এল নিনোকে এত দিন জলবায়ুর একটি পরিচিত স্বাভাবিক চক্র হিসেবেই দেখা হয়েছে। কয়েক বছর পরপর প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দাবানল, কোথাও আবার ফসলহানি। বিজ্ঞানীরা জানেন এই চক্রের ভাষা।
কিন্তু এবারের এল নিনো যেন সেই পরিচিত ভাষার সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে।
গ্রহকে এখন যে এল নিনো উত্তপ্ত করছে, সেটি তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর কয়েক মাস আগেই আধুনিক রেকর্ডের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা অতিক্রম করেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের যে অংশে এল নিনোর তাপমাত্রা মাপা হয়, সেখানে তাপমাত্রা এখন ৩ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। ২০১৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে রেকর্ড করা ৩ দশমিক ০২ ডিগ্রির চেয়েও বেশি এটি।
এই হিসাব করা হয়েছে ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড় তাপমাত্রার তুলনায়।
আবহাওয়াবিদেরা অবশ্য আরেকটি মাপকাঠিও ব্যবহার করেন। সেটি ৩০ বছরের চলমান গড়কে ভিত্তি ধরে, অর্থাৎ মানুষের তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবও হিসাবের মধ্যে রাখে। সেই সূচক—ওএনআই বা এনআইও২.৪—এখনও ২০১৫ সালের রেকর্ড থেকে মাত্র এক-শতাংশ ডিগ্রি নিচে। দুই ধরনের হিসাবের ভিত্তিতেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য।
এখানেই আশঙ্কার বড় কারণটি লুকিয়ে আছে।
বর্তমান পূর্বাভাস বলছে, নভেম্বর ও ডিসেম্বর নাগাদ তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। ১৪টি জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে জলবায়ুবিজ্ঞানী জেকে হাউসফাদার এই হিসাব দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এই মাত্রা আগের ঘটনাগুলোর তুলনায় এতটাই অস্বাভাবিক যে তাকে ‘মাইন্ড-ব্লোয়িং’ না বলে উপায় নেই। অন্য বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এটি যেন ‘গডজিলা-লেভেল’ এল নিনো।
এল নিনোর সংজ্ঞাই বলে দেয় এবারের ঘটনা কতটা বড়। তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উঠলে তাকে এল নিনো বলা হয়। ২ ডিগ্রির বেশি হলে সেটি ‘খুব শক্তিশালী’ এল নিনো—যাকে সাধারণভাবে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়।
এবারের ঘটনাটি অন্তত গত এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।

কিন্তু বিপদ শুধু এল নিনো কতটা শক্তিশালী, তার মধ্যে নেই। আসল বিপদ হলো, এই অতিরিক্ত উত্তাপ এমন এক পৃথিবীতে এসে পড়েছে, যে পৃথিবীর তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই দ্রুত বাড়ছে মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে।
দুটি উত্তাপ এখন একসঙ্গে কাজ করছে।
এল নিনো সাময়িক। জলবায়ু পরিবর্তনের উষ্ণতা দীর্ঘস্থায়ী। প্রথমটি যখন দ্বিতীয়টির ওপর এসে বসে, তখন আবহাওয়ার পরিচিত ধাক্কাগুলো আরও বড় হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই ২০২৭ সাল আগের সব তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে এবং সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলছেন, এটি জলবায়ু ব্যবস্থার ভেতরে শক্তির এক বিশাল পুনর্বণ্টন। বিপজ্জনক বিষয় হলো, সেই পুনর্বণ্টন ঘটছে এমন এক পৃথিবীতে, যাকে মানুষ ইতিমধ্যেই অনেক বেশি উষ্ণ করে ফেলেছে।
এর ফল শুধু থার্মোমিটারে দেখা যাবে না।
অনেক অঞ্চলে এমন তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে, যা মানুষের পূর্ব অভিজ্ঞতার বাইরে। তার সঙ্গে বাড়বে অসুস্থতা ও মৃত্যু, খাদ্য উৎপাদনের ওপর চাপ এবং পানির সংকট।
ইন্দোনেশিয়ায় এর কিছু লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া সেখানে রেকর্ড মাত্রার দাবানলকে উসকে দিয়েছে। আগুনের ধোঁয়া বাতাসকে এমনভাবে দূষিত করেছে যে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
ভারতে অন্য ধরনের সংকেত দেখা যাচ্ছে। বর্ষার গুরুত্বপূর্ণ বৃষ্টি কমে গেছে। যে মৌসুমি বৃষ্টি কোটি কোটি মানুষের কৃষি ও পানির নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত, তার ওপর এল নিনোর এই প্রভাব সরাসরি পড়ছে।
মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে খরা ফসল নষ্ট করছে। পানামা খালে পানির স্তরও কমে গেছে। এর ফলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের গল্প তাই শুধু গরমের গল্প নয়। এটি বন্দর, খাল, কৃষিজমি, খাদ্যের বাজার এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের রান্নাঘরের গল্পও।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি আগস্টে সতর্ক করেছে, এল নিনোর প্রভাবে আগামী বছর প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ে যেতে পারেন। উৎপাদন কমলে খাদ্যের দাম বাড়বে। আর খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই মানুষ, যাদের আয় ইতিমধ্যেই খাবার কিনতেই প্রায় শেষ হয়ে যায়।
তবে এল নিনো সব জায়গায় খরা নিয়ে আসে না। পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে এর উল্টো চিত্র দেখা যায়—অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যা।
পেরু ও চিলিতে ইতিমধ্যেই ভারী বৃষ্টির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। পর্যটনের ওপরও তার প্রভাব পড়েছে; মাচু পিচুতে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলও অতিবৃষ্টির ঝুঁকিতে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে শীতকালে প্রবল বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মও হতে পারে বেশি উষ্ণ ও শুষ্ক। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এর অর্থ হতে পারে আরও বেশি দাবানল ও খরা।
প্রশান্ত মহাসাগরে টাইফুন আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিপরীতে এল নিনোর কারণে আটলান্টিকে সাধারণত হারিকেনের প্রবণতা কমে যায়। চলতি বছর এখন পর্যন্ত সেখানে একটি হারিকেনও তৈরি হয়নি—যা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত একটি মৌসুমের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কিন্তু বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ এখানেই শেষ নয়। তাঁরা জানেন এল নিনোর স্বাভাবিক প্রভাব কী। সমস্যা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন সেই পুরোনো নিয়মগুলোকে বদলে দিতে পারে।
একটি উষ্ণ পৃথিবীতে পুরোনো জলবায়ু-চক্রের প্রভাবও পুরোনো থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা তাই দেশগুলোর আবহাওয়া পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করতে তার ৫০ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ শুরু করেছে। লক্ষ্য একটাই—মানুষকে সময় থাকতে সতর্ক করা।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সেপ্টেম্বরের শুরুতে বলেছিলেন, এল নিনো আমাদের চোখের সামনে আরও বড় হয়ে উঠছে। পৃথিবী এমন এক জলবায়ু অঞ্চলে ঢুকে পড়ছে, যেখানে আগের অভিজ্ঞতা দিয়ে সবকিছু বোঝা কঠিন। তাঁর ভাষায়, এখন প্রতিযোগিতাটি হচ্ছে বাড়তে থাকা ঝুঁকি আর জলবায়ু মোকাবিলায় মানুষের অঙ্গীকারের মধ্যে।
লন্ডনের অধ্যাপক বিল ম্যাকগুয়ারের কাছে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের বর্তমান পরিস্থিতি আরও বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তাঁর মতে, এটি গত এক হাজার বছরের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক আবহাওয়াগত পরিবর্তনগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। এর পরিণতিতে পৃথিবীর নানা প্রান্তে একের পর এক ভয়াবহ আবহাওয়াগত দুর্যোগ দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের এল নিনোর অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়।
১৯৯৭-৯৮ সালের সুপার এল নিনোর কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আনুমানিক ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল বলে একটি হিসাব রয়েছে। তুলনার জন্য বলা যায়, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দায় বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদন কমেছিল প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। আর বর্তমান এল নিনো ইতিমধ্যে ১৯৯৭-৯৮ সালের ঘটনাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এখানে অর্থনীতির একটি অস্বস্তিকর সত্য আছে। জলবায়ু দুর্যোগ সাধারণত আলাদা আলাদা জায়গায় ঘটে। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। কোনো দেশে ফসল নষ্ট হয়, অন্য দেশে খাদ্যের দাম বাড়ে। কোনো খালে পানির স্তর কমে, বিশ্ব বাণিজ্য ব্যাহত হয়। কোথাও দাবানল হয়, কোথাও বীমার খরচ বাড়ে। কোথাও মানুষ অসুস্থ হয়, কোথাও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়।
জলবায়ু ব্যবস্থা তাই শুধু প্রকৃতির বিষয় নয়। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনেরও অবকাঠামো।
সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও একটি উদ্বেগজনক সম্পর্ক উঠে এসেছে। মানুষের তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এখন এল নিনোর চক্রকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। আর শক্তিশালী এল নিনো আবার জলবায়ু সংকটের অভিঘাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্থাৎ একটি প্রতিক্রিয়ার চক্র তৈরি হচ্ছে।
প্রবাল, গাছের বলয় এবং ঐতিহাসিক নথিপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বলছেন, গত এক হাজার বছরে কোনো এল নিনো বর্তমান ঘটনার সমপর্যায়ে পৌঁছায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাটমসফেরিক রিসার্চের অধ্যাপক কেভিন ট্রেনবার্থের কথাটি তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ: এল নিনোর প্রতিটি প্রভাবই বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বড় হয়ে উঠছে।
ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ায় এ বছরের গ্রীষ্মে যে তীব্র গরম ও দাবানল দেখা গেছে, তাঁর মতে, সেগুলো হয়তো সামনে আসা পরিস্থিতির কেবল একটি নমুনা।
এখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হয়তো আমাদের ধারণায়।
এল নিনো একসময় ছিল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যার আগমন ও প্রস্থান বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করতেন। এখন সেই একই ঘটনা এমন একটি গ্রহে ফিরে আসছে, যেখানে মানুষের কর্মকাণ্ড জলবায়ুর ভিত্তিটাই বদলে দিয়েছে। তাই প্রশ্নটি শুধু এবারের এল নিনো কতটা শক্তিশালী, তা নয়। প্রশ্ন হলো—একটি উষ্ণতর পৃথিবীতে আমরা কতটা শক্তিশালী এল নিনোর জন্য প্রস্তুত?
কারণ প্রশান্ত মহাসাগরের পানি ঠান্ডা হয়ে একসময় এল নিনো শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু যে অতিরিক্ত উষ্ণ পৃথিবীর ওপর এই এল নিনো আছড়ে পড়ছে, সেটি এত সহজে ঠান্ডা হবে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









