ঈদুল আজহা এলেই অবধারিতভাবে আলোচনায় আসে কোরবানির পশুর চামড়া। চামড়ার সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা বা তা সংরক্ষণ করা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা তৎপরতা দেখা যায়। তবে চামড়ার বাইরেও কোরবানির পশুর একটি বিশাল অংশ যা সাধারণত ‘বর্জ্য’ বা ‘উচ্ছিষ্ট’ হিসেবে ফেলে দেওয়া হয় তার ভেতরে লুকিয়ে আছে শতকোটি টাকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। সঠিক সচেতনতা, সংগ্রহ পদ্ধতি এবং নীতিগত সহায়তার অভাবে প্রতিবছর পশুর হাড়, শিং, খুর, মাথার চামড়া, চর্বি, রক্ত ও নাড়িভুঁড়ি আবর্জনার ভাগাড়ে চলে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশ হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ। খাতসংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদদের মতে, কোরবানির পশুর প্রায় প্রতিটি অংশেরই উচ্চ শিল্প ও বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব প্রাণিজ উপজাতের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এগুলোকে সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানোর কোনো সুনির্দিষ্ট মহাপরিকল্পনা নেই।
বাংলাদেশ বোন এক্সপোর্টার অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং পশু সম্পদ বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ফেলে দেওয়া এসব উচ্ছিষ্টের বাণিজ্যিক ব্যবহার বহুমুখী। পশুর হাড় ও চর্বি থেকে তৈরি হয় উচ্চমানের জেলাটিন, যা জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্যাপসুলের কাভার (শেল) তৈরিতে এবং সিরামিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া হাড় গুঁড়ো করে পশুখাদ্য ও ‘বোন চার’ তৈরি করা যায়। শিং ও খুর দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের বোতাম, চিরুনি, নান্দনিক অলংকার, খেলনা এবং বিভিন্ন হস্তশিল্পের শোপিস তৈরি হয়। এছাড়া গরুর মাথার চামড়া অত্যন্ত শক্ত ও উন্নতমানের হয়, যা দিয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশের জন্য বিশেষ বুটজুতা তৈরি সম্ভব। অন্যদিকে লেজের পশম বা চুল প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে ভালো দামে রপ্তানি করা যায়। এর বাইরে রক্ত ও নাড়িভুঁড়ি আধুনিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে অত্যন্ত কার্যকরী জৈব সার এবং মাছ ও পশুর জন্য উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবছর কোরবানির ঈদে শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ৩৫ হাজার টন পশুবর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর বড় অংশই ঢাকার বাইরে খোলা জায়গায় বা মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে মৎস্য ও পশুখাদ্যের প্রোটিনের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার প্রতি কেজিতে খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। অথচ দেশের এই পশুবর্জ্য বা উচ্ছিষ্ট সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে মাত্র ৩ থেকে ৪ টাকায় প্রতি কেজি উচ্চমানের প্রোটিন তৈরি সম্ভব। এতে দেশের পশুখাদ্য খাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা যেমন কমবে, তেমনি সাশ্রয় হবে শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।
একসময় কোরবানির পশুর এই অপ্রচলিত অংশগুলোর বেশ ভালো বাজার থাকলেও বর্তমানে তা প্রায় ধ্বংসের মুখে। পুরান ঢাকার পোস্তা এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী হাজী মো. শামসুল হক জানান, সরকার শুধু চামড়া নিয়েই হিমশিম খাচ্ছে, বাকি বর্জ্য সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগই নেই। কালাম ব্রাদার্স ট্যানারির মালিক হাজী মো. কামাল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে গরুর মাথার চামড়া ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হতো, যা দিয়ে দেশের কারখানায় ভালো মানের বুটজুতা তৈরি হতো। এখন কারখানাগুলো বন্ধ, চাহিদাও নেই। ফলে এসব চামড়া এখন রাস্তায় ফেলে দিতে হচ্ছে। যখন দেশে ‘ওয়েট ব্লু’ চামড়া রপ্তানির সরাসরি অনুমতি ছিল, তখন বিদেশি ক্রেতারা এসব উপজাতও কিনতেন। এখন সেই সুযোগ বন্ধ।’
পোস্তা এলাকায় রাস্তার পাশে বসে ফেলে দেওয়া গরুর লেজের চুল সংগ্রহ করছিলেন বৃদ্ধ মো. শামছু মিয়া। ৪০ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত শামছু মিয়া জানান, আগে তিনি এক কেজি শিং ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায় এবং লেজের চুল ৩০০ টাকায় বিক্রি করতেন। এখন বাজারে কোনো চাহিদা না থাকায় লেজের চুল মাত্র ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। চাহিদা না থাকায় মানুষ এখন এসব হাড়-শিং রাস্তায় ফেলে দেয় এবং সিটি কর্পোরেশন তা আবর্জনা হিসেবে ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম জানান, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু নতুন ও ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা এই খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
ট্যানারির কঠিন বর্জ্যকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করে ব্যবস্থাপনার কাজ চলছে:
১. র-ট্রিমিংস (মাথা ও শিং): কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তারা এই বর্জ্য দিয়ে চাবির রিং, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন চামড়াজাত পণ্য তৈরি করছে।
২. ক্রোম শেভিং ডাস্ট: এটি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য। একটি চীনা প্রতিষ্ঠান এটি নিয়মিত সংগ্রহ করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করছে এবং তা বিদেশে রপ্তানি করছে, যাতে এটি কোনোভাবেই দেশীয় খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে না পারে।
৩. ফ্লেশিং (চর্বিযুক্ত বর্জ্য): চর্বি থেকে জেলাটিন উৎপাদনের জন্য দেশীয় ট্যানারি মালিকদের পাশাপাশি একটি চীনা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের তীব্র আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিসিক চেয়ারম্যান আশা প্রকাশ করেন, আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শতভাগ না হলেও একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি অর্জিত হবে, যা দেশের পরিবেশগত মানদণ্ড উন্নত করার পাশাপাশি রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলে দেবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির খান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে নতুন রপ্তানি খাতের বিকাশ অপরিহার্য। কোরবানির পশুর উপজাতভিত্তিক শিল্প হতে পারে এর অন্যতম সমাধান।
তার মতে, পশুর চামড়ার মতো হাড়, শিং ও অন্যান্য উচ্ছিষ্ট সংগ্রহেও জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার, সিটি কর্পোরেশন এবং দেশের মসজিদগুলোকে কাজে লাগিয়ে যদি একটি সুসংগঠিত ‘সংগ্রহ ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা যায়, তবে এই বর্জ্যই দেশের অর্থনীতিতে আশীর্বাদ হয়ে উঠবে। পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রবেশ করতে পারবে বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক জেলাটিন ও প্রাণিজ উপজাতের বাজারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









