কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মধ্যকার যোগাযোগের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ফোনালাপের প্রতিলিপি পাওয়া গেছে। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের মধ্যে এসব ফোনালাপ হয়। এতে আন্দোলন দমনে নানা কৌশল ও নির্দেশনার তথ্য উঠে এসেছে।
আইটি ফরেনসিক এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন থেকে প্রাপ্ত এসব ফোনালাপে আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহারের চাঞ্চল্যকর সব চিত্র উঠে এসেছে। এতে আকাশপথে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নজরদারি ও দমনপীড়ন চালানো, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মাঠে নামানো এবং বিরোধী দলীয় নেতাদের ঢালাও গ্রেফতারের নির্দেশ দিতে শোনা যায়। পাশাপাশি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে বিদেশি কূটনীতিকদের কীভাবে ব্রিফ করা হবে, তা নিয়েও সাবেক সরকারের শীর্ষ নেতাদের বিস্তারিত আলোচনার তথ্য মিলেছে।
জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের ‘বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পাল্টা আগুন দেওয়ার নির্দেশ’ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন বলে ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্কের শুনানিতে তার একটি অডিও ‘ফোনালাপে’ তুলে ধরা হয়েছে।
একই সময়ে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে ‘হেলিকপ্টার ব্যবহারে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দেওয়া’ এবং ‘আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতার দায় চাপানোর’ কথার অডিও ফোনালাপও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ শেখ হাসিনার সঙ্গে ওবায়দুল কাদের ও হাছান মাহমুদের অডিও ফোনালাপ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে প্রসিকিউশনের পক্ষে অডিওটি উপস্থাপন করে যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
নথিতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২১ জুলাই তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে শেখ হাসিনার এসব ফোনালাপ হয়।
১৯ জুলাই দুপুর ২টা ৩৮ মিনিটের একটি ফোনালাপে ওবায়দুল কাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ডিএমপি কমিশনার কোনো পক্ষকেই সভা-সমাবেশ করতে দিতে রাজি নন।
ওবায়দুল কাদের: সর্বশেষ যেটা সকালে ডিএমপি কমিশনার বলেছিল যে মিটিং এটা আমরাও করবো না এবং তারাও করবে না করতে দেয়া হবে না যেটা, আপনি যে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা: আমিতো নির্দেশ দেইনি আমি কখন কি নির্দেশ দিছি?
ওবায়দুল কাদের: কাল নাছিম বলল আমরা একটা সমাবেশ করি। আপনি বললেন না সমাবেশের দরকার নাই।
আলোচনার এক পর্যায়ে ওবায়দুল কাদের জানান, আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হচ্ছে।
তখন শেখ হাসিনা নির্দেশ দেন
‘হ্যাঁ আমাদের এইসব জায়গায় আমাদের নেতা কর্মীদের নামাতে হবে। একটা বড় মিটিং ডেকে আমাদের নেতা কর্মী নামতে হবে সাথে পাঠাতে হবে। আর সে (ডিএমপি কমিশনার) যে একা একা করতেছে আইজিপির সাথে কথা বলে নিচ্ছে না?’
ওবায়দুল কাদের পুলিশের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজেদের লোক জড়ো করার কথা বললে শেখ হাসিনা আবারও জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের তো লোক জড়ো করাতে হবে।’ এরপর কাদের গায়েবানা জানাজা পড়ার প্রস্তাব দিলে শেখ হাসিনা সম্মতি দেন।’
হেলিকপ্টার থেকে ছত্রভঙ্গ করার নির্দেশ
একই দিনের কথোপকথনে শেখ হাসিনাকে আন্দোলনকারীদের দমনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিতে দেখা যায়।
শেখ হাসিনা: আমাদের কর্মীরা যেন এলার্ট থাকে। আর যেখানে যেখানে বেশি ওরা গেদারিং করতে থাকবে র্যাবরে বলতে হবে বিজিবি ওরা রেডি আছে হেলিকপ্টার ওরা হেলিকপ্টার থেকে ইয়ে করবে ছত্রভঙ্গ করবে।
বিরোধী নেতাদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বলছি যে কয়টারে পার উঠায়া নিয়া যাও।’
১৯ জুলাই, দুপুর ২টা ৫৪ মিনিট: ‘টিট ফর ট্যাট’ ও পাল্টাপাল্টি আগুন
অন্য একটি ফোনালাপে ড. হাসান মাহমুদ শেখ হাসিনাকে জানান যে, গায়েবানা জানাজা পড়ে তারা মহল্লায় মহল্লায় চলে যাবেন। শেখ হাসিনা তখন প্রতিটি এমপিকে নিজ এলাকায় প্রোটেকশন দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন:
‘ওরা আগুন দিয়ে পুড়াবে তো তাদের বাড়ি গাড়ি আছে এখন সেগুলো পাবলিক দিয়ে পুড়াবে আর কি করবে। এখন অন্য কিছু করে লাভ নাই তোরাও পুড়াবি আয় আমরাও পুড়াবো।’
উত্তরে ড. হাসান মাহমুদ বলেন, ‘জ্বি জ্বি রাইট এইটাই টিট ফর ট্যাট।’
সেতু ভবনে আগুন দেওয়ার খবর শুনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি র্যাব পাঠাচ্ছি... ওরা আগুন দিচ্ছে ওদের বাড়ি ঘর আছে না এখন আর বসে থাকার সময় নাই। আমাদেরও বাড়ি ঘরে আগুন দিচ্ছে ওদের বাড়ি ঘরে আগুন পাবলিক দিবে। ওদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কি কি আছে খুঁজে বের কর।’
২১ জুলাই, ২০২৪: কূটনীতিকদের ব্রিফিং ও বয়ান তৈরি
২১ জুলাই বিকেল ৫টা ১২ মিনিটের ফোনালাপে ড. হাসান মাহমুদ কূটনীতিকদের সাথে রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ের বর্ণনা দেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে কোনো মিডিয়াকে সেখানে ডাকা হয়নি।
ড. হাসান মাহমুদ: ‘আমেরিকা, ব্রিটিশ সবাই আসছিল... মিডিয়া ডাকলে হয় কী মিডিয়ারা ওদেরকে প্রভোক করে কথা বলার জন্য। সেজন্য কোনো মিডিয়া ডাকি নাই।’
ব্রিফিংয়ে মার্কিন ও কানাডীয় রাষ্ট্রদূতের প্রশ্নের জবাব কীভাবে দিয়েছেন, তা হাসিনাকে জানান হাসান মাহমুদ। এরপর শেখ হাসিনা পরবর্তী ‘ন্যারেটিভ’ বা বয়ান ঠিক করে দেন:
শেখ হাসিনা: এই খুনের দায়িত্ব কাদের? তোমাদের এই আন্দোলন করার জন্যই তো এই খুনটা হলো এর দায় দায়িত্ব তো ওদের (ছাত্রদের) নিতে হবে।’
ড. হাসান মাহমুদ: ওদেরও বর্তায় তো... আমি তো সেটাই বলতে চাচ্ছি ওরা যে করল ঐটার জন্যই তো এইটা হইলো।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আর গুলি করে তো ছাত্র মারা হয়নি ছাত্ররা নিজেরা নিজেরাই তো করছে। এরাই তো গুলি করে মারছে... এই হত্যার দায় দায়িত্ব ওদের উপর ফেলতে হবে।’
আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আদালতের উপর ভরসা না রেখে এই আন্দোলন করার কী প্রয়োজন ছিল... কোটা আন্দোলনের জন্য আগুন দিয়ে পুড়িয়ে রাষ্ট্রের সম্পদ কেন ধ্বংস করা হলো।
হাসান মাহমুদ তখন সহমত পোষণ করে বলেন, ‘এইটাকে মেইনস্ট্রিম করে আরো রেগুলার বলতে হবে।’
কথোপকথনের শেষে শেখ হাসিনা বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি 'রিলিজিয়াস অ্যাক্টিভিস্ট' শব্দবন্ধটি ব্যবহারের পরামর্শ দেন, যা বিদেশিরা সহজে গ্রহণ করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









