নীলফামারীর ডোমারে মানসিক প্রতিবন্ধী ময়নুলের জমি প্রতারণা করে লিখে নেওয়ার পর তার মাথা গোঁজার একমাত্র ঘরটিও ভেঙে নিয়ে গেছে আপন চাচা কছির উদ্দিনের পরিবার। ফলে খোলা আকাশের নিচে চরম দুর্বিষহ ও মানবেতর জীবন যাপন করছেন এই অসহায় প্রতিবন্ধী। এই অমানবিক ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ময়নুলের জমি-ঘর ফেরত এবং অভিযুক্ত চাচার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ডোমার-নীলফামারী-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফায়ার সার্ভিসের বাবুর্চি হিসেবে কর্মরত কছির উদ্দিন তার আপন ভাতিজা, অসহায় ও মানসিক প্রতিবন্ধী ময়নুলের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রথমে তার ১০ শতাংশ জমি প্রতারণার মাধ্যমে নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন। কছির উদ্দিনের ছেলে আব্দুছ ছালাম একজন কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। শুধু জমি কেড়েই ক্ষান্ত হয়নি এই প্রভাবশালী চক্র, জমি লিখে নেওয়ার পর ময়নুলের থাকার ঘরটিও তারা ভেঙে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই ময়নুলের জীবন হয়ে ওঠে চরম দুর্বিষহ। চলমান কালবৈশাখী মৌসুমে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কোনো আশ্রয় না থাকায় কখনো কাদা-পানিতে, আবার কখনো খোলা মাটিতে ভিজে রাত কাটাতে হয়েছে এই মানসিক প্রতিবন্ধীকে।
একজন প্রতিবন্ধীর ওপর এমন বর্বর নির্যাতনের বিষয়টি জানাজানি হলে গোটা এলাকায় তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি নিয়ে জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টালসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও স্থানীয় প্রশাসন এখন পর্যন্ত পদক্ষেপ নেয় নি।
এলাকাবাসী জানান, জমি ও ঘর আত্মসাতের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে গণমাধ্যম ও জনগণের চাপে পড়ে প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করেন অভিযুক্ত চাচা কছির উদ্দিন। তবে তিনি ১০ শতাংশ জমির মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ জমি ফেরত দেওয়ার কথা বলে তা বুঝিয়ে দিতে নানা ধরনের টালবাহানা ও সময়ক্ষেপণ শুরু করেন।
এদিকে, কছির উদ্দিনের এই অপকর্মের খবর যেসব সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী প্রচার করেছেন এবং যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় তা শেয়ার করেছেন, তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছে কছিরের স্ত্রী ও সন্তানরা। এমনকি সাধারণ মানুষ যারা ফেসবুকে এই সংক্রান্ত পোস্টে লাইক ও কমেন্ট করেছেন, তাদেরও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কছির পরিবারের এমন লাগামহীন হুমকিতে স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
চাচা কছির উদ্দিনের এমন ধূর্ততা ও প্রশাসনের চরম নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে গত ৩০ মে ডোমার-নীলফামারী-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে এলাকাবাসী। ঘণ্টাব্যাপী চলা এই মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "ঘটনাটি সর্বত্র ভাইরাল হওয়ার পরও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। একজন মানসিক প্রতিবন্ধীর জমি কেড়ে নিয়ে তাকে ঘরহীন করে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে মাটিতে ফেলে রাখা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।" বক্তারা অবিলম্বে সরকারি চাকরিজীবী কছির উদ্দিন ও তার সহযোগীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
এদিকে, প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ না থাকায় মানববন্ধন শেষে সম্পূর্ণ এলাকাবাসীর নিজস্ব উদ্যোগে ময়নুলের সেই জমিতেই তাৎক্ষণিকভাবে একটি টিনের চালা নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। কাদা-মাটি ও ঝড়-বৃষ্টি থেকে ময়নুলকে বাঁচাতে প্রতিবেশীরা এই মানবিক উদ্যোগ নেন। একই সাথে এলাকাবাসী জানান, পরবর্তীতে এই জমিতে ময়নুলের জন্য একটি স্থায়ী ঘর নির্মাণের পদক্ষেপও গ্রহণ করবেন তারা। তবে তারা অনতিবিলম্বে ময়নুলের ১০ শতাংশ জমির পুরো অংশই উদ্ধার করতে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









