দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে তীব্র উত্তেজনা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ব্যাংকটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক বিতর্কিত ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানীর মতিঝিলের বাণিজ্যিক এলাকার দিলকুশায় আন্দোলনরত সাধারণ গ্রাহকদের ওপর পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। 'ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম'-এর ব্যানারে আয়োজিত এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো দিলকুশা ও মতিঝিল এলাকা। সংঘর্ষে ফোরামের অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রাহক গুরুতর আহত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ অভিযান শুরু করে। এক পর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে অনেকে আহত হন। দিলকুশা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পরে আবার তারা ইসলামী ব্যাংক এলাকায় অবস্থান নেন। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ করেছে। তাদের দাবি, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান এস আলমের দোসর। তাকে নিয়োগ দেওয়ার কারণে ব্যাংকে আবার লুটপাট হবে। এ কারণে তারা তাদের দাবি তুলে ধরতে কর্মসূচি পালন করছিলেন।
জানা গেছে, গতকালই নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের ব্যাংকটিতে প্রথম যোগদানের কথা ছিল। নতুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে সকাল থেকেই 'সচেতন গ্রাহক ফোরাম'-এর ব্যানারে শত শত গ্রাহক ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে মানববন্ধন শুরু করেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, সদ্য নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ 'এস আলমে'র ঘনিষ্ঠ সহযোগী। গ্রাহকদের অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। এক পর্যায়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং জলকামান থেকে পানি ছিটিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। এসময় আন্দোলনকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
পুলিশি অভিযানের মুখে কিছু সময়ের জন্য বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লেও বেলা ১২টার পর আবারও তারা সংঘটিত হয়ে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় আন্দোলনকারীরা চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল, সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল এবং ব্যাংকটিকে এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত করার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নুর নবী মানিক অভিযোগ করেন, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমান এবং এমডি ওমর ফারুক খানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়।
তিনি দাবি করেন, এই নিয়োগের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে আবারও এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। শুরু থেকেই গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডাররা এ নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছেন। নুর নবী মানিক বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত মালিক ও উদ্যোক্তাদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা এই নিয়োগ মেনে নেব না। তিনি আরো বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই ইসলামী ব্যাংকে আবার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। এর প্রতিবাদে গত ২৪ মে দেশের বিভিন্ন শাখার সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি আমলে নেয়নি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে তারল্য সংকটে রয়েছে। অনেক গ্রাহক চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না। বিভিন্ন এটিএম বুথেও নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থার জন্য তারা ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। বিক্ষোভকারীরা ঘোষণা দিয়েছেন, মো. খুরশীদ আলমের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে। একই সঙ্গে সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল এবং ইসলামী ব্যাংককে এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত করার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে কয়েকশ মানুষ অবস্থান নিয়ে কার্যত অবরোধ সৃষ্টি করেছিলেন। মতিঝিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় এতে আশপাশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল এবং এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, পুলিশ বারবার তাদের বুঝিয়ে সড়ক ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু তারা সরে না গিয়ে পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। উপকমিশনার নাসিরুদ্দিনের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আন্দোলনকারীদের কয়েক দফা সতর্ক করা হয়। এরপরও তারা সড়ক না ছাড়ায় আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি আরো বলেন, সংঘর্ষে মতিঝিল বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) পেট্রোলসহ অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সকাল থেকে আন্দোলনকারীদের সরে যেতে বলছি। যেহেতু এখানে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ অনেক ব্যাংক রয়েছে। তাদের ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা হয়েছে। বলার পরও সরে না যাওয়াতে বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়েছি।
এ বিষয়ে ডিএমপির মতিঝিল জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) হুসাইন মুহাম্মাদ ফারাবী বলেন, ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে কয়েকশ গ্রাহক ভোর থেকে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান করছিল। তারা ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান যাতে যোগদান করতে না পারে সেই দাবি জানাচ্ছিল। তাদের দাবি, এই চেয়ারম্যান যোগদান করলে তাদের আমানত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা তাদের সরে যেতে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তাতে কর্ণপাত করেনি। পরে সকাল সোয়া ৯টার দিকে আমরা জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছি। বর্তমানে তারা ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে থেকে সরে আশপাশের অলিগলিতে অবস্থান নিয়েছে। পুলিশ ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে ঘেরাও (কর্ডন) করে রেখেছে।
এদিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে চলমান আন্দোলনের মুখে ৫ দফা দাবি উত্থাপন করেছে 'সচেতন গ্রাহক ফোরাম'। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এই দাবিগুলো তুলে ধরা হয়। দাবি আদায় না হলে আগামীতে লাগাতার কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনরত গ্রাহকরা। আন্দোলনকারী গ্রাহকদের ঘোষিত ৫ দফা দাবির প্রথমটি হলো—ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে অবিলম্বে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের অপসারণ। দ্বিতীয়ত, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকে পুনরায় ব্যাংকের দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য যোগ্য নতুন গভর্নর নিয়োগ অথবা বর্তমান গভর্নরের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, পূর্বে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইসলামী ব্যাংকের সামনে বা আশপাশে আসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এবং পঞ্চমত, এসব দাবি অনতিবিলম্বে পূরণ না হলে তীব্র ও লাগাতার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। গ্রাহক প্রতিনিধিদের অভিযোগ, নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম সাবেক বিতর্কিত 'এস আলম গ্রুপের দোসর'। তাকে এই পদে বহাল রাখলে ব্যাংকে পুনরায় ব্যাপক লুটপাটের আশঙ্কা রয়েছে। মূলত সাধারণ গ্রাহকদের আমানত ও স্বার্থ রক্ষার্থেই তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো সিদ্ধান্তই রাস্তার আন্দোলনে পরিবর্তন হবে না। কোনো ব্যাংক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হতে পারে না। ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে সাংবাদিকদের সামনে এসব কথা বলেন তিনি। এসময় রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যাংকের অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। আরিফ হোসেন খান বলেন, যে কোনো ইস্যুতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিক্ষোভ প্রদর্শন বা মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ারও এখতিয়ার আছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক আবেগ বা চাপের ঊর্ধ্বে থেকে কেবল প্রতিষ্ঠানের জন্য যা উপযুক্ত এবং আইনগতভাবে সিদ্ধ, সে অনুসারে নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
তিনি আরো বলেন, কোনো ব্যাংক যদি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় বা সেই পরিচয়ে বড় হতে থাকে, তবে তা ওই ব্যাংক টেকসই হওয়ার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক কার্যালয়ের বাইরে বিভিন্ন বিক্ষোভ ও কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে, কোনো কোনো ব্যাংক বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠনের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হচ্ছে কিনা! বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, কোনো ব্যাংকই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হতে পারে না এবং রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যাংকের অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এবং সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে- এমন আশঙ্কায় ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড সভা সরাসরি না করে ভার্চ্যুয়াল করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংক ভবনের বাইরে রাস্তার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তবে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বা কম্পাউন্ডের ভেতরের নিরাপত্তার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষভাবে আমলে নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না। গভর্নর ব্যাংক কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করেছেন, কাজ করতে গিয়ে তারা যদি কোনো রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হন, তবে তা যেন সরাসরি জানানো হয়। সেই চাপ কর্মকর্তারা মোকাবিলা করতে না পারলে গভর্নর নিজে তা মোকাবিলা করবেন বলে উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র।
অপরদিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর প্রধান কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত সাধারণ গ্রাহকদের ওপর পুলিশ কর্তৃক গুলিবর্ষণ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে এই প্রতিবাদ জানান। বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, "ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর প্রধান কার্যালয়ের সামনে ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা এবং নবনিযুক্ত বিতর্কিত চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ গ্রাহকদের ওপর পুলিশ গুলি চালিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করার এবং লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও জলকামান ব্যবহারের আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং গ্রাহকদের যৌক্তিক দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করছি।"
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, "সোমবার সকাল থেকে ঢাকার মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে 'ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম'-এর ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে সাধারণ গ্রাহকরা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। ব্যাংকের আমানতকারী ও গ্রাহকদের স্বার্থেই তাঁরা এই আন্দোলন করছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, পুলিশ কোনো উসকানি ছাড়াই সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিরীহ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে এবং জলকামান ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি চালিয়ে বহু আমানতকারীকে মারাত্মকভাবে আহত করে। আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আমি তাঁদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। আমানতকারী ও গ্রাহকদের নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে হামলা করা পুলিশের কাজ নয়। পুলিশের এই অযাচিত বলপ্রয়োগ ও দমনপীড়ন অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।"
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, "গ্রাহকদের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর ও যৌক্তিক। বিগত দিনে একটি নির্দিষ্ট মহলের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের ব্যাংকিং খাতে যে নজিরবিহীন লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, দেশের মানুষ তা ভুলে যায়নি। গ্রাহকরা মনে করেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর। তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখলে ব্যাংকটি আবারও ভয়াবহ লুটপাটের মুখে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের আমানত অনিরাপদ হয়ে পড়বে। নিজের কষ্টের জমানো টাকার নিরাপত্তা চাওয়া এবং ব্যাংকের সুরক্ষায় সোচ্চার হওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।"
বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, "আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, ব্যাংক জনগণের আমানতে চলে। গ্রাহকদের স্বার্থ উপেক্ষা করে কোনো ব্যাংক টিকতে পারে না। সাধারণ গ্রাহকদের কণ্ঠরোধ করতে পুলিশের গুলি চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অবিলম্বে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের ওপর হামলাকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।" অবিলম্বে 'অবৈধ ও দলীয়ভাবে নিয়োগকৃত' চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল করার দাবি জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, "কোটি কোটি আমানতকারী ও গ্রাহকদের ক্ষোভ ও উত্তেজনা প্রশমন এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।"
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে পদত্যাগ করেন। ওইদিনই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বছরের জন্য ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে তিনিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগে বাধ্য হন। খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছে একটি পক্ষ।
গতকালের মানববন্ধন থেকে নতুন নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যানসহ সব পর্ষদ সদস্যের পদত্যাগ এবং এমডি ওমর ফারুক খানকে পদত্যাগের বিরোধিতা করে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আয়োচিত কর্মসূচির পেছনে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকটি এক সময় জামায়াতপন্থী লোকজনের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। ২০১৭ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে তুলে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এস আলমের বিরুদ্ধে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ ওঠে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









