ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদ এবং ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়েছে।
রবিবার নয়াদিল্লি ও মুম্বাইয়ে হাজার হাজার তরুণ ও বিরোধী দলের সমর্থক বিক্ষোভে অংশ নেন। টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভকারীদের আটক করেছে পুলিশ।
মুম্বাইয়ে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন বিরোধী নেতা রাজ ঠাকরে ও উদ্ধব ঠাকরে। তারা ভোটার তালিকার সংশোধন বাতিল এবং নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানান।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে বহু যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়ছে এবং এর রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি—দুই পক্ষই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

দিল্লিতে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ
রাজধানী নয়াদিল্লিতে রবিবার সন্ধ্যার দিকে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হতে শুরু করেন।
রয়টার্সের একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে।
কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে আটক ব্যক্তিদের বহনকারী গাড়ি ঘিরে ফেলেন। কেউ কেউ গাড়ির ওপর উঠে পড়েন, আবার কয়েকজন রাস্তায় শুয়ে পড়ে গাড়ির চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মী আহনা সিং অভিযোগ করেন, পুলিশ তাকে চুল ধরে টেনে নিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “পুলিশ আমার চুল ধরে টেনে নিয়ে গেছে। পুলিশ নির্যাতনের পথ বেছে নিচ্ছে।”
দিল্লি পুলিশ অবশ্য এ বিষয়ে রয়টার্সের ই-মেইলে পাঠানো প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।
গত দুই দিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের জমায়েত ঠেকানোর চেষ্টা করছে পুলিশ। এ সময় কয়েক ডজন মানুষকে আটক করে বাসে করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।
শুক্রবার ও শনিবার আটক ব্যক্তিদের কয়েকজনকে পরে ছেড়ে দেওয়া হলেও, জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করার সরকারি নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

‘ভোটার তালিকা থেকে লাখো মানুষ বাদ’
বিক্ষোভকারীদের দাবি, গত বছর শুরু হওয়া দেশব্যাপী ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমের মাধ্যমে লাখ লাখ যোগ্য ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এর ফলে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বহু মানুষ এবং এতে মোদির বিজেপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।
বিরোধী নেতা রাজ ঠাকরে বলেন, ক্ষমতাসীন দলকে জনগণের ভোটের ক্ষমতাকে সম্মান করতে হবে।
তিনি বলেন, “ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে আমরা ক্ষুব্ধ। কে ক্ষমতায় থাকবে আর কে বিরোধী দলে থাকবে, সেটি দেশের মানুষ ঠিক করবে—নির্বাচন কমিশন নয়।”
তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য হলো একই ব্যক্তির একাধিক নাম, মৃত ব্যক্তিদের নাম এবং যোগ্য নন এমন ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া। এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
শুক্রবার নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে, ভুলবশত যেসব যোগ্য ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমার এখনো তার পদত্যাগের দাবি বা চলমান বিক্ষোভ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে আগামী কয়েক দিনে আরও বিক্ষোভ কর্মসূচি থাকায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারতের বিরোধী দলগুলোর একটি জোট মঙ্গলবার ‘গণতন্ত্র রক্ষার’ দাবিতে নির্বাচন কমিশনের দপ্তর পর্যন্ত মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া ‘জেন জি ককরোচ জনতা পার্টি’ ১০ অক্টোবর দিল্লিতে বড় সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে।
মোদির প্রায় ১২ বছরের শাসনামলে তরুণদের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভগুলোকে তার সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে জুলাইয়ে জাতীয় মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে পদ ছাড়তে হয়েছিল। এটি মোদির তৃতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নতুন বিক্ষোভ সেই রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









