ভারতের রাজপথে প্রতিবাদের দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। তরুণেরা স্লোগান দিচ্ছে, কিন্তু শুধু রাগের ভাষায় নয়। তারা গান গাইছে, নাচছে, ছড়া কাটছে, ব্যঙ্গ করছে, মিম বানাচ্ছে। কেউ পুলিশের সঙ্গে রসিকতা করছে, কেউ সুপারহিরোর পোশাক পরে হাজির হচ্ছে প্রতিবাদস্থলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিয়েও তৈরি হচ্ছে ‘গ্রিম’ বা ‘গ্রেট রেডি উইথ মি’ ধরনের ভিডিও।
বাইরে থেকে দেখলে এসবকে হয়তো গুরুতর রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে মেলানো কঠিন। প্রশ্ন উঠছে—প্রতিবাদ কি এতটাই ‘হালকা’ হয়ে গেল? জেন জি কি সত্যিই রাজনীতি নিয়ে ‘আনসিরিয়াস’?
কিন্তু একটু গভীরে তাকালে অন্য একটি ছবি দেখা যায়। এই তরুণেরা অন্যায়ের গুরুত্ব অস্বীকার করছে না। বরং তারা প্রতিবাদের পুরোনো ব্যাকরণ বদলে দিচ্ছে। তাদের কাছে প্রতিবাদ মানে শুধু ক্রোধ, কান্না বা দীর্ঘ বক্তৃতা নয়। প্রতিবাদ হতে পারে হাসিরও, গানেরও, ব্যঙ্গেরও। আনন্দও হতে পারে রাজনৈতিক শক্তি।
ভারতে সাম্প্রতিক কয়েকটি আন্দোলনে এর স্পষ্ট প্রকাশ দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা জবাবদিহির দাবি তুলেছে—রাজনীতিতে যে শব্দটি খুব জনপ্রিয় নয়। দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন শুরু হয়েছিল এইইটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। এর পেছনে ছিল ১৭ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা।
এরপর ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর নিয়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। তরুণদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও ওঠে প্রশ্ন।
একই সময়ে নারীরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দিল্লির লেডি শ্রীরাম কলেজের কাছে ভয়াবহ গণধর্ষণের ঘটনার পর নারী ও তরুণদের ক্ষোভ আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।
এসব আন্দোলনের রাজনৈতিক দাবি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পাশাপাশি মানুষের নজর কেড়েছে প্রতিবাদের ধরন।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’-এর কথাই ধরা যাক। শুরুতে এটি ছিল একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন অ্যাকাউন্ট। পরে সেটিই বড় একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপ নেয়। তরুণেরা বুঝিয়ে দিয়েছে, রাজনীতির ভাষা শুধু বক্তৃতার ভাষা নয়। ব্যঙ্গও রাজনৈতিক। হাসিও রাজনৈতিক। এমনকি একটি মিমও কখনো কখনো ক্ষমতার বিরুদ্ধে বক্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
নারীদের একটি স্লোগান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে—‘শরম নেহি হ্যায় মার্দোঁ মে, আওরাত কিউঁ হ্যায় পর্দোঁ মে’। অর্থাৎ, পুরুষদেরই যখন লজ্জা নেই, তখন নারীদের কেন পর্দার আড়ালে থাকতে হবে? স্লোগানটি শুধু প্রতিবাদস্থলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ নিজেদের মতো করে এর নতুন সংস্করণ তৈরি করতে শুরু করে।

বিহারে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের ধরন আরও মজার। তারা পুলিশকে জলকামান ব্যবহার করতে বলেছে—মজা করেই। কেউ কেউ লাঠিচার্জের দাবিও জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, এমন অভিজ্ঞতা না হলে ’‘এফওএমও—কিছু মিস করে ফেলার ভয়—হবে!
দিল্লিতে পুলিশকে থামাতে বিক্ষোভকারীদের জাতীয় সংগীত গাওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। প্রতিবাদে যাওয়ার আগে তরুণেরা কীভাবে প্রস্তুত হচ্ছে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে ভিডিও। মিম হয়ে উঠেছে আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ যেন ‘সিজন টু’ চাইতে শুরু করেছে।
এই প্রতিবাদের হাসি-ঠাট্টা ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। পাকিস্তান, নেপাল ও বাংলাদেশ থেকেও অনেকে অনলাইনে ভারতীয় তরুণদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। একটি ভাইরাল রিলের ভাষায়—‘পাশের দেশের প্রতিবাদ একদিকে, আমরাও সেইদিকে।’
অনেক ভিডিওতে তরুণ বিক্ষোভকারীদের বলা হয়েছে ‘তারা কোনো কিছুতেই ভয় পায় না’। তারা নিজেদের আবেগ লুকিয়ে রাখছে না। রাগ আছে, ভয় আছে, কষ্ট আছে—কিন্তু তার সঙ্গে আছে হাসিও।
এখানেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পার্থক্য।
অনেকে অবশ্য এই আচরণকে ‘আনসিরিয়াস’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের চোখে, অনলাইনে বেড়ে ওঠা জেন জি হয়তো রাজনীতির গভীরতা বোঝে না। তারা এমন এক প্রজন্ম, যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থাও কম।
কিন্তু এই বিচার কি খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে?
কবি ও লেখক টই ডেরিকটের একটি ধারণা এখানে গুরুত্বপূর্ণ—‘আনন্দও প্রতিরোধের একটি কাজ।’ নারীবাদী লেখক অড্রে লর্ডের চিন্তাতেও আনন্দের রাজনৈতিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, আনন্দ মানুষকে এমন শক্তি দেয়, যা তাকে ক্লান্তি, উদাসীনতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহায্য করে।
প্রতিবাদের ক্ষেত্রে এই কথাটির গুরুত্ব কম নয়। কারণ রাষ্ট্রের দমন শুধু লাঠি বা জলকামানের মাধ্যমে হয় না। দীর্ঘ আন্দোলনকে ক্লান্ত করে তোলাও একটি কৌশল। মানুষকে মানসিকভাবে অবসন্ন করে দেওয়া, তাদের ভয় দেখানো, তাদের মনে করিয়ে দেওয়া যে প্রতিবাদ করে লাভ নেই—এসবও প্রতিবাদ ভেঙে দেওয়ার উপায়। সেখানেই আনন্দের রাজনৈতিক গুরুত্ব।
যখন একজন তরুণ জলকামানের ভয়কে হাসিতে পরিণত করে, তখন সে শুধু মজা করছে না। সে ভয়কে অস্বীকার করছে। যখন একজন নারী ব্যঙ্গ করে স্লোগান দেন, তখন তিনি নিজের ক্ষোভকে এমন এক ভাষায় প্রকাশ করছেন, যা অন্যরাও সহজে গ্রহণ করতে পারে। যখন প্রতিবাদ ছড়ায় গান, ছড়া বা মিমের মাধ্যমে, তখন আন্দোলনটি শুধু প্রতিবাদস্থলে থাকা মানুষের মধ্যে আটকে থাকে না।
তবে আনন্দ মানে কষ্টকে অস্বীকার করা নয়। বরং এর বিপরীত। আনন্দের মধ্য দিয়েও মানুষ নিজের ব্যথা, ক্ষোভ ও শোককে প্রকাশ করতে পারে।
দিল্লির যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথাই ধরা যাক। সেখানে নারীদের ক্ষোভ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসে সম্মিলিত দাবিতে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জবাবদিহির দাবি স্লোগানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যঙ্গ ও ছড়া সেই দাবিকে আরও সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—মানুষ কীভাবে প্রতিবাদ করবে?
কেউ রাগ নিয়ে রাস্তায় নামবে, কেউ ব্যঙ্গ করবে, কেউ গান গাইবে, কেউ নীরবে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়াবে। প্রতিবাদের পদ্ধতি নিয়ে আমাদের পুরোনো ধারণা হয়তো বদলাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তারা কী দাবি করছে এবং কেন করছে।
মিম দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। একটি ভাইরাল রিল ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারে না। একটি গান রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারে না। কিন্তু মানুষ যখন সারাক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করছে, তখন একটি ভাইরাল ভিডিওও প্রতিবাদের দরজা খুলে দিতে পারে। যে মানুষটি দীর্ঘ বক্তৃতায় থামবে না, সে হয়তো একটি ছড়া শুনে থামবে। একটি মিম তাকে ভাবাবে। একটি গান তাকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করবে।
এ কারণেই জেন জির প্রতিবাদকে শুধু ‘আনসিরিয়াস’ বলে উড়িয়ে দেওয়া ভুল হতে পারে। তাদের ভাষা আলাদা, তাদের মাধ্যম আলাদা, কিন্তু প্রশ্নগুলো পুরোনো—ন্যায়বিচার কোথায়, জবাবদিহি কোথায়, নিরাপত্তা কোথায়?
সম্ভবত নতুন প্রজন্ম আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে: প্রতিবাদ মানেই সারাক্ষণ বিষণ্ন থাকা নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে রাগ দরকার, কিন্তু দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যেতে আনন্দেরও প্রয়োজন আছে।
ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত কেবল আদালত বা সংসদের ভাষা নয়; এটি মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার ভাষাও। আর সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কখনো কখনো একটি হাসি, একটি গান কিংবা একটি ছড়াও যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন।
সূত্র: দ্য ওয়্যার


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









