আমাদের নাম, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য কিংবা কোথায় কখন গিয়েছিলাম ইত্যাদি তথ্য যদি কারও হাতে চলে যায়, তাহলে এমন কী ক্ষতি হতে পারে?
প্রশ্নটি হয়তো অনেকের কাছেই সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্য আর শুধু কাগজে লেখা কিছু তথ্য নয়।
একজন মানুষের নাম, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, জন্মতারিখ, ঠিকানা, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, এনআইডি নম্বর কিংবা অনলাইন কার্যক্রম- সব মিলিয়ে তৈরি হয় তার একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ডিজিটাল পরিচয়’। আর এই পরিচয় যদি অপরাধীদের হাতে চলে যায়, তাহলে ঝুঁকিটা শুধু গোপনীয়তা হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
সম্প্রতি বাংলাদেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে বিক্রির বিষয়ে বিভিন্ন অনুসন্ধান ও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার এক প্রতিবেদনে ডার্ক ওয়েবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিকের সিভি বিক্রির বিজ্ঞাপনের কথা উঠে এসেছে। সেখানে নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, ই-মেইল, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মজীবনের মতো তথ্য থাকার দাবি করা হয়। অন্যদিকে গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে আরো উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইনে এনআইডি, সাইন কপি, কল বিবরণী, মোবাইলের অবস্থানসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির প্রচারণা চলছে। অনুসন্ধানে এক মাসে ৬০০টির বেশি প্রচারণামূলক ফেসবুক পোস্ট এবং ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। আমাদের তথ্যের দাম কত? এখানেই বিষয়টি সবচেয়ে ভয়ংকর। অনেকেই ভাবেন, ‘আমার নাম আর মোবাইল নম্বর জানলে এমন কী হবে?’ কিন্তু একটি তথ্য যখন অন্য একটি তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তার মূল্য বহুগুণ বেড়ে যায়।
ধরা যাক, কারও নামের সঙ্গে মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, জন্মতারিখ, ঠিকানা ও পেশার তথ্য যুক্ত হলো। এরপর জানা গেল তিনি কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট কোনটি এবং কোন নম্বরটি নিয়মিত ব্যবহার করেন।
একজন সাইবার অপরাধীর কাছে এটি আর কয়েকটি বিচ্ছিন্ন তথ্য নয়- এটি একজন মানুষের ডিজিটাল প্রোফাইল। এই প্রোফাইল ব্যবহার করে তৈরি হতে পারে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণার ফাঁদ।
এখন আমরা জেনে নিই এ ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলে কী কী হতে পারে?
প্রথম ঝুঁকি হলো টার্গেটেড ফিশিং। সাধারণ ‘আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’ ধরনের বার্তার পরিবর্তে অপরাধী আপনার নাম, কর্মস্থল কিংবা পরিচিত কারও তথ্য ব্যবহার করে এমন একটি বার্তা পাঠাতে পারে, যা সত্যি মনে হবে।
দ্বিতীয় ঝুঁকি পরিচয় জালিয়াতি। আপনার এনআইডি, জন্মতারিখ, ছবি, ঠিকানা বা স্বাক্ষরের মতো তথ্য বিভিন্ন প্রতারণামূলক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
তৃতীয় ঝুঁকি আর্থিক প্রতারণা। ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে যদি মোবাইল নম্বর বা আর্থিক সেবার তথ্য যুক্ত হয়, তাহলে অপরাধী আরো বিশ্বাসযোগ্যভাবে আপনাকে লক্ষ্য করতে পারে।
চতুর্থ ঝুঁকি ভুয়া চাকরি বা বিনিয়োগের প্রস্তাব। চাকরিপ্রার্থীর সিভি ফাঁস হলে প্রতারক জানে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত আগ্রহ। ফলে ভুয়া চাকরির অফার তৈরি করা অনেক সহজ হয়ে যায়। দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরাও ফাঁস হওয়া সিভির তথ্য দিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, পরিচয় জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন।
আবার, যদি কারও ফোন কল বিবরণী বা অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ফাঁস হয়, ঝুঁকিটি আরো ব্যক্তিগত ও গভীর হয়ে থাকে । ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এমন তথ্য থেকে কার সঙ্গে কখন যোগাযোগ হয়েছে কিংবা একটি মোবাইল নম্বর কোন এলাকার টাওয়ারের আওতায় ছিল- এ ধরনের তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ধরনের তথ্য ফাঁসের জন্য কে দায়ী ?
আমরা সাধারণত, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের জন্য প্রায়ই শুধু ‘হ্যাকার’ শব্দটি ব্যবহার করি। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। তথ্য ফাঁস হতে পারে দুর্বল সাইবার নিরাপত্তার কারণে, কর্মীর অসতর্কতার কারণে, অভ্যন্তরীণ ব্যক্তির মাধ্যমে, ভুল কনফিগার করা সার্ভারের কারণে কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলে যাওয়ার মাধ্যমে।
কখনো কখনো আমরা নিজেরাই অতিরিক্ত তথ্য দিয়ে দিই।
একটি চাকরির আবেদন করতে গিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তথ্য দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনআইডির ছবি প্রকাশ করা, অনির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইটে জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বর দেওয়া কিংবা অচেনা অ্যাপকে অপ্রয়োজনীয় অনুমতি দেওয়া- এসব কিছুই তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় ।
তথ্য নিরাপত্তায় আমাদের করণীয় কি?
প্রথমত, যেখানে যতটুকু তথ্য প্রয়োজন, ততটুকুই দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, এনআইডি, পাসপোর্ট, ব্যাংক বা গুরুত্বপূর্ণ নথির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না। প্রয়োজন হলে নথির ওপর উদ্দেশ্য ও তারিখ উল্লেখ করে ওয়াটারমার্ক ব্যবহার করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে দুই স্তরের নিরাপত্তা বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিক্যাশন (এমএফএ) চালু করতে হবে ।
চতুর্থত, সব অ্যাকাউন্টে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা যাবে না। প্রতি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে ।
পঞ্চমত, অচেনা লিংক, সংযুক্ত ফাইল বা ‘জরুরি’ বার্তায় কখনো তাড়াহুড়ো করে সাড়া দেওয়া যাবে না ।
ষষ্ঠত, আমাদের মোবাইল নম্বর, ই-মেইল ও অন্যান্য তথ্য কোথায় ব্যবহার করছি- নিয়মিত তা পর্যালোচনা করতে হবে ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডিজিটাল সচেতনতা। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, প্রতারণাও তত বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হচ্ছে এটা সব সময় আমাদের মাথায় রাখতে হবে ।
আমরা টাকা-পয়সা, স্বর্ণ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিরাপদে রাখি। কিন্তু ব্যক্তিগত তথ্যকে এখনো অনেকেই সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করি না।
অথচ একজন মানুষের পরিচয়, যোগাযোগ, অবস্থান, আর্থিক আচরণ ও পেশাগত তথ্য একত্র হলে সেটি একজন অপরাধীর জন্য অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। তাই ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা শুধু আইটি বিভাগের দায়িত্ব নয়। এটি নাগরিকের দায়িত্ব, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। একজন নাগরিককে যেমন নিজের তথ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, তেমনি যেসব প্রতিষ্ঠান নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে, তাদেরও জানতে হবে- তথ্য সংগ্রহ করা মানে শুধু তথ্যের মালিক হওয়া নয়; সেই তথ্যের নিরাপত্তার দায়িত্বও নেওয়া। ডিজিটাল পৃথিবীতে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে- ‘আমার তথ্যের কীই বা মূল্য?’- এমন ভাবনা।
কারণ, আপনার কাছে হয়তো একটি মোবাইল নম্বর শুধু একটি নম্বর। কিন্তু অনেকগুলো তথ্য একত্র করে একজন সাইবার অপরাধী আপনার পরিচয়, অভ্যাস, সম্পর্ক, অবস্থান এবং দুর্বলতা সম্পর্কে এমন একটি ছবি তৈরি করতে পারে, যা আপনি নিজেও হয়তো কখনো তৈরি করেননি।
তাই এখন থেকে একটি সহজ নিয়ম মনে রাখতে হবে: অনলাইনে তথ্য দেওয়ার আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করতে হবে- কেন তথ্যটি দিচ্ছি? কাকে দিচ্ছি? আর এটি ফাঁস হলে কী ক্ষতি হতে পারে?
এই তিনটি প্রশ্নর উত্তর হয়তো আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে ।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









