এএফডির দিকে সরে যায়। এই ইতিহাস থেকে যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো—রাজনীতিতে শুধু কঠোর অবস্থান নয়, বিশ্বাসযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি যখন বিশ্বাসযোগ্যতাকে এত গুরুত্বপূর্ণ বলছেন, তখন আধুনিক উগ্র ডানপন্থী দলগুলো ‘ব্যবস্থার বিরুদ্ধে’ কথা বলেও দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না কেন? ১৯৩০ সালের এনএসডিএপিও কেলেঙ্কারিতে ভরা ছিল—দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই, দুর্নীতি—সবই ছিল। সে সময় অনেক জার্মান সাংবাদিক মনে করতেন, আর একটি কেলেঙ্কারিই দলটিকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট হবে।
সাংবাদিকেরা তদন্তও করেছিলেন। কেউ কেউ অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে করেছিলেন। কিন্তু তাতেও এনএসডিএপি ভেঙে পড়েনি। আজ ইউরোপের বিভিন্ন উগ্র ডানপন্থী দলের ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরনের ঘটনা দেখি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা তাদের গোপন পরিকল্পনা প্রকাশ করছেন, প্রতিবাদ হচ্ছে, জনমত উত্তপ্ত হচ্ছে। কিন্তু এসব কেলেঙ্কারি সবসময় রাজনৈতিক সমর্থনকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে না। উগ্রপন্থী দলগুলোকে অনেকটা বজ্রনিরোধকের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কেলেঙ্কারি যেন বিদ্যুতের ঝলক—এক মুহূর্তের জন্য প্রচণ্ড আলো তৈরি করে, তারপর শক্তিটা মাটিতে নেমে যায়।
অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টির ‘ইবিজা কেলেঙ্কারি’ তার একটি উদাহরণ। কেলেঙ্কারিটি দলটিকে সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। কিন্তু কয়েক বছর পর দলটি আবার শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে।
তাহলে ১৯৩০ সালে নাৎসিরা এত ভালো করল কেন?
ফিলিপ রুখ: শুনতে যতটা অদ্ভুত, উত্তরটি হয়তো সেই একই জায়গায় আছে, যে কারণে ১৯২৮ সালে মানুষ নাৎসিদের থেকে মুখ ফিরিয়েছিল—সহিংসতার প্রতি তাদের আকর্ষণ।
হিটলার এনএসডিএপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের হত্যা করার কথা বলতেন। দলটি এই অবস্থান থেকে কখনো সরে যায়নি। ১৯৩০ সালের নির্বাচনের আগে তারা সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ কথা বলেনি, অটোবান নির্মাণের স্বপ্নও দেখায়নি। তাদের রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সহিংসতা, হত্যার পরিকল্পনা এবং প্রতিশোধের ভাষা। অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু এই নয়—মানুষ কেন একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেয়? আরও গভীর প্রশ্ন হলো—একটি সমাজের মানুষ কখন সহিংসতাকে রাজনৈতিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে?
আজকের ফ্যাসিবাদী বা উগ্র ডানপন্থী আন্দোলনের উত্থান বোঝার ক্ষেত্রে এই ইতিহাস আমাদের কী শেখায়?
ফিলিপ রুখ: আধুনিক দৃষ্টিতে একটি বিষয় মেনে নেওয়া কঠিন। আমরা ভাবতে অভ্যস্ত যে ফ্যাসিবাদের সহিংসতা মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই দূরে সরিয়ে দেবে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, সবসময় তা হয়নি। নাৎসিদের সহিংসতার আকাঙ্ক্ষা অনেক জার্মান ভোটারের কাছে তাদের আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
আজ জার্মানির এএফডির রাজনৈতিক সমাবেশগুলোতেও কখনো কখনো প্রতিশোধ ও সহিংসতার কল্পনা রাজনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে উঠছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। আজ গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে। একটি রাজনৈতিক দল কী বলছে, আর ক্ষমতায় গেলে কী করতে চায়—এই দুটিকে আলাদা করে দেখা যায় না। ভাষা কখনো কখনো ভবিষ্যৎ কর্মসূচির প্রস্তুতিও হতে পারে। এনএসডিএপির ক্ষেত্রে আমরা জানি, রাজনৈতিক ভাষা এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত একই ভয়াবহ বাস্তবতায় মিলেছিল।
তাই ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর শিক্ষা হয়তো এটাই যে, কোনো গণতন্ত্র একদিনে ধ্বংস হয় না। কিন্তু কখনো কখনো একটি নির্বাচন দেখিয়ে দিতে পারে যে সমাজের ভেতরে পরিবর্তনটি কতদূর এগিয়ে গেছে। ১৯৩০ সালের জার্মানি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ফ্যাসিবাদের উত্থান শুধু একজন নেতার গল্প নয়, শুধু অর্থনৈতিক সংকটের গল্প নয়, শুধু প্রচারণার গল্পও নয়। এটি একটি সমাজের বিশ্বাস, ভয়, ক্ষোভ এবং সহিংসতার প্রতি সহনশীলতার পরিবর্তনের গল্প।
আর সেই কারণেই অতীতকে শুধু মৃত ইতিহাস হিসেবে পড়লে ভুল হবে। ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলো অনেক সময় তখনই আসে, যখন একটি গণতন্ত্র দেখতে গণতন্ত্রের মতোই থাকে—কিন্তু তার ভেতরে মানুষ গণতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর বিশ্বাস হারাতে শুরু করে।

পরিচিতি
ফিলিপ রুখ জার্মান দার্শনিক, লেখক ও রাজনৈতিক শিল্পী। ১৯৮১ সালে ড্রেসডেনে জন্ম নেওয়া রুখ ২০০৯ সালে সেন্টার ফর পলিটিক্যাল বিউটি প্রতিষ্ঠা করেন। শিল্পকে তিনি কেবল সৌন্দর্য বা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না; ইতিহাস, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রশ্নকে জনপরিসরে তীব্রভাবে হাজির করার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন।
রুখ রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং প্রাচীন সমাজে সহিংসতার ইতিহাস নিয়ে পিএইচডি করেছেন। তার কাজের কেন্দ্রে রয়েছে গণহত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা, স্মৃতি এবং গণতন্ত্রের নৈতিক দায়। তার নেতৃত্বে সেন্টার ফর পলিটিক্যাল বিউটি হলোকাস্টের স্মৃতি, শরণার্থী সংকট ও জার্মানির উগ্র ডানপন্থার মতো বিষয় নিয়ে নানা বিতর্কিত ও প্রতীকী শিল্পকর্ম ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করেছেন।
সূত্র: ফিলিপ ওল্টারম্যান দ্য গার্ডিয়ান-এর ইউরোপীয় সংস্কৃতি বিভাগের সম্পাদক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









