ব্রিটেনের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়্যাল এয়ার ফোর্স (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেখান থেকেই উড়েছে বি-১সহ যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার বোমারু বিমান।
এখন সেই বিমানগুলো আর ফেয়ারফোর্ডে নেই।
রবিবার (৪ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ঘাঁটিতে মোতায়েন সব মার্কিন বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বি-১, বি-২ ও বি-৫২ রয়েছে। ঠিক কী কারণে এই সিদ্ধান্ত, তা পেন্টাগন বিস্তারিত জানায়নি। তবে সিদ্ধান্তটি এসেছে ফেয়ারফোর্ডকে ঘিরে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী হামলার তদন্তের এক সপ্তাহের মধ্যে।
২৭ সেপ্টেম্বর ফেয়ারফোর্ডের কাছে কয়েকটি সন্দেহজনক যানবাহন ও লোকজনের গতিবিধি নজরে আসে। পরে পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের তিনটি ভ্যানে পেট্রল পাওয়া গেলেও কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। পরে সবাইকে জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১ অক্টোবর লন্ডনে এক ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিককেও একই তদন্তের আওতায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাকেও জামিন দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়েও তদন্ত চলছে। ইংল্যান্ডের সরকারের প্রধান অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, ইরান জড়িত থাকার ‘জোরালো ইঙ্গিত’ রয়েছে। তবে তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ব্রিটিশ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ বলেছে, তারা বিদেশি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতাসহ সব সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখছে। ফলে ইরানের সংশ্লিষ্টতা এখনো তদন্তাধীন অভিযোগ, প্রমাণিত ঘটনা নয়।
ফেয়ারফোর্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় এর সামরিক ভূমিকা থেকে। ইউরোপে মার্কিন বোমারু বিমানের অন্যতম প্রধান অগ্রবর্তী ঘাঁটি এটি। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে এখান থেকে মার্কিন বি-১ বোমারু বিমান অভিযান চালিয়েছে। ফলে ঘাঁটিটি শুধু ব্রিটেনের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী সামরিক কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সেই জায়গা থেকেই এখন বিমান সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি তাৎপর্যপূর্ণ।
ওয়াশিংটনের ব্যাখ্যা অবশ্য সরল। পেন্টাগন বলেছে, বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রস্তুতি ও অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন অনুযায়ী মার্কিন বোমারু বিমান নিয়মিত বিভিন্ন ঘাঁটিতে মোতায়েন ও প্রত্যাহার করা হয়। বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেলেও সেগুলো দূরপাল্লার হামলার জন্য প্রস্তুত থাকবে। অর্থাৎ ফেয়ারফোর্ড থেকে বিমান সরানো মানেই যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে ফেলছে—এমনটা বলা যাচ্ছে না।
তবু সময়টি প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ কয়েকটি বিমান ফেয়ারফোর্ডে অল্প কিছুদিন আগেই এসেছিল। এখন সেগুলো দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ব্রিটিশ ঘাঁটিটি যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে সেখানে এত বড় সামরিক সম্পদ রাখার ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্র নিতে চাইছে না—এমনটাই স্বাভাবিক ব্যাখ্যা। কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও উঠছে— ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ কী?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো ইরানের বিরুদ্ধে আরও সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। বরং শনিবার তিনি বলেছেন, ইরান নিয়ে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—‘সহজ পথ’ নাকি ‘কঠিন পথ’। অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ হওয়ার বদলে নতুন হামলার সম্ভাবনাও তার বক্তব্যে রয়ে গেছে।

এ কারণেই ফেয়ারফোর্ড থেকে বোমারু বিমান প্রত্যাহারকে শুধু নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন না অনেকে। এটি যদি সাময়িক হয়, তাহলে বিমানগুলো আবার ইউরোপে ফিরতে পারে। আর যদি ইরান যুদ্ধের কৌশল বদলের অংশ হয়, তাহলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্ক অবশ্য এখনো ঘনিষ্ঠ। ফেয়ারফোর্ডও যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় সামরিক অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই থাকছে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: ব্রিটিশ মাটিতে ইরান যুদ্ধের মার্কিন উপস্থিতি এখন আর শুধু সামরিক প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্ত্রাসের আশঙ্কা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং দুই দেশের নিরাপত্তার হিসাব।
বোমারু বিমানগুলো ফিরে গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু ফেয়ারফোর্ডকে ঘিরে প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে—কে বা কারা হামলার পরিকল্পনা করেছিল, ইরানের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, আর সবচেয়ে বড় কথা, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এখন কোন দিকে যাচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









