মাত্র তিন মাসের মাথায় কৌশলগত নীরবতা ভেঙে সরকারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে নামছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত। সেজন্য সাংগঠনিক গোছগাছ পর্ব শেষে তিনটি গোপন ফ্রন্ট নির্ধারণ করে রাজপথে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আসন্ন বাজেটে করের বোঝার প্রতিবাদে চলতি মাসেই তারা তীব্র আন্দোলনের ছক কষেছে। জামায়াতের হাইকমান্ড এবং শরিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।
জামায়াতের সম্ভাব্য আন্দোলন মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে সরকারি দলও। তারা রাজপথে বিরোধী দলের আন্দোলনকে মোকাবিলার পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবে ‘কাউন্টার স্ট্র্যাটেজি’ বা পাল্টা কৌশল চূড়ান্ত হয়েছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করে।
জানা গেছে, চলতি জুনেই সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মাঠে নামার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে আসন্ন বাজেটে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগকে ‘ধোঁকাবাজি ও জনস্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর পরপরই জামায়াতের মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ দেখা দিয়েছে।
জামায়াত সূত্র জানায়, দীর্ঘ নীরবতা ও ঘরোয়া প্রস্তুতির পর চলতি জুনেই সরকারের বিভিন্ন গণবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বৃহৎ আন্দোলনে নামছে জামায়াত ও তাদের ১১-দলীয় জোট। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং নতুন কর ও ভ্যাট নীতির প্রতিবাদে এই আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত তাদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য মাঠ প্রস্তুত করছে। এজন্য সদ্যগত কোরবানির ঈদে ব্যাপক জনসংযোগ করেছেন দলটির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা।
এ ছাড়া মাঠে নামার ক্ষেত্রে জামায়াতের প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলোর একটি হলো 'জুলাই সনদ' অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কার। একই সাথে ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের আর্থিক খাতের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এবং সরকারি দল বিএনপির নেতাদের পক্ষ থেকে আসা বিভিন্ন রাজনৈতিক আক্রমণের কাউন্টার জবাব দিতেই জামায়াত এখন আর ঘরে বসে না থেকে কর্মী-সমর্থকদের মাঠে নামানোর কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সেজন্য মাঠের রাজনীতিতে তিনটি গোপন ফ্রন্ট নিয়ে মাঠ গরমের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও ১১-দলীয় জোট। এর মধ্যে মাঠের আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা তিনটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ফ্রন্ট বিশেষ করে ঢাকার মহাপ্রস্তুতি, শরিক দলগুলোর ভেতরের টানাপড়েন এবং বিএনপির কাউন্টার স্ট্র্যাটেজিকে মাথায় রেখে মাঠে নামার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তারা। জামায়াতের হাইকমান্ড মনে করে, ঢাকার রাজপথ দখল করতে না পারলে কোনো আন্দোলনই পূর্ণতা পায় না। এজন্য ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণ শাখাকে কেন্দ্র করে বিশেষ পরিকল্পনায় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। সে হিসেবে ঢাকাকে ৪টি জোনে ভাগ করে কেন্দ্রীয় নেতাদের যোগসাজশে গোপন সমন্বয় কমিটি বা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
এই ফোর্স রাজধানীর মতিঝিল (আর্থিক কেন্দ্র), পল্টন এবং মিরপুরকে আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে বড় ধরনের কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ১০-১৫ হাজার কর্মীর ঝটিকা জমায়েত ও সড়ক অবরোধের কৌশল গ্রহণের পরিকল্পনাও নিয়েছে দলটি। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার বড় বড় কলেজগুলোর ছাত্রশিবির কর্মীদের রাজপথের ফ্রন্টলাইনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, কোরবানির ঈদের ছুটিতে দলটির শীর্ষ নেতারা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ব্যাপক গণসংযোগ করেছেন। এখন ছুটি শেষ। তাই জামায়াতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা শুরু হবে। এ ছাড়া সিটি ১১-দলীয় জোটের পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা অনুসারে সিটি কর্পোরেশন ও বিভাগীয় শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে গণমিছিলের প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করার পর দলটি দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশনে বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ করবে। তৃণমূলের এই আন্দোলন সফল করার পর ঢাকা রাজধানীতে একটি বিশাল কেন্দ্রীয় মহাসমাবেশ আয়োজনের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
তবে জামায়াত মাঠে নামার ঘোষণা দেওয়া মাত্রই প্রধান সরকারি দল বিএনপি তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে পাল্টা চাল চালতে শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াত যেদিন বিক্ষোভ বা সমাবেশের ডাক দেবে, ঠিক একই দিন বিএনপিও 'জনস্বার্থ' বা 'উন্নয়ন শোভাযাত্রা'র নামে পাল্টা কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি নিয়েছে। বিএনপির হাইকমান্ড থেকে তৃণমূলের অঙ্গসংগঠনগুলোকে (যুবদল ও ছাত্রদল) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা কোনোভাবেই নিজ নিজ এলাকায় জামায়াত বা শিবিরকে এককভাবে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে না দেয়।
এছাড়া জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাকফুটে রাখতে বিএনপি তাদের প্রেস ব্রিফিং ও সভা-সমাবেশে জামায়াতের অতীত ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক 'গুপ্ত চাঁদাবাজি ও উগ্রপন্থা'র অভিযোগগুলো আরো জোরালোভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরার কৌশল নিয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক এদিনকে বলেন, বিরোধী দল যদি যৌক্তিক ইস্যুতে আন্দোলন করে সেক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই। তবে আন্দোলনের নামে জনদুর্ভোগের চেষ্টা করলে আইন-শৃংখলা বাহিনী সেটা দেখবে।
তিনি বলেন, বিএনপি মাত্র তিন মাস হলো ক্ষমতায় এসেছে। এ কয়দিনে টুকটাক কোনো ভুল হলেও হতে পারে। কিন্তু এখনই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিরোধী দল যদি গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে চায়, বিএনপির নেতা-কর্মীরা সেটা নিশ্চয়ই প্রতিহত করার চেষ্টা করবে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, জামায়াত যদি জুনের বাজেট অধিবেশনকে কেন্দ্র করে রাজপথে জল ঘোলা করার চেষ্টা করে, তবে তাদের দমনে আইনি ও প্রশাসনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে। বিশেষ করে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ওপর সম্ভাব্য আইনি চাপের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা হবে।
সরকার ও গোয়েন্দা সূত্রের ইঙ্গিত অনুসারে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ শীর্ষ নেতাদের নামে অতীতে থাকা রাজনৈতিক ও নাশকতা মামলাগুলোর চার্জশিট দ্রুত জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিগত সময়ে ঘটে যাওয়া ঋণ জালিয়াতি বা অর্থ পাচারের অনুসন্ধানে জামায়াতপন্থী সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমান পরিচালকদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সামনে আনা হবে।
সূত্র জানায়, সরকারের পরিকল্পনা অনুসারে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শিগগিরই কয়েকজনকে তলব করতে পারে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তালিকায় থাকা জামায়াত ও শিবিরের সক্রিয় ক্যাডারদের তালিকা ধরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট উসকানি বা চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার অভিযান চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিশেষ গোয়েন্দা শাখা (এসবি) ইতিমধ্যে জামায়াতের জুনের আন্দোলন পরিকল্পনা নিয়ে একটি "কড়া গোপনীয়" প্রতিবেদন সরকারের শীর্ষমহলে জমা দিয়েছে।
সবশেষে যেহেতু বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, তাই তারা জামায়াতের আন্দোলন মোকাবিলায় প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরোপুরি কাজে লাগাবে। ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের জ্বালাও-পোড়াও, মব ভায়োলেন্স বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে (বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত ও ব্যাংকিং সেক্টরে) বাধা সৃষ্টি করলে সাথে সাথে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সাথে জামায়াত-শিবিরের স্থানীয় অর্থায়ন ও হুন্ডি চেকিং বাড়াতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা তাদের আন্দোলনের আর্থিক মেরুদণ্ড দুর্বল করে দেবে।
এ ছাড়া বিএনপি জামায়াতের আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে ইতিমধ্যে জনগণের সামনে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তারা আন্দোলনের সময়োপযোগিতা নিয়েও প্রশ্নও তুলছে। বিএনপির নেতাদের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর দেশ যখন একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে, তখন জামায়াতের এই আন্দোলন কেবলই সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা। বিএনপি সুশীল সমাজ এবং তরুণ ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছে, জামায়াত ধর্মীয় ভাবাবেগ ব্যবহার করে দেশে আবার একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে। সব মিলিয়ে রাজপথের এই মুখোমুখি অবস্থান ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন সংঘাতময় মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









