বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমানের (১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে পর্যন্ত সর্বমোট প্রায় ৪ বছর ১ মাস) শাসনকালে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ইতিহাসে একটি কাঠামোগত রূপান্তরকাল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, সম্পদহীন এবং তীব্র দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী ধাক্কায় থাকা রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনে জিয়াউর রহমান প্রবর্তন করেছিলেন 'উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি'।
চার দশকেরও বেশি সময় পর এসে সমসাময়িক অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ মনে করেন- আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে মজবুত কাঠামো, তার বহুলাংশেরই বীজ রোপণ করা হয়েছিল সেই সময়ে। কোনো নির্দিষ্ট নাম বা রাজনৈতিক মোড়ক ছাড়াই যদি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিবর্তনের দিকে তাকানো যায়, তবে দেখা যাবে আজ যে তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে- তৈরি পোশাকশিল্প, রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এবং কৃষিতে আত্মনির্ভরশীলতা- তার প্রাতিষ্ঠানিক গতিপথ তৈরি হয়েছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাত ধরেই।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খাদ্য নিরাপত্তা ও তীব্র খাদ্য ঘাটতি। প্রতি বছর লাখ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানিতে দেশের সীমিত বৈদেশিক মুদ্রা শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এই আমদানি নির্ভরতার চক্র ভাঙতে প্রবর্তন করা হয় দেশব্যাপী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল খনন কর্মসূচি। দেশের প্রথিতযশা কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, এই কর্মসূচি কেবল একটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান ছিল না, বরং এটি ছিল সেচ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের এক বিশাল সামাজিক আন্দোলন। এই আমলের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশজুড়ে প্রায় বারোশতটিরও বেশি খাল খনন ও পুনর্খনন করা হয়, যার মাধ্যমে প্রায় দশ লাখ একর ফসলি জমি সরাসরি সেচ সুবিধার আওতায় আসে এবং শুষ্ক মৌসুমেও উচ্চফলনশীল বা উফশী ধান চাষের পথ পুরোপুরি সুগম হয়।
একই সাথে কৃষকদের দোরগোড়ায় সার, বীজ ও কীটনাশক পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সেচপাম্প ও গভীর নলকূপ স্থাপন ও সরকারি ভর্তুকি দেওয়া শুরু হয়। তৎকালীন আন্তর্জাতিক খাদ্য ও কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, এই সমন্বিত কৃষিনীতির ফলেই ১৯৭৫ সালের তীব্র খাদ্য ঘাটতি কাটিয়ে ১৯৮১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। উৎপাদনশীলতাকে গ্রামীণ অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার এই প্রাতিষ্ঠানিক নীতিই পরবর্তীতে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে টেকসই রূপ দিয়েছে।
একই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দর্শনে আরও একটি বড় বিবর্তন ঘটে। সমাজতান্ত্রিক ধারণার রাষ্ট্রায়ত্ত ও জাতীয়করণকৃত রুগ্ন শিল্পব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত করা হয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া বা লোকসানে চলা দুইশত পঞ্চাশটিরও বেশি কলকারখানা ও ট্যানারিগুলোকে বিরাষ্ট্রীয়করণ করে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে ১৯৭৭ সালে ভেজা চামড়ার ওপর শতভাগ রপ্তানি শুল্ক আরোপ করার ফলে ক্রাস্ট ও তৈরি চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে জোয়ার আসে, যা রপ্তানি আয়ে চামড়ার অবদান দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭২ সালে আরোপিত ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সর্বোচ্চ আড়াই মিলিয়ন টাকার সীমা ১৯৭৮ সালে এসে সম্পূর্ণ বিলোপ করা হয় এবং স্বাধীনতার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরায় সচল করা হয়। এর ফলে অলস অর্থ ও সঞ্চয় মূলধারার বিনিয়োগে আসার সুযোগ পায়।
বর্তমান বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের লাইফলাইন বলা চলে তৈরি পোশাকশিল্পকে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় পঁচাশি শতাংশ জোগান দেয়। দেশের জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বিশেষ শুল্কমুক্ত গুদামজাতকরণ সুবিধা ও ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট সুবিধার প্রাথমিক নীতিমালার ওপর ভিত্তি করেই বেসরকারি উদ্যোগেই প্রথম বড় আকারের পোশাক কারখানার ভিত্তি স্থাপিত হয়। রাষ্ট্র যদি তখন উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি ভাগ করে না নিত এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সহজ না করত, তবে আজ তৈরি পোশাকশিল্পের এই বিশ্বজয় সম্ভব হতো না। বেসরকারি ব্যাংক ও বীমা খাতকে উন্মুক্ত করার আইনি সংস্কারও হয়েছিল এই সময়েই, যা অভ্যন্তরীণ পুঁজি গঠন এবং আজকের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বিকাশের পথ তৈরি করে দেয়।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ যে চূড়ান্তভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছিল, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, তার প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিমূলক ভিত রচিত হয়েছিল সত্তর দশকের শেষের দিকের এই সাহসী সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমেই। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সচল রাখার দ্বিতীয় প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। সত্তর দশকের শেষের দিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যখন খনিজ তেলের কারণে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ার আসে, তখন তৎকালীন প্রশাসন অত্যন্ত দূরদর্শী কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে।
জনশক্তি রপ্তানিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশৃঙ্খল রূপ দিতে ১৯৭৬ সালে গঠন করা হয় জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো। বিশিষ্ট উন্নয়ন গবেষকদের মতে, সরকারি পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সফল দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশি অদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর এই আইনি ও নিরাপদ পথ সুগম করার সিদ্ধান্তটি ছিল বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে একটি জাদুকরী অস্ত্র। ১৯৭৫ সালে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেখানে ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়, এই প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি বৃদ্ধির সুবাদে ১৯৮১ সাল নাগাদ তা অত্যন্ত মজবুত ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যায়, যা রাষ্ট্রকে বাইরের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর শক্তি জোগায়। রেমিট্যান্সের এই অন্তহীন প্রবাহ কেবল রাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেই স্থিতিশীল রাখেনি, বরং গ্রামীণ নিম্নবিত্ত শ্রেণিকে মধ্যবিত্তে রূপান্তরিত করে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে শক্তিশালী করেছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেবল বড় বড় শহরে বা নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা টেকসই হয় না। এই অর্থনৈতিক সত্যটি অনুধাবন করে তৎকালীন সরকার তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ক্ষমতার বিকেন্দ্রকরণ ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে। গ্রাম সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে সরাসরি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশীদার করা হয়। গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে আধুনিকায়নের দিকে ধাবিত করে। এই ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জাতীয় আহ্বানের ফলে রাষ্ট্রের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে। স্বাধীনতার পর যেখানে উন্নয়ন বাজেটের প্রায় পুরোটাই বিদেশি সাহায্য ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সচল করার মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মসূচিতে নিজস্ব অর্থায়নের অনুপাত উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়, যা বৈদেশিক নির্ভরশীলতার বৃত্ত থেকে রাষ্ট্রকে বের করে আনার প্রথম সফল প্রয়াস ছিল।
তৎকালীন সমাজবিজ্ঞানীদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গ্রামীণ রাস্তাঘাট, হাটবাজার এবং কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির সাথে শহুরে বাজারের যে সংযোগ ঘটানো হয়েছিল, তা গ্রামীণ উৎপাদনশীলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক উন্নয়ন গবেষক মনে করেন, গ্রামীণ পর্যায়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক অবকাঠামোগুলো গড়ে ওঠার কারণেই পরে বাংলাদেশে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনগুলোর জন্য একটি উর্বর ও উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। শুধু ভৌত অবকাঠামো নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নেও এই সময়ে ব্যাপক জোর দেওয়া হয়। গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রসার এবং পরিবার পরিকল্পনাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ তখন শুরু হয়েছিল, তার সুফল হিসেবেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশে জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ বা বোনাস কালের সূচনা ঘটে।
তৎকালীন অর্থনৈতিক ডেটা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং জ্বালানি তেলের সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল প্রায় ছয় শতাংশের কাছাকাছি, যা ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক ও বিস্ময়কর। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রমাণ মেলে তৎকালীন রাজস্ব আয়ের চিত্রেও, দেশের মোট করের মধ্যে শুল্ক ও বিক্রয় করের অংশ ১৯৭৪ সালের ৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৯৭৯ সালে ৬৪ শতাংশে উন্নীত হয়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে মুদ্রা বাজারকে স্থিতিশীল করা এবং একই সাথে চামড়া, চা ও হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে রপ্তানি বহুমুখীকরণের যে সূচনা হয়েছিল, তা আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের মূলভিত্তি স্থাপন করেছিল। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি কোনো একক বিচ্ছিন্ন ঘটনায় গড়ে ওঠে না, এটি ধারাবাহিক সংস্কার ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফসল। রাজনীতিতে আদর্শিক ভিন্নতা ও বিতর্ক চিরকাল থাকবে। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতির নিরাসক্ত ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে এটি অনস্বীকার্য, চার দশক আগে জিয়াউর রহমানের গৃহীত সাহসী ও মুক্তবাজারমুখী নীতিগুলোই আজকের বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার মূল ভিত। উৎপাদনশীলতাকে রাজনীতির ও রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার সেই কালজয়ী দর্শনই আজকের আধুনিক ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









