বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তথ্য অনুযায়ী গত ছয় মাসে হাম সংক্রমণে শীর্ষে বাংলাদেশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাম সংক্রমণে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে ভারত। দেশটিতে ছয় মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৬ হাজার ৬০৭ জন। এরপর রয়েছে ইয়েমেন (১৪ হাজার ৫২১), মেক্সিকো (১২ হাজার ৪৯৫), পাকিস্তান (১১ হাজার ৩৭), ক্যামেরুন (৯ হাজার ৬৫৩), কাজাখস্তান (৭ হাজার ৭৩০), গুয়েতেমালা (৬ হাজার ৮৩২), অ্যাঙ্গোলা (৬ হাজার ৮১৫) এবং সুদান (৫ হাজার ৭৬৬)।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, একই সময়ে বিশ্বের ১৬৫টি দেশে মোট ১ লাখ ৮৬ হাজার হাম বা হামের উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৭০৮ জনের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় এক হাজার জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর তথ্য বলছে, মার্চ মাসে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজারে পৌঁছায়। এপ্রিলে তা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং মে মাসে নতুন রোগী শনাক্ত হয় প্রায় ১৫ হাজার। চূড়ান্ত হিসাবেও বাংলাদেশ হাম সংক্রমণে বিশ্বের শীর্ষেই থাকবে। শুধু সংক্রমণ নয়, হামে মৃত্যুর সংখ্যাও বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কাভারেজ কমে যাওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান কারণ। একসময় জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে শতভাগ সাফল্য অর্জন করলেও ২০২৫ সালে নিয়মিত হাম টিকাদানের হার নেমে আসে ৫৯ শতাংশে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় টিকার সংকটও দেখা দেয়।
ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় দুই ডোজ টিকার একটিও পায়নি। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী এবং এক থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে টিকাবঞ্চিতের হার বেশি। হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে না পারলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বজায় রাখা সম্ভব হবে না। ফলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকে যাবে। এ পরিস্থিতিতে ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দ্রুত টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪২ হাজার। বিশ্বজুড়ে হাম ও রুবেলা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তর জেনেভায় নিয়মিত যে প্রাথমিক উপাত্ত জমা হয়, সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে সেই তথ্য সংগ্রহ করে, এই তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ছয় মাসে হাম সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশের নাম শীর্ষে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। এ সময়ে দেশটিতে হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ২৬ হাজার ৬০৭ জন। দেশে বছরের শুরুতে হঠাৎই শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুসারে, ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের সন্দেহজনক রোগী পাওয়া গেছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮ জন, আর ১৪ হাজার ৭০৮ জনের হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭০২ জনের। যার মধ্যে বেশিরভাগই শিশু।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে হাম রোগের সংখ্যা ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে বিশ্বে হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১০ লাখ, যেখানে ২০০০ সালে সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ। তবে টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবারও হাম বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। বিশেষ করে মহামারির পর টিকা নিয়ে সংশয় ও সতর্কতা কমে যাওয়ায় এশিয়া, আফ্রিকা ছাড়াও ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে হাম বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে উত্তর লন্ডনের কিছু স্কুলে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের পুনরায় টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নয় মাস বয়স থেকে হাম টিকা দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স নয় মাসের নিচে।
এই অল্পবয়সী শিশুদের সংক্রমণ ‘বিশেষভাবে উদ্বেগজনক’, কারণ তারা এখনো নিয়মিত টিকা পাওয়ার যোগ্য হয়নি। বাংলাদেশ প্রতি চার বছর অন্তর বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি চালায়, তবে ২০২০ সালের পর থেকে কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বভার, এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলের নতুন সরকারের নির্বাচনের কারণে টিকাদান পরিকল্পনা সময়মতো সম্পন্ন হয়নি। সরবরাহ জটিলতার কারণে হামসহ বিভিন্ন টিকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ইউনিসেফও বলেছে, হাম পুনরুত্থান সাধারণত একক কারণে নয়, বরং সময়ের সঙ্গে সংরক্ষণ ও কার্যক্রমে ছোট ছোট ফাঁকফোকরের ফল।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ বেশ কিছু জেলায় হুট করেই শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া হাম রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চের পর থেকে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে, এর মধ্যে ৯০০টিরও বেশি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। প্রাদুর্ভাবটি সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যেখানে ১০০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছেÑবেশির ভাগই শিশু। শিশুদের টিকা প্রদানের গুরুত্বের দিকে ইঙ্গিত করে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, “শিশুদের বেঁচে থাকার ভিত্তি হলো টিকা। বর্তমান হাম প্রাদুর্ভাব হাজার হাজার শিশুকে, বিশেষ করে সবচেয়ে ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণদের, গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলছে।”
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুদীর্ঘ ইতিহাসে হাম একটি অতিপ্রাচীন ও সংক্রামক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত। প্যারামিক্সোভাইরাস পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই বিষাক্ত জীবাণু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবসভ্যতাকে বিপর্যস্ত করেছে। আদিতে একে কেবল একটি সাধারণ চর্মরোগ মনে করা হলেও এর ভয়াবহতা ও প্রাণঘাতী রূপ উন্মোচিত হয় আধুনিক বিজ্ঞানের স্পর্শে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস এবং অন্ধত্বের মতো জটিলতা তৈরি করে এটি একটি নীরব ঘাতকে পরিণত হয়। আজ ২০২৬ সালের পহেলা এপ্রিল, যখন আমরা প্রযুক্তির শিখরে অবস্থান করছি, তখনও বাংলাদেশে এই প্রাচীন ব্যাধিটি তার আগ্রাসী ও ভয়াবহ রূপে পুনরুত্থান ঘটিয়েছে। হাম কেবল একটি শারীরিক রোগ নয়, এটি একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা।, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ এবং পুষ্টির দিকে নজর দেওয়া এখন অপরিহার্য।
এ ছাড়া টিকাদানের বয়সসীমা সাময়িকভাবে কমিয়ে ৬ মাস থেকে করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার দ্রুত বাস্তবায়ন কাম্য। অভিভাবকদের সচেতনতা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর গায়ে জ্বর কিংবা ফুসকুড়ি দেখা দিলে কোনো কবিরাজি চিকিৎসা না করিয়ে সরাসরি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। টিকা কার্ড নিয়মিত পরীক্ষা করে নিশ্চিত করতে হবে যে শিশু সবকটি ডোজ পেয়েছে কি না। সাধারণ জনসাধারণকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে এবং আক্রান্ত শিশুকে অন্য সুস্থ শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে। মাস্ক ব্যবহার ও হাত ধোয়ার অভ্যাস সংক্রমণের বিস্তার রোধে সহায়ক হতে পারে। ২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশে হামের যে বর্তমান রূপ দেখা যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে প্রশাসনিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা।
২০২৩ এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সুযোগে টিকাদান কর্মসূচিতে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চলে টিকাদান কর্মীরা সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভ্যাকসিনের মজুদ শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় সংক্রমণের হার ৭৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অব্যবস্থাপনার ফলে স্বাস্থ্য খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ইপিআই কর্মসূচির যে ধারাবাহিক সাফল্য ছিল, তা আজ ম্লান হতে বসেছে। অনেক ক্ষেত্রে টিকার ঘাটতিকে বৈশ্বিক সমস্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী এটি মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ তদারকির অভাব এবং সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন আমদানিতে ব্যর্থতার ফল। ২০২৬ সালের পহেলা এপ্রিল পর্যন্ত গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।২০২৬ সালের এই প্রাদুর্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সামান্যতম অবহেলা লাখ লাখ শিশুর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
বিজ্ঞান ও সংহতির মেলবন্ধনে আমাদের এই প্রাচীন শত্রুর আগ্রাসী রূপকে পরাজিত করতে হবে। প্রতিটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক কর্তব্য। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে হামমুক্ত এক সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









